১৯৮৮ সালের কথা। তরুণ নুরুল হক তখন ময়মনসিংহের আনন্দ মোহন কলেজে গণিতে সম্মান (স্নাতক) পড়ছিলেন। ওই সময় তিনি ময়মনসিংহের শম্ভুগঞ্জ এলাকায় নিজের পুকুর করে মাছ চাষ শুরু করেন। গ্রামের মানুষের কাছে তখন হ্যাচারির রেণুর কদর ছিল না। জামালপুর জেলা থেকে যমুনা নদীর রেণু এনে নিজে চাষ করতেন। আশপাশের মানুষ চাইলে রেণু বিক্রি করতেন। নুরুল হক বর্তমানে ময়মনসিংহের শম্ভুগঞ্জ এলাকায় অবস্থিত ব্রহ্মপুত্র বায়োটেক হ্যাচারির মালিক। তিনি ময়মনসিংহ শহরে বসবাস করেন। প্রতিদিন ব্যক্তিগত গাড়িতে চড়ে যান নিজের হ্যাচারিতে। মাছ চাষ করে পেয়েছেন সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পদক। এ মাছ চাষ তাঁকে অর্থ, সম্মান—দুটিই দিয়েছে। নুরুল হক বলেন, ‘১৯৮৮ সালে ময়মনসিংহের তৈয়ব আলী, হৃতিশ পণ্ডিত, সাজ্জাদ হোসেন আর আমি সামান্য ধারণা নিয়ে মাছ চাষ শুরু করেছিলাম। পরবর্তী সময়ে ড্যানিডা নামের একটি এনজিও ময়মনসিংহ জেলায় কাজ শুরু করে। ওই এনজিও মাছ চাষের প্রশিক্ষণ এবং ঋণসহায়তা দিত। এনজিওটি আসার পর আমাদের সাহস বাড়ে। বুঝতে পারি, মাছ চাষের সিদ্ধান্ত ভুল হয়নি। গ্রামের সাধারণ কৃষকেরাও তখন মাছ চাষের প্রতি আগ্রহী হতে থাকেন।’ নুরুলের ভাষ্য, ১৯৯৩ অথবা ১৯৯৪ সালে আসে পাঙাশ মাছের চাষ। পাঙাশই ময়মনসিংহে মাছ চাষের বিপ্লবের সূচনা করে। দেশীয় রুই-কাতলার দাম যখন প্রতি কেজি ৪০০ টাকা, তখন পাঙাশের কেজি ২০০ টাকা। লাভের আশায় গ্রামের মানুষ পাঙাশ চাষে ব্যাপকভাবে আগ্রহী হন। এরপর পাঙাশের কদর কমেছে। এসেছে কই, শিং, মাগুর এবং সর্বশেষ পাবদা। এভাবেই ময়মনসিংহের লোকজন মাছ চাষে আগ্রহী হয়ে ওঠেন।

ময়মনসিংহ জেলার গ্রামগুলোতে বর্তমানে ব্যাপকভাবে হচ্ছে বিভিন্ন জাতের মাছের চাষ। স্থায়ী পুকুরের পাশাপাশি মৌসুমি পুকুরেও চলে মাছ চাষ। মৌসুমি পুকুরগুলো হয় অগভীর। বছরের সাত মাস মাছ চাষের পাশাপাশি বোরো মৌসুমে ওই সব পুকুরে হয় ধানের আবাদ।

সম্প্রতি ময়মনসিংহের তারাকান্দা উপজেলার তালদীঘি ও নলদীঘি গ্রামে দেখা যায়, গ্রামজুড়ে অসংখ্য মৌসুমি পুকুর। পুকুরগুলো নীল রঙের জাল দিয়ে ঢেকে দেওয়ায় পুরো গ্রামই যেন নীল বর্ণ ধারণ করেছে। তালদীঘি গ্রামের কয়েকজন মাছচাষি জানালেন, তাঁরা ধান চাষের পাশাপাশি মাছ চাষ করে লাভবান হয়েছেন।

default-image

মাছ চাষ করে অর্থ ও সম্মান লাভের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হলেন ময়মনসিংহের ভালুকা আসনের সাংসদ কাজিম উদ্দিন আহম্মেদ। মাছ চাষের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ২০২১ সালের জাতীয় মৎস্য পদক পেয়েছেন। এ ছাড়া ময়মনসিংহের আরও দুজন সাংসদ, একজন সাবেক সাংসদও মাছ চাষে লাভবান হয়েছেন। তাঁরা নির্বাচনের হলফনামায় মাছ থেকে আয়ের কথা উল্লেখ করেছেন।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তাদের কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ময়মনসিংহের ১৩টি উপজেলাতেই এখন ব্যাপকভাবে মাছ হয়। জেলায় বর্তমানে মাছচাষির সংখ্যা ১১ লাখ ১৬ হাজার ৯৬৫। এর মধ্যে ১২ হাজার ২১৫ জন নারী মাছচাষি। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চাষির সংখ্যা ৪ হাজার ৯৪২। জেলার ১৩টি উপজেলায় ২০২১ সালে মাছের উৎপাদন ছিল ৪ লাখ ২ হাজার ৫৬৮ মেট্রিক টন। ২ লাখ ৭৬ হাজার ৫১৪ মেট্রিক টন মাছ ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হয়েছে। বর্তমানে জেলায় ১০২টি মাছের আড়ত আছে। এসব আড়তে এবং কখনো পুকুরপাড় থেকেই বিভিন্ন জেলা থেকে ব্যবসায়ীরা মাছ কিনে নেন। ২০২১-২২ অর্থবছরে ময়মনসিংহ জেলায় ৪ লাখ ১৩ হাজার মেট্রিক টন মাছ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

ময়মনসিংহে পুকুরে মাছ চাষের পাশাপাশি হ্যাচারিতে প্রচুর রেণু উৎপাদিত হয়। নিবন্ধিত ৩১০টি হ্যাচারি থাকলেও মাছচাষিদের মতে, জেলায় অন্তত ৮০০ হ্যাচারি আছে। সরকারি হিসাবে ময়মনসিংহে প্রতিবছর ১ লাখ ৭৯ হাজার ৪১৬ কেজি মাছের রেণু উৎপাদিত হয়। জেলায় বর্তমানে রুই, কাতলা, মৃগেল, কালবাউশ, বাটা, গনিয়া, বোয়াল, আইড়, শোল, গজার, গুলশা, পাবদাসহ ২২ জাতের মাছ ব্যাপকভাবে চাষ ও উৎপাদিত হয়।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা দিলীপ কুমার সাহা বলেন, টানা আট বছর ধরেই ময়মনসিংহ জেলা মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশে শীর্ষে আছে। এ কৃতিত্ব চাষিদেরই। এমনকি করোনার কারণে দেশের অনেক খাতের উৎপাদন কমে গেলেও, ময়মনসিংহে মাছ উৎপাদন কমেনি। এ খাত ময়মনসিংহের গ্রামীণ অর্থনীতিকে করোনার ভয়াবহতার মধ্যে সচল রেখেছে। তবে মাছচাষিদের জন্য এখন একটা আতঙ্কের বিষয় ভুঁইফোড় খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান। ময়মনসিংহের মাছ চাষের ব্যাপকতার সুযোগে কিছু নামধারী প্রতিষ্ঠান খাদ্য উৎপাদন করে লোভনীয় বিজ্ঞাপন দিয়ে বাজারে ছাড়ছে। এসব থেকে চাষিদের সতর্ক থাকতে হবে।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন