বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
default-image

পুকুরে মাছ চাষে বিপ্লব ঘটে যাওয়ার পথে চ্যালেঞ্জগুলো কী ছিল?

গোলাম হোসেন: পুকুরে মাছ চাষের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে চাহিদা অনুযায়ী পোনা সরবরাহ। সেটি প্রথমে সরকারিভাবে হয়েছে। এখন দেশে প্রায় এক হাজার হ্যাচারি আছে। যার বেশির ভাগই বেসরকারি উদ্যোগে গড়ে উঠেছে। দেশের উৎপাদিত মাছের জন্য প্রয়োজনীয় পোনার ৯৮ শতাংশ এখন হ্যাচারিগুলো থেকে আসে। বাকিগুলো নদী ও উন্মুক্ত জলাশয় থেকে জেলেরা সংগ্রহ করে থাকেন। দ্বিতীয় মাছের খাবার সরবরাহ করার ক্ষেত্রে ফিশ ফিডমিলগুলো গড়ে উঠেছে। দেশের অনেক বড় বড় প্রতিষ্ঠান এ ক্ষেত্রে এগিয়ে এসেছে। এ ছাড়া মাছের রোগ-বালাই দূর করতে প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ করার ক্ষেত্রে দেশে প্রচুর বিনিয়োগ হয়েছে। দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো এগিয়ে এসেছে। আর সামগ্রিকভাবে মৎস্য অধিদপ্তরের মাঠপর্যায়ের কর্মী এবং গণমাধ্যমগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তেলাপিয়ার উন্নত জাত উদ্ভাবনে ওয়ার্ল্ড ফিশ আমাদের অনেক সহায়তা দিয়েছে।

এখন আমাদের মোট মাছের ১৩ শতাংশ তেলাপিয়া, পাঙাশ ১২ শতাংশ ও ১১ শতাংশ রুই মাছ। এর বাইরে শিং, মাগুর, শোল, রাজপুঁটি, পাবদা, টেংরার উন্নত জাতের চাষ দ্রুত বাড়ছে।

ইলিশেও তো সাফল্য ভালো।

গোলাম হোসেন: হ্যাঁ। ইলিশ মাছের উৎপাদন বাড়াতে সরকারের নীতিসহায়তা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। সরকার জাটকা ধরা বন্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কাজে লাগিয়েছে। দেশের ভেতরে একের পর এক ইলিশের অভয়াশ্রম চিহ্নিত করে সেখানে ইলিশের বেড়ে ওঠা নিশ্চিত করেছে। সর্বোপরি ইলিশ ধরার নিষিদ্ধ সময়ে সরকার জেলেদের সামাজিক নিরাপত্তার মাধ্যমে খাদ্য ও নগদ সহায়তা দিয়েছে। ফলে গত এক যুগে দেশে ইলিশের উৎপাদন দ্বিগুণ হয়েছে। চাঁদপুরের মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। যে কারণে আমাদের এখানে বিশ্বের বেশির ভাগ ইলিশ উৎপাদিত হচ্ছে।

কিন্তু চাষের মাছের ক্ষেত্রে বড় অভিযোগ হচ্ছে এগুলোর স্বাদু নদী বা বিলের মতো না।

গোলাম হোসেন: নদীর মাছের প্রধান খাবার হচ্ছে উদ্ভিদকণা ও প্রাণীকণা। যেগুলো প্রকৃতি থেকে আসে। ফলে প্রাকৃতিক জলাশয়ের মাছের স্বাদ কোনোভাবেই চাষের মাছের মতো হবে না। অনেক ক্ষেত্রে চাষিরা পুকুরের মাছে অতিরিক্ত ওষুধ ও নিম্নমানের ফিশফিড ব্যবহার করে। সে ক্ষেত্রে মাছের স্বাদে সমস্যা হয়। কিন্তু নিয়ম মেনে চাষ করলে পুকুরের মাছে পুষ্টিমানের কোনো তারতম্য হবে না। আমরা গবেষণা করে দেখেছি নদী ও পুকুরের চাষের মাছের পুষ্টিগুণ একই রকমের। তবে দেশের নদী ও উন্মুক্ত জলাশয়গুলোতে দূষণের কারণে প্রাকৃতিক উৎসের মাছ কমে যাচ্ছে। যা-ও পাওয়া যাচ্ছে তার মধ্যে প্লাস্টিককণার মতো মারাত্মক সব দূষিত বস্তুকণা পাওয়া যাচ্ছে। ফলে নদী ও জলাশয়ের মাছ মানেই যে ভালো তা কিন্তু বলা যাবে না।

আমাদের দেশে মাছের উৎপাদন হচ্ছে পুকুরে। যত বেশি পুকুর হবে তত বেশি কৃষি জমি কমবে। এর সমাধান কী?

গোলাম হোসেন: আমাদের দেশে পুকুরে যে পরিমাণ মাছ উৎপাদিত হচ্ছে, তা থেকে আর খুব বেশি বাড়ানো যাবে না। ইলিশের উৎপাদনও আর খুব বেশি বাড়বে না। এগুলোর উৎপাদন সর্বোচ্চ জায়গায় চলে গেছে। তাহলে আমাদের এখন অন্য খাতের দিকে এগোতে হবে। বঙ্গোপসাগরে আমরা বাংলাদেশের ভূখণ্ডের দ্বিগুণ এলাকা আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে জয় করেছি। কিন্তু সেখানে আমাদের প্রধান সম্পদ হচ্ছে মাছ। কিন্তু ওই মাছ আমরা কীভাবে আহরণ করব তা নিয়ে আরও বিস্তারিত পরিকল্পনা দরকার। অবকাঠামো ও প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্রে আমরা এখনো বেশ পিছিয়ে আছি। যেমন ধরেন বঙ্গোপসাগরে টুনা মাছ ধরার জন্য প্রয়োজনীয় জাল ও নৌযানের ঘাটতি আছে। সাগরের কোন এলাকায় কোন ধরনের মাছ কখন বেশি পাওয়া যায়, তার আরও বিস্তারিত জরিপ দরকার। আমাদের মাছ অন্য দেশের জেলেরা এসে নিয়ে যাচ্ছে কি না, তা দেখতে হবে।

দেশের মৎস্যসম্পদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী?

গোলাম হোসেন: বাংলাদেশে যেসব জনপ্রিয় মাছ রয়েছে, তা রপ্তানি করার উদ্যোগ নিতে হবে। এ জন্য মাছ প্রক্রিয়াজাত কারখানা গড়ে তুলতে হবে। এ ক্ষেত্রে বেসরকারি খাতকে এগিয়ে আসতে হবে। আর চাষের মাছ যাতে আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে চাষ করা যায়, তা নিশ্চিত করতে চাষিদের প্রশিক্ষণ এবং সচেতনতা বাড়াতে হবে। তবে এ বিষয়ে নিয়মিত তদারকি দরকার। সামগ্রিকভাবে বলতে হবে গরিবের প্রোটিনের সরবরাহ করতে এখন সাগরের দিকে নজর দিতে হবে।

আপনাকে ধন্যবাদ।

গোলাম হোসেন: আপনাকেও ধন্যবাদ।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন