default-image

জাতীয় পার্টির সাবেক সাংসদ পলাতক ইঞ্জিনিয়ার আবদুল জব্বারকে (৮২) মুক্তিযুদ্ধকালের মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে আমৃত্যু কারাদণ্ডাদেশ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। ট্রাইব্যুনাল বলেছেন, জব্বার মৃত্যুদণ্ড পাওয়ার মতো অপরাধ করেছেন, কিন্তু বয়স বিবেচনায় তাঁর সাজা কমিয়ে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিমের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল-১ গতকাল মঙ্গলবার এ রায় দেন। এটি মানবতাবিরোধী অপরাধের ১৭তম মামলার রায়। এর মধ্যে ট্রাইব্যুনাল-১ আটটি ও ট্রাইব্যুনাল-২ নয়টি মামলার রায় দিয়েছেন।
গতকাল রায়ে ট্রাইব্যুনাল বলেন, জব্বারের বিরুদ্ধে গঠন করা পাঁচটি অভিযোগের সবই সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। এর মধ্যে প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় ও পঞ্চম অভিযোগে গণহত্যা, হত্যা, অপহরণ, নিপীড়ন, লুণ্ঠন ও অগ্নিসংযোগের দায়ে তাঁকে আমৃত্যু কারাদণ্ডাদেশ দেওয়া হয়। এ চারটি অভিযোগে বলা হয়েছে, একাত্তরের ১৬ মে পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ার ফুলঝুড়ি গ্রামের আবদুর রাজ্জাক বিশ্বাসকে হত্যা এবং নাথপাড়া ও কুলুপাড়ার শতাধিক বাড়ি লুণ্ঠন ও অগ্নিসংযোগ, ১৭ মে ফুলঝুড়ি গ্রামের সারদা কান্তি পাইককে হত্যা এবং গ্রামের প্রায় ৩৬০টি ঘরবাড়ি লুণ্ঠন ও অগ্নিসংযোগ, ২২ মে মঠবাড়িয়ার নলীগ্রামে সুখনাথসহ ১২ জনকে গুলি করে হত্যা এবং ৬ ও ৭ অক্টোবর আঙ্গুলকাটা ও মঠবাড়িয়া থেকে অপহৃত ৩৭ জন হিন্দু ধর্মাবলম্বীকে অপহরণের পর ২২ জনকে হত্যায় জব্বার অংশ নিয়েছেন বা পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকারদের সাহায্য করেছেন। আর চতুর্থ অভিযোগে বলা হয়েছে, একাত্তরের মে মাসের শেষ সপ্তাহে ফুলঝুড়ি গ্রামের প্রায় ২০০ হিন্দুকে ধর্মান্তরিত হতে বাধ্য করেন জব্বার। এ অপরাধের দায়ে তাঁকে ২০ বছরের কারাদণ্ড ও ১০ লাখ টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও দুই বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। প্রয়োজনে ইন্টারপোলের সাহায্য নিয়ে পলাতক জব্বারকে খুঁজে বের করে সাজা কার্যকর করতে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ও স্বরাষ্ট্রসচিবকে নির্দেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।
রায়ে ট্রাইব্যুনাল বলেন, আসামি জব্বার মুক্তিযুদ্ধকালে গণহত্যা ও হত্যার মতো মানবতাবিরোধী অপরাধে অংশগ্রহণ ও সহযোগিতা করে গর্হিত অপরাধ করেছেন। তাঁকে সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড দিলেই ক্ষতিগ্রস্তদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা যাবে। কিন্তু সেই সঙ্গে এটাও অস্বীকার করার উপায় নেই যে আসামির বয়স এখন ৮২ বছরেরও বেশি। আসামির অতিরিক্ত বয়স সব সময় সাজা প্রশমনের ক্ষেত্রে একটি বড় কারণ। ট্রাইব্যুনাল সর্বসম্মতভাবে মনে করে, বয়োবৃদ্ধ জব্বারকে আমৃত্যু কারাদণ্ডাদেশ দিলেই ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে। তবে বয়সের জন্য আসামির সাজা কমানো হলেও এতে তাঁর অপরাধ কোনোভাবেই কমছে না।
এর আগে মৃত্যুদণ্ড পাওয়ার মতো অপরাধ করলেও বয়সের বিবেচনায় সর্বোচ্চ সাজা দেওয়া হয়নি জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির গোলাম আযম এবং সাবেক মন্ত্রী ও বিএনপির নেতা আবদুল আলীমকে। গোলাম আযমকে বয়স বিবেচনায় ৯০ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছিলেন ট্রাইব্যুনাল-১, আর পক্ষাঘাতগ্রস্ত আবদুল আলীমকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দিয়েছিলেন ট্রাইব্যুনাল-২। দুজনই কারাভোগ করা অবস্থায় মারা গেছেন।
মুক্তিযুদ্ধকালে মঠবাড়িয়া শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান আবদুল জব্বার ১৯৮৬ ও ১৯৮৮ সালে জাতীয় পার্টির সাংসদ ছিলেন। জব্বারকে পলাতক ঘোষণা করে গত বছরের ১৪ আগস্ট তাঁর বিরুদ্ধে পাঁচটি অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে এ মামলার বিচার শুরু হয়। রাষ্ট্রপক্ষে ২৪ জন সাক্ষ্য দেন। জব্বারের পক্ষে মামলা পরিচালনা করেন রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী আবুল হাসান।
রায়ের প্রতিক্রিয়ায় রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি জাহিদ ইমাম সাংবাদিকদের বলেন, ‘আদালতের রায় মানতেই হবে। আমরা মৃত্যুদণ্ড চেয়েছিলাম। পূর্ণাঙ্গ রায় দেখে আপিলের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেব।’ আসামিপক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী আবুল হাসান বলেন, জব্বার আত্মসমর্পণ করে বিচারের মুখোমুখি হলে খালাস পেতেন। আসামি না থাকায় মামলা লড়তে তাঁর অসুবিধা হয়েছে।
পলাতক জব্বার এখন কোথায় আছেন, এ বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষ কিছু জানাতে পারেনি। তবে তদন্ত সংস্থার একটি সূত্র জানিয়েছে, জব্বার যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় বসবাস করছেন।

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন