default-image

বাংলা ভাষার প্রচার ও গবেষণা আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত এবং বিপন্ন ও বিলুপ্তপ্রায় ভাষাগুলোর গবেষণার জন্য প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের কাজ চলছে ধীরগতিতে। রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রক্রিয়া, প্রয়োজনীয় গবেষকের স্বল্পতা, অবকাঠামো নির্মাণে অসম্পূর্ণতার মতো বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে চলছে প্রতিষ্ঠানটি।
প্রাথমিক পর্যায়ে দেশের ভাষা পরিস্থিতি ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীগুলোর ভাষা পরিস্থিতি নিয়ে আঞ্চলিক পর্যায়ে সেমিনার ও গবেষণার কাজ শুরু হয়েছে। ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ভাষা-পরিচিতি: মৌলভীবাজার জেলা নামের একটি বইও ইতিমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে। এ ছাড়া গত বছর থেকে নিয়মিত ভাষাসংক্রান্ত গবেষণা ও প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রমের পরিচিতিমূলক ত্রৈমাসিক সাময়িকী মাতৃভাষা-বার্তা প্রকাশিত হচ্ছে।
উল্লেখযোগ্য বড় কাজের মধ্যে গত বছরের জুন থেকে শুরু হয়েছে ‘নৃ-বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা’ নামের একটি গবেষণা। এ বছরের জুনের মধ্যে এটি শেষ হবে। ১০টি খণ্ডে পৃথকভাবে বাংলা ও ইংরেজিতে তা প্রকাশিত হবে। এই প্রকল্পে গবেষক ও তাঁদের সহকারী মিলিয়ে ২৫ জন কাজ করছেন।
দেশের নৃ-গোষ্ঠীগুলোর ভাষিক পরিস্থিতি নিয়ে সার্বিক কোনো স্বীকৃত গবেষণা নেই। বিভিন্ন গবেষক ২৭টি থেকে ১২২টি পর্যন্ত নৃগোষ্ঠীর কথা উল্লেখ করেছেন। ইনস্টিটিউটের গবেষণায় দেশের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর প্রকৃত সংখ্যা, তাদের ভাষার পরিস্থিতি, সাংস্কৃতিক পরিচয় ও এলাকাভিত্তিক জনগোষ্ঠীর মানচিত্র প্রণয়ন করা হবে। নৃ-গোষ্ঠীগুলোর চার-পাঁচটি ভাষার নিজস্ব বর্ণমালা আছে। অপর ভাষাগুলোর বর্ণমালা প্রস্তুত করা যায় কি না, পর্যলোচনা করা হবে। ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক অধ্যাপক জীনাত ইমতিয়াজ আলী এসব তথ্য জানিয়ে প্রথম আলোকে বলেন, পরের ধাপে এসব ভাষা সংরক্ষণ এবং প্রত্যেকের মাতৃভাষায় অন্তত প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করার বাধাগুলো দূর করার উপায় খুঁজে বেরা করা হবে।
গবেষণা তেমন এগোচ্ছে না: কার্যক্রম শুরুর তিন বছর পেরিয়ে গেলেও গবেষণাকাজ খুব বেশি এগোয়নি ইনস্টিটিউটের। গবেষকদের স্বল্পতাও রয়েছে। এ ধরনের ইনস্টিটিউট দেশে আগে ছিল না বলে দক্ষ জনবলও তৈরি হয়নি। এ ছাড়া রয়েছে বহির্বিশ্বে বাংলা ভাষার প্রচার ও প্রসারের কাজ। এ সম্পর্কে অধ্যাপক জীনাত ইমতিয়াজ আলী বলেন, ‘বিদেশে বাংলাদেশের দূতাবাসের উদ্যোগে ভাষা শিক্ষাকেন্দ্র খুলে বাংলা শেখানো যায়। এ ছাড়া লোকে নিজ উদ্যোগে কোনো ভাষা শিখতে আগ্রহী হতে পরে, যদি সেই ভাষায় সমৃদ্ধ সাহিত্য বা জ্ঞান-বিজ্ঞানপ্রযুক্তির উচ্চতর, মৌলিক রচনা থাকে। এ দুটির কোনোটিই এখন পর্যন্ত আমাদের ভাষার ক্ষেত্রে নেই।’
ভবিষ্যতের পরিকল্পনা: ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে ইনস্টিটিউটকে আন্তর্জাতিক পরিসরে একটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা। এ জন্য ইউনেসকোর ‘ক্যাটাগরি-২’ মানের প্রতিষ্ঠান হিসেবে অনুমোদন লাভের চেষ্টা চলছে। ইতিমধ্যে ইউনেসকোর কাছে সরকারের পক্ষ থেকে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। এরপর ইউনেসকোর একটি পর্যবেক্ষণ দল ঢাকায় এসে ইনস্টিটিউটের অবকাঠামো, পরিকল্পনা, চলতি কার্যক্রম—এসবের ওপর একটি সুপারিশ পেশ করেছে। স্বীকৃতি পাওয়া গেলে গবেষণার তহবিল পাবে প্রতিষ্ঠানটি। এতে তরুণ গবেষকদের বৃত্তি, বিদেশি বিশিষ্ট গবেষকদের আনা যাবে বলে মনে করছে ইনস্টিটিউটটি।
তৈরি হচ্ছে পরিপূর্ণ উইনিকোড বাংলা ফন্ট: তথ্যপ্রযুক্তিতে বাংলা ভাষা ব্যবহারের সমস্যা দূর করতে অন্তত চারটি ‘ইউনিকোড ফন্ট’ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে ইনস্টিটিউটের। কেননা, এখন পর্যন্ত যে ইউনিকোড বাংলা ফন্টগুলো রয়েছে, তার কোনোটিই পরিপূর্ণ নয়। এগুলো দিয়ে সাধারণ লেখালেখি করা গেলেও বিজ্ঞানবিষয়ক কাজ করা যায় না। প্রোগ্রামিং করা চলে না। অক্ষর ভেঙে যায়। এই অসুবিধা দূর করে সব ধরনের কাজের উপযোগী ইউনিকোড ফন্ট তৈরি করে সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে।
পটভূমি: অমর একুশে ফেব্রুয়ারি ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেসকো ঘোষিত আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পায়। এর পরই তৎকালীন প্রাধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ওই বছরের ৭ ডিসেম্বর ঢাকার পল্টন ময়দানে এক জনসভায় এই ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন। এ জন্য সেগুনবাগিচায় (আগে যেখানে ছিল বিজ্ঞান জাদুঘর, শিল্পকলা একাডেমীর বিপরীতে) তিন একর জায়গা বরাদ্দ করা হয়। ২০০১ সালের ১৫ মার্চ ১২ তলা ভবন নির্মাণের জন্য ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। এ সময় জাতিসংঘের তৎকালীন মহাসচিব কফি আনানও উপস্থিত ছিলেন। এরপর ২০০৩ সালের ৬ এপ্রিল নির্মাণকাজ শুরু হলেও সরকার পরিবর্তনের কারণে কাজটি থেমে যায়। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর আবার ভবন নির্মাণ শুরু হয়। প্রথম পর্যায়ে তিনতলা পর্যন্ত নির্মাণ শেষে প্রধানমন্ত্রী ২০১০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন।
২০১০ সালের ১২ ডিসেম্বর জাতীয় সংসদে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট আইন পাস হয়। ২০১১ সালের মাঝামাঝি শুরু হয় লোকবল নিয়োগ ও ইনস্টিটিউটের কার্যক্রম শুরুর প্রস্তুতি। বর্তমানে গবেষণা, প্রশাসনসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী মিলিয়ে ৪০ জন কর্মরত আছেন। ইনস্টিটিউটের প্রথম তলায় আন্তর্জাতিক ভাষা জাদুঘর এবং ওপরের তলায় রয়েছে প্রশাসনিক শাখা, গবেষণাকেন্দ্র ও মিলনায়তন। মিলনায়তনটি অসম্পূর্ণ ছিল। বর্তমানে ব্যবহারের উপযোগী করে তোলা হচ্ছে। এখন চলছে দ্বিতীয় পর্যায়ের নির্মাণকাজ।

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন