বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

পশুর হাটের ক্ষেত্রে কিছু নির্দেশনা দিয়ে রাখা আর মাইকিংয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে স্বাস্থ্যবিধি। অন্যদিকে ঈদ সামনে রেখে গ্রামের পথে ছুটছে হাজার হাজার মানুষ। সেখানেও স্বাস্থ্যবিধি খুব একটা মানা হচ্ছে না। ইতিমধ্যে গ্রামগঞ্জে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। বেশি ছড়াচ্ছে করোনার ডেলটা ধরন (ভারতে উৎপত্তি)।

সব মিলিয়ে জনস্বাস্থ্যবিদেরা বলছেন, শিগগিরই সংক্রমণ পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ার আশা নেই। বরং ঈদের পর অবস্থার আরও অবনতি হতে পারে।

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা মুশতাক হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, এখন যেভাবে লোকসমাগম হচ্ছে, সংক্রমণে তার প্রভাব দেখা যাবে ঈদের পরে। দুই সপ্তাহের বিধিনিষেধের প্রভাবে ঈদের আগে যদি সংক্রমণ না কমে, তাহলে ঈদের পর জ্যামিতিক হারে রোগী বাড়ার আশঙ্কা আছে।

ঈদুল আজহার সময় গত বছরও পশুর হাটের অভিন্ন চিত্র ছিল। কিন্তু গতবার ঈদের পর সংক্রমণ খুব একটা বাড়তে দেখা যায়নি। তাহলে এবার শঙ্কা কেন, এমন প্রশ্নের জবাবে মুশতাক হোসেন বলেন, এবারের পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। ইতিমধ্যে গ্রামগঞ্জে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। ‘মিউটেশনের’ মাধ্যমে ভাইরাসের ছড়িয়ে পড়ার ক্ষমতা বেড়েছে। ভারতে দেখা গেছে, ডেলটা ধরন ছড়িয়ে পড়ার পর গ্রামগঞ্জে শ্রমজীবী মানুষ আগের তুলনায় অনেক বেশি আক্রান্ত হয়েছেন।

রোগী বাড়ছে দ্রুত

দেশে গত বছরের ৮ মার্চ প্রথম করোনার সংক্রমণ শনাক্ত হয়। পরিস্থিতি বিভিন্ন সময় ওঠা-নামা করেছে। তবে বাংলাদেশ সবচেয়ে খারাপ সময় পার করছে এখন। চলতি জুলাইয়ের প্রথম ১৮ দিনে প্রায় দুই লাখ রোগী শনাক্ত হয়েছে। দেশে মোট শনাক্ত করোনা রোগীর সংখ্যা ১০ লাখ ছাড়িয়েছিল ৯ জুলাই। মোট রোগী ৯ লাখ থেকে ১০ লাখ ছাড়াতে সময় লেগেছিল ১০ দিন। আর এর পরের ৯ দিনে শনাক্ত হয়েছে মোট ১ লাখ ৩ হাজার ৪৪৬ নতুন রোগী।

দেশে গত মার্চে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হয়। মাঝে পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এসেছিল। পবিত্র ঈদুল ফিতরের পর থেকে দেশে সংক্রমণ বাড়তে থাকে। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে পরিস্থিতির অবনতি হয়। জুন নাগাদ সারা দেশেই সংক্রমণ বাড়তে শুরু করে।

সম্প্রতি আইইডিসিআর জিনোম সিকোয়েন্সিং করে জানায়, গত মাসে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে ৭৮ শতাংশের শরীরে ডেলটা ধরন পাওয়া গেছে।

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে কঠোর বিধিনিষেধ বা লকডাউনের মতো পদক্ষেপের প্রভাব কতটুকু, তা বোঝা যায় এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার সপ্তাহ দুয়েক পর থেকে। সংক্রমণ তীব্র আকার ধারণ করতে শুরু করলে ১ জুলাই থেকে দুই সপ্তাহের কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছিল সরকার। তা পালনও হয়েছে। কিন্তু সংক্রমণচিত্রে কোনো ইতিবাচক প্রভাব এখনো দেখা যায়নি। এখনো পরীক্ষার বিপরীতে রোগী শনাক্তের হার ২৯ শতাংশের ওপরে। প্রতিদিন ১১ হাজারের বেশি নতুন রোগী শনাক্ত হচ্ছেন, মৃত্যু হচ্ছে দুই শতাধিক মানুষের।

বাংলাদেশ বেশ কিছুদিন ধরেই সপ্তাহওয়ারি হিসাবে নতুন রোগীর সংখ্যা ও মৃত্যুর সংখ্যার দিক দিয়ে বৈশ্বিক তালিকায় ওপরের দিকে অবস্থান করছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, গত এক সপ্তাহে (১৬ জুলাই পর্যন্ত হালনাগাদ) সবচেয়ে বেশি নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছেন, এমন দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১২তম। আর মৃত্যুর দিক দিয়ে বাংলাদেশ ছিল এই তালিকায় নবম স্থানে।

সরেজমিন গরুর হাট

রাজধানী ঢাকা ও ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জেলায় পশুর হাটগুলোতে যথাযথভাবে স্বাস্থ্যবিধি প্রতিপালিত হচ্ছে না। যদিও গত এপ্রিলে আইইডিসিআরের এক গবেষণায় দেখা গিয়েছিল, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ছড়ানোর সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ স্থান বাজার ও গণপরিবহন।

রাজধানীর অন্যতম বড় পশুর হাট গাবতলীতে। সেখানে গতকাল বেলা একটা থেকে বিকেল পৌনে চারটা পর্যন্ত ঘুরে দেখা যায়, ক্রেতা-বিক্রেতাদের বেশির ভাগেরই মাস্ক থুতনিতে। কেউ কেউ মাস্ক ছাড়াই হাটে ঘোরাঘুরি করছেন। স্বেচ্ছাসেবকেরা মাঝেমধ্যে মাস্ক পরতে অনুরোধ করছেন। এই অনুরোধ কেউ শুনছেন তো কেউ শুনছেন না।

একই চিত্র পুরান ঢাকার ধুপখোলা মাঠ, ধোলাইখাল এবং যাত্রাবাড়ীর শনির আখড়ায়। শনির আখড়ায় বেলা সাড়ে ১১টার দিকে গিয়ে দেখা যায়, ন্যূনতম স্বাস্থ্যবিধি সেখানে মানা হচ্ছে না। না আছে মানুষের শরীরের তাপ পরিমাপের যন্ত্র, না আছে জীবাণুনাশক বা হ্যান্ড স্যানিটাইজারের ব্যবস্থা। মাঝেমধ্যে হাটের ইজারাদারের কর্মীরা মাইকে শুধু মাস্ক ছাড়া কাউকে প্রবেশ না করতে অনুরোধ করছেন। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, অনেকের মুখেই মাস্ক নেই। ধূপখোলা ও ধোলাইখালেও স্বাস্থ্যবিধি মানার ক্ষেত্রে উদাসীনতা দেখা গেছে।

ধোলাইখাল গরুর হাটে আবদুর রহমান নামের একজন স্বেচ্ছাসেবী প্রথম আলোকে বলেন, এত বড় গরুর হাটে অনেকে স্বাস্থ্যবিধি মানছেন, অনেকে মানছেন না। তবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার অনুরোধ করা হচ্ছে।

রাজধানীর নয়টি পশুর হাটে করোনার সংক্রমণ শনাক্তে অ্যান্টিজেন পরীক্ষা করছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক। গত শনি ও রোববার—এই দুই দিনে সংস্থাটি মোট ৯২ জনের নমুনা পরীক্ষা করে। এর মধ্যে ছয়জনের দেহে করোনার সংক্রমণ শনাক্ত হয়।

অনলাইন বুলেটিনে গতকাল সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মুখপাত্র নাজমুল ইসলাম বলেন, ক্রেতা-বিক্রেতা সবারই সচেতনতা ও দায়িত্বশীলতা গুরুত্বপূর্ণ। প্রত্যেকেই দায়িত্ববান নাগরিক। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সবারই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। সবাই যদি যাঁর যাঁর দায়িত্ব পালন করেন, তাহলে স্বাস্থ্যবিধি আরেকটু ভালোভাবে প্রতিপালিত হবে।

মৃত্যু আরও ২২৫ জনের

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ৩৯ হাজার ৮০৬ জনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে ১১ হাজার ৫৭৮ জনের দেহে সংক্রমণ শনাক্ত হয়। এ নিয়ে দেশে শনাক্তের সংখ্যা ১১ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। শুরু থেকে গতকাল পর্যন্ত দেশে মোট ১১ লাখ ৩ হাজার ৯৮৯ জনের দেহে সংক্রমণ শনাক্ত হয়। গত ২৪ ঘণ্টায় করোনায় আক্রান্ত আরও ২২৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে মোট ১৭ হাজার ৮৯৪ জনের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। আর মোট সুস্থ হয়েছেন ৯ লাখ ৩২ হাজার ৮ জন।

রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকায় হাসপাতালে চিকিৎসাসেবার ওপর ব্যাপক চাপ তৈরি হয়েছে। জেলা হাসপাতালে চিকিৎসকেরা গুরুতর অবস্থা তৈরি হওয়া রোগীকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) নেওয়ার জন্য বললেও শয্যা খালি পাওয়া যাচ্ছে না। অপেক্ষায় থাকতে থাকতে রোগীর মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে।

পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিভাগীয় কর্মকর্তারাও। বরিশাল বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক শ্যামল কৃষ্ণ মণ্ডল প্রথম আলোকে বলেন, ঈদে প্রচুর লোক গ্রামে ফিরছে। অনেক ক্ষেত্রেই তারা স্বাস্থ্যবিধি মানছে না। সাধারণ মানুষ স্বাস্থ্যবিধি মানার বিষয়ে সচেতন না হলে সংক্রমণ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন