বাবা চান ছেলে লরেন্স টপ্য তাঁর সঙ্গে কাজে যাবে। কিন্তু মায়ের স্বপ্ন ভিন্ন। ছেলে বিদ্যালয়ে গিয়ে শিক্ষার আলোয় আলোকিত হবে। বাড়াবে আদিবাসী (ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী) পরিবারের সম্মান। একদিন ছেলেকে ঠিকই ভর্তি করে দেওয়া হলো একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। কিন্তু সেখানে মায়ের ভাষাটি খুঁজে পায় না ছোট্ট ছেলেটি।
না-জানা ভাষায় লেখাপড়া করতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত আগ্রহ হারিয়ে ফেলে লরেন্স টপ্য। প্রাথমিক শিক্ষার গণ্ডি না পেরোতেই একদিন শিশুটি বাবার হাত ধরে বেরিয়ে পড়ে কাজের সন্ধানে।
শুধু লরেন্স টপ্য নয়, প্রাথমিক শিক্ষার গণ্ডি না পেরোতেই বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ছে ঠাকুরগাঁওয়ের অনেক আদিবাসী শিশু। শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্যমতে, পাঠ্যপুস্তকের পাশাপাশি শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকের নির্দেশনাও বাংলা ভাষায় হওয়ায় অধিকাংশ আদিবাসী শিশু তা বুঝতে পারে না। এতে তাদের মনে শিক্ষার প্রতি অনীহা দেখা দেয়। এভাবে একদিন সে বিদ্যালয়ে যাওয়া বন্ধ করে দেয়।
জাতীয় শিশুনীতি ২০১১, ২০১৩ সালের শিক্ষানীতির খসড়াসহ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন আইন ও সনদ অনুযায়ী, মায়ের ভাষায় শিক্ষা গ্রহণের অধিকার প্রত্যেক নাগরিকের রয়েছে। সেই তাগিদে সরকার ২০১২ সালে প্রথম দফায় পাঁচটি ভাষায় প্রাথমিক স্তরের পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন ও পড়াশোনা শুরুর উদ্যোগ নেয়। এ জন্য জাতীয় পর্যায়ে বহুভাষিক শিক্ষা (এমএলই) কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য তিনটি কমিটি গঠন করে। সে অনুযায়ী ২০১৪ সালে প্রাক্-প্রাথমিক পর্যায়ে মাতৃভাষায় শিক্ষা শুরুর পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু ২০১৩ সালের শেষ দিকে সহিংস রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের কারণ দেখিয়ে প্রথম লক্ষ্য বাস্তবায়ন করতে পারেনি সরকার।
জাতীয় আদিবাসী পরিষদ ঠাকুরগাঁও শাখা সূত্রে জানা গেছে, ঠাকুরগাঁওয়ের বিভিন্ন পল্লিতে প্রায় ৩৫ হাজার আদিবাসী পরিবার বসবাস করে। এদের মধ্যে ওঁরাও, সাঁওতাল, মুশোহর, পাহান ও মুন্ডা অন্যতম। তবে তাদের মধ্যে ওঁরাও সম্প্রদায়ের সংখ্যাই বেশি। এ অঞ্চলের আদিবাসীদের মধ্যে ওঁরাওরা কুড়ুক, সাঁওতালেরা সাঁওতালি ও পাহান-মুন্ডারা কথা বলে সাদরি ভাষায়।
গত বুধবার সকালে সরেজমিনে কথা হয় ঠাকুরগাঁওয়ের রানীশংকৈল উপজেলার রাউৎনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সঙ্গে। শিক্ষকেরা জানান, তাঁদের বিদ্যালয়ে ১৮৯ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। তাদের মধ্যে ৬৯ জন আদিবাসী। ২০১৪ সালে বিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণিতে ১৮ জন আদিবাসী শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হলেও এ বছর দ্বিতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছে ১৫ জন। এভাবে দ্বিতীয় থেকে তৃতীয় শ্রেণিতে একজন, তৃতীয় থেকে চতুর্থ শ্রেণিতে দুজন ও চতুর্থ থেকে পঞ্চম শ্রেণিতে ভর্তির সময় চারজন শিক্ষার্থী ঝরে পড়েছে।
বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া শিক্ষার্থী রাজেস মাড্ডি জানায়, বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা তার কথা ঠিকমতো বুঝতে পারতেন না। রাজেসও অনেক সময় তাঁদের কথা বুঝতে পারত না। পড়া না বোঝায় একসময় বিদ্যালয়ে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে সে।
লুকাস টপ্য নামে রাউৎনগর গ্রামের ঝরে পড়া এক আদিবাসী শিক্ষার্থীর অভিভাবক অনিল জানান, তাঁর ছেলে বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নির্দেশনা ঠিকমতো বুঝতে পারত না। তাই পড়ালেখা বন্ধ করে ছেলেকে কাজে লাগিয়ে দিয়েছেন।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মখলেসুর রহমান জানান, আদিবাসী পরিবারের শিশুরা বিদ্যালয়ে ভর্তি হলেও ভাষার কারণে পড়ালেখায় পিছিয়ে পড়ে।
গত বৃহস্পতিবার পৌর এলাকার আদিবাসী-অধ্যুষিত গোবিন্দনগর এলাকার সাঁওতাল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে জানা গেছে, বিদ্যালয়টিতে শিক্ষার্থী ৫৬৩ জন। এর মধ্যে মাত্র ১২৫ থেকে ১৫০ জন শিক্ষার্থী আদিবাসী। তৃতীয় শ্রেণির আদিবাসী শিক্ষার্থী পলক তিগ্যা জানায়, বিদ্যালয়ে ভর্তির শুরুতে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের কথা বুঝতে তার বেশ কষ্ট হতো। তবে বাংলার পরিবর্তে তাদের নিজস্ব ভাষায় পাঠ্যপুস্তক পেলে লেখাপড়া করা তাদের জন্য অনেক সহজ হতো।
জাতীয় আদিবাসী পরিষদ ঠাকুরগাঁও শাখার সাধারণ সম্পাদক বাবুল তিগ্যা বলেন, বাংলাদেশ আদিবাসী পরিষদ দীর্ঘদিন, বিশেষ করে প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে আদিবাসী ভাষায় পাঠ্যপুস্তক প্রণয়নের দাবি জানিয়ে আসছে। কিন্তু সরকার দাবি পূরণে কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছে না।
জেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মোফাজ্জল হোসেন জানান, সিদ্ধান্ত থাকলেও এ অঞ্চলের আদিবাসী শিশুদের মায়ের ভাষায় পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন করা যায়নি। তবে প্রাথমিক শিক্ষার প্রথম পর্যায়ে আদিবাসী শিশুদের নিজস্ব ভাষায় পাঠদান করা উচিত।

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন