default-image

মহেশ খাল দিয়ে আসা জোয়ারের পানি সাত–আট বছর ধরে ভোগাচ্ছে নগরের আগ্রাবাদ ও হালিশহর এলাকার পাঁচ লাখ মানুষকে। বর্ষায় তো কথাই নেই, শীত মৌসুম ও বৃষ্টিপাতহীন দিনেও এখানে জলাবদ্ধতা লেগে থাকে। আগামী বর্ষায় জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি পেতে এখনই আন্দোলনে নেমেছেন এই এলাকার বাসিন্দারা।
পরিকল্পিত চট্টগ্রাম ফোরামের সদস্য প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার বলেন, নগরের জলাবদ্ধতা নিরসন করতে হলে ১৯৯৫ সালের নগর মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। না হয় বারবার জলাবদ্ধতা হবে। মহাপরিকল্পনায় মহেশ খাল খনন, দখলমুক্ত করা ও এর মুখে স্লুইসগেট (জলকপাট) নির্মাণ করতে বলা হয়েছে। একই মত পোষণ করেন স্থানীয় বাসিন্দারাও। তবে সিটি করপোরেশন, পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ও বন্দর কর্তৃপক্ষ এখনো কোনো কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় তাঁরা হতাশ ও ক্ষুব্ধ।
সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, মহেশ খালের মুখে জলকপাট নির্মাণের দায়িত্ব পাউবোর। কাজটি দ্রুত করার জন্য করপোরেশনের পক্ষ থেকে অনাপত্তিপত্রও দেওয়া হয়েছে। তবে খালটি বন্দর এলাকায় হওয়ায় এ ব্যাপারে বন্দর কর্তৃপক্ষেরও অনুমতি প্রয়োজন।
এদিকে মহেশ খালের মুখে জলকপাট নির্মাণের দাবিতে আগ্রাবাদ–হালিশহর এলাকার বাসিন্দারা সিটি মেয়র মোহাম্মদ মন্জুর আলমকে স্মারকলিপি দিয়েছেন। ২ ফেব্রুয়ারি বৃহত্তর আগ্রাবাদ ও হালিশহর জলাবদ্ধতা নিরসন কমিটির ব্যানারে সমাবেশও করেছেন তাঁরা। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী। তিনি বলেন, এ এলাকা যাতে আর পানিতে না ডোবে, সে জন্য দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বর্ষা মৌসুমের আগেই মহেশ খালে জলকপাট নির্মাণ করতে হবে।
সল্টগোলা এলাকায় কর্ণফুলী নদী থেকে উৎপত্তি মহেশ খালের। খালটি কাট্টলী খালের সঙ্গে যুক্ত হয়ে মিশেছে বঙ্গোপসাগরে। স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলররা জানান, চাক্তাই খালের পর মহেশ খাল হচ্ছে নগরের পানিনিষ্কাশনের প্রধান মাধ্যম। অথচ এ খাল দখল করে বাড়িঘর নির্মাণ করা হয়েছে। নগরের বন্দর, ডবলমুরিং, আগ্রাবাদ ও হালিশহরের প্রায় পাঁচ লাখ বাসিন্দা দুর্ভোগে পড়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, জোয়ারজনিত জলাবদ্ধতায় সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছে অভিজাত হিসেবে খ্যাত আগ্রাবাদ আবাসিক এলাকার বাসিন্দারা। এই এলাকায় রয়েছে ২৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও একটি হাসপাতাল। এলাকাটি এখন প্রায় বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়েছে বলে আক্ষেপ এলাকাবাসীর।
কথা হয় বৃহত্তর আগ্রাবাদ ও হালিশহর জলাবদ্ধতা নিরসন কমিটির যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল আলমের সঙ্গে। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, দুটি কারণে এসব এলাকায় জোয়ারজনিত জলাবদ্ধতার সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করেছে। একসময় এই এলাকাগুলোয় ডোবা, জলাধারসহ পানি চলাচলের বিভিন্ন মাধ্যম ছিল। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় এসব জলাধার ক্রমাগত ভরাট করা হয়েছে। আর খালের জায়গা দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে ঘরবাড়ি ও বিভিন্ন স্থাপনা। এতে সংকুচিত হয়ে পড়েছে পুরো খাল। এ কারণে পানিনিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হওয়ায় এখন নিয়মিত জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। খায়রুল আলম জানান, কর্ণফুলী নদীর জোয়ারের প্রভাব পড়ে এসব এলাকায়। জোয়ারের পানি মহেশ খাল দিয়ে নগরে প্রবেশ করে। মহেশ খাল সরু ও সংকুচিত হয়ে যাওয়ায় খুব সহজে পানি নামে না। জোয়ারের পানি নামতে নামতে অনেক সময় সাত-আট দিন লেগে যায়। সিটি করপোরেশন, বন্দর কর্তৃপক্ষ ও পাউবোর মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণে এত দিন ধরে মহেশ খালের মুখে জলকপাট নির্মাণ করা হয়নি বলে তিনি দাবি করেন। অবশ্য সম্প্রতি বন্দর কর্তৃপক্ষ মহেশ খাল খনন ও জলকপাট নির্মাণের আশ্বাস দিয়েছে। তবে আগামী এপ্রিল-মে মাসের তা সম্পন্ন না করলে আবার জোয়ারজনিত জলাবদ্ধতায় কষ্ট পেতে হবে এলাকাবাসীকে।
স্থানীয় বাসিন্দা আবদুর রহিম, মাহবুবুর রহমান ও মোহাম্মদ সেকান্দর বলেন, মহেশ খালের মুখে জলকপাট না থাকায় দীর্ঘদিন ধরে জোয়ারজনিত জলাবদ্ধতায় ভুগছে এলাকাবাসী। এখন এই এলাকায় বাসা ভাড়া দেওয়া যায় না। ভাড়াটেরা বাসা ছেড়ে চলে যাচ্ছে। কিন্তু স্থানীয় বাসিন্দাদের বাধ্য হয়ে এখানে বসবাস করতে হচ্ছে। মন্জুর আলম প্রথম আলোকে বলেন, আগ্রাবাদ ও হালিশহর এলাকার মানুষ দীর্ঘদিন ধরে জোয়ারজনিত জলাবদ্ধতায় কষ্ট পাচ্ছে। এ জন্য মহেশ খালের মুখে জলকপাট নির্মাণে ইতিমধ্যে করপোরেশনের পক্ষ থেকে অনাপত্তিপত্র দেওয়া হয়েছে। আর সব ধরনের সহযোগিতা দেওয়ার জন্য করপোরেশন প্রস্তুত রয়েছে।
বন্দরের পরিচালক (প্রশাসন) জাফর আলম সম্প্রতি প্রথম আলোকে মুঠোফোনে বলেন, ‘মহেশ খালের মুখে জলকপাট নির্মাণের ব্যাপারে আমরা প্রাথমিক কাজ শুরু করেছি। তবে কবে নাগাদ এটি নির্মাণ করা হবে, তা এখন বলা যাচ্ছে না।’

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন