কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার মাতারবাড়ী ইউনিয়নের জনসংখ্যা প্রায় ৯০ হাজার। আয়ের প্রধান উৎস লবণ ও চিংড়ি চাষ। ৩০ হাজার মানুষ জড়িত এই কাজে। কিন্তু তাদের সেই জীবিকা এখন হুমকির মুখে পড়েছে। তাদের চাষযোগ্য জমি অধিগ্রহণ শুরু হয়েছে আরেকটি নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য। সরেজমিন ঘুরে চাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে এই শঙ্কার কথা।
১২ বর্গকিলোমিটার আয়তনের মাতারবাড়ীর ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াটের কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য অধিগ্রহণ করা হয় দক্ষিণ পাশের ১ হাজার ৪১৪ একর জমি। এবার চার কিলোমিটারের ব্যবধানে ৭০০ মেগাওয়াটের আরেকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। চলছে উত্তর পাশের ১ হাজার ২০০ একর জমির অধিগ্রহণ। এ নিয়ে উদ্বিগ্ন স্থানীয় বাসিন্দারা। জীবিকা হারিয়ে উদ্বাস্তু হওয়ার আশঙ্কা করছে তারা।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, উত্তর পাশের যেসব জমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে সেখানে চিংড়ি ও লবণ চাষ হয়ে আসছে। এসব জমি অধিগ্রহণ হয়ে গেলে বাসিন্দাদের আয়ের পথ বন্ধ হয়ে যাবে। বেকার হয়ে পড়বে হাজারো মানুষ। একসময় উদ্বাস্তু হয়ে তাদের ভিটেবািড় ছাড়তে হবে।
অধিগ্রহণের প্রতিবাদে ইতিমধ্যে আন্দোলনে নেমেছে স্থানীয় লোকজন। তারা মানববন্ধন করে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি দিয়েছে, সংবাদ সম্মেলন করেছে।
জেলা ভূমি অধিগ্রহণ কার্যালয় সূত্র জানায়, মাতারবাড়ীর উত্তর পাশে ১ হাজার ২০০ একর জমির ওপর ৭০০ মেগাওয়াটের (আল্ট্রাসুপার ক্রিটিক্যাল কোল ফায়ার্ড) দ্বিতীয় বিদ্যুৎ প্রকল্পটি বাংলাদেশ ও সিঙ্গাপুর সরকারের যৌথ উদ্যোগে নির্মিত হবে। বাস্তবায়ন করবে কোল পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড। জেলা প্রশাসনের ভূমি হুকুম দখল কার্যালয় ইতিমধ্যে মাতারবাড়ীর উত্তর পাশে ভূমি অধিগ্রহণের কার্যক্রম শুরু করেছে। এ ব্যাপারে গত ১২ ফেব্রুয়ারি নোটিশ জারি করা হয়।
এদিকে সরকার মাতারবাড়ীর দক্ষিণাংশে (মাতারবাড়ী ও ধলঘাটার মাঝখানে) ১ হাজার ৪১৪ একর জমির ওপর ৩৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ১২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপন করতে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে (২৪ আগস্ট ২০১৪) প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ সরকার ও জাপানের অর্থসংস্থানকারী সংস্থা জাইকার অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে কোল পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি লিমিটেড।
মাতারবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য বশির আহমদ বলেন, দ্বিতীয় বিদ্যুৎ প্রকল্পটি দক্ষিণে সরিয়ে নেওয়ার দাবি জানিয়ে গত ২৭ জানুয়ারি জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর বরাবর স্মারকলিপি পাঠানো হয়েছে। এর আগে ও পরে এলাকার মানুষ একই দাবিতে মানববন্ধন কর্মসূচি, সমাবেশ ও সংবাদ সম্মেলন করছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কারও সাড়া মিলছে না।
স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়, জনবসতির দুই পাশে দুটি বিদ্যুৎ প্রকল্প হলে ৯০ হাজার অধিবাসী ঝুঁকির মুখে পড়ে উদ্বাস্তু হবে। এ নিয়ে সাধারণ মানুষ উদ্বিগ্ন। সিকদারপাড়ার বাসিন্দা ও লবণচাষি ফরিদুল আলম (৪৫) বলেন, ‘উত্তর পাশের জমিতে লবণ চাষ করে যা আয় হয় তা দিয়ে আমাদের সংসার চলে। এখন এই জমি সরকার নিয়ে নিলে পথে বসতে হবে।’
চিংড়িচাষি নাসির উদ্দিন (৩০) বলেন, ‘উত্তর পাশের জমিগুলো এখানকার মানুষের জীবিকার প্রধান উৎস। অথচ দক্ষিণ পাশে এখনো অনেক পরিত্যক্ত অনাবাদি জমি থাকলেও তা নিচ্ছে না সরকার। আমরা এই বিদ্যুৎপ ্রকল্পটিও দক্ষিণ পাশে সরিয়ে নেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।’
এ প্রসঙ্গে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আনোয়ারুল নাসের জানান, দ্বিতীয় বিদ্যুৎ প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য জমি অধিগ্রহণের কাজ শুরু হয়েছে। এখন প্রকল্পটি অন্যত্র সরিয়ে নিলে নানা জটিলতা দেখা দিতে পারে।
প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত কোল পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের প্রকল্প পরিচালক মো. ইলিয়াছ রহমান জানান, চিহ্নিত জমিতেই দ্বিতীয় বিদ্যুৎ প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হবে। অধিগ্রহণ করা ১ হাজার ২০০ একর জমির বিপরীতে প্রায় ৫০০ জনকে ক্ষতিপূরণের টাকা দেওয়া হবে।

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন