default-image

বাংলাদেশ শিশু একাডেমী ছোট শিশুদের নিয়ে মানববন্ধন করেছে। তাদের হাতে ধরা ব্যানারে লেখা ‘সন্ত্রাস ও শিশু হত্যার প্রতিবাদে মানববন্ধন’। আর ফেস্টুনে লেখা ‘আমরা স্কুলে যেতে চাই, আমাদের উপর পেট্রোলবোমা মারবেন না’। আরেকটিতে লেখা ‘আমরা শিশু, আমরা রাজনীতি করি না, আমাদের উপর পেট্রোলবোমা মারবেন না’।
গত শনিবার শিশু একাডেমীর মূল ফটকের সামনে এই মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। এ ধরনের মানববন্ধন এখন রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক পার হয়ে পৌঁছে যাচ্ছে গুলশানে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কার্যালয়ের সামনে পর্যন্ত। ঢাকার বাইরেও শিশুদের নিয়ে মানববন্ধন হচ্ছে। আবার রাজনৈতিক ব্যানারে পরিচালিত বিভিন্ন মানববন্ধনেও শিশুদের দেখা যাচ্ছে। এমনকি হরতাল-অবরোধের বিপক্ষে রোববার ১৪ দল যে মানববন্ধন করেছে, শ্যামলীতে স্কুলের পোশাক পরা শিশুদের দেখা গেছে।
শিশুদের দিয়ে এ ধরনের মানববন্ধন করানো কতটা সঠিক, তা নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে রাজনীতিতে শিশুদের ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, তা-ও প্রশ্ন হিসেবে দেখা দিয়েছে।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাকে পেট্রলবোমা মেরো না—শিশুর গলায় এ ধরনের প্ল্যাকার্ড শক্ত বার্তা দিচ্ছে। আবার একইভাবে এ কথা বলার জন্য বা পেট্রলবোমার নৃশংসতা বন্ধে শিশুকেই কেন ব্যবহার করতে হবে? এ দায়িত্ব তো বড়দেরই নেওয়া উচিত। যেকোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেই শিশুদের ব্যবহার করা উচিত নয়। এ ধরনের ব্যবহার শিশুদের সর্বোত্তম স্বার্থের পরিপন্থী। ভয়াবহ পরিবেশ থেকে যতটা সম্ভব শিশুদের দূরে রাখতে হবে। শিশুরা নিজেরাই যদি তাদের অধিকার ব্যক্ত করতে চায়, তা ভিন্ন প্রসঙ্গ। তবে সব সময়ই মনে রাখতে হবে, শিশুদের কোনোভাবেই রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না।’
মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ‘জাতীয় শিশুনীতি, ২০১১’তে শিশুর সুরক্ষা হিসেবে শিশুদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যবহার, প্রলোভন বা জোরপূর্বক জড়িত করা যাবে না বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের চেয়ারম্যান এমরানুল হক চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, বর্তমানের রাজনৈতিক উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে শিশুদের দিয়ে যেভাবে মানববন্ধন করানো হচ্ছে, তা সত্যিকার অর্থেই উদ্বেগজনক। এভাবে শিশুদের রাজনৈতিক বর্ম বা ঢাল হিসেবে ব্যবহার যে করা হচ্ছে না, তা-ও জোর দিয়ে বলা যাচ্ছে না। এ ধরনের মানববন্ধনে অংশগ্রহণের পর শিশুদের কী ধরনের মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়া হচ্ছে, তা-ও বিবেচনায় নিতে হবে।
গত রোববার ঢাকা-১৫ আসনের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রায় ৪০ হাজার শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবক বিএনপি-জামায়াতের হরতাল ও অবরোধের প্রতিবাদে স্মরণকালের বিশাল মানববন্ধন করেছেন বলে এক বিজ্ঞপ্তিতে দাবি করা হয়েছে। ওই আসনের সাংসদ কামাল আহমেদ মজুমদার এ কর্মসূচির নেতৃত্ব দেন। এতে ওই এলাকার প্রায় সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিল বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
গত এক সপ্তাহে প্রথম আলোসহ বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত সংবাদ ও ছবি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, পুরো সপ্তাহেই দেশের কোনো না কোনো জায়গায় শিশুরা মানববন্ধনে দাঁড়িয়েছে। চার ফেব্রুয়ারি ক্যামব্রিয়ান স্কুল অ্যান্ড কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা খালেদা জিয়ার কার্যালয়ের সামনে মানববন্ধন করে। মিরসরাইয়ের করেরহাট মাদ্রাসার মেয়েরা বোরকা ও সাদা স্কার্ফে মুখ ঢেকে মানববন্ধন করে। ৬ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ বস্তিবাসী ইউনিয়ন প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন করে। সেখানে ৯ থেকে ১০ বছরের এক শিশুর হাতের পোস্টারে লেখা ‘খুন, সন্ত্রাস, নাশকতা বন্ধ করো’। ৭ ফেব্রুয়ারি প্রেসক্লাবের সামনে জনতার প্রতিবাদ ব্যানারে উপস্থিত এক শিশুর গলায় ঝোলানো প্ল্যাকার্ডে ইংরেজিতে লেখা ‘স্টপ বার্নিং কিডস’। এ ছাড়া সপ্তাহের বিভিন্ন দিনে বাংলাদেশ আওয়ামী স্বাধীনতা লীগ, সাংসদ আ ক ম বাহাউদ্দিন বাহারের আহ্বানে অনুষ্ঠিত মানববন্ধনে ছিল শিশুদের উপস্থিতি।
আবার আমার অধিকার ফাউন্ডেশন নামের একটি সংগঠনের মানববন্ধনে শিশুরা স্কুলের পোশাক পরে বই ও খাতায় কালো ফিতা বেঁধে মানববন্ধন করেছে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমীর করা মানববন্ধনে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি এবং চেয়ারম্যান কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেনও উপস্থিত ছিলেন।
প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি বর্তমান পরিস্থিতিতে শিশুরা মানববন্ধন করছে, একে কোনোভাবেই রাজনৈতিক কাজে শিশুদের ব্যবহার হিসেবে দেখতে চাইছেন না। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘বর্তমানের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখন শিশুদেরই হত্যা করা হচ্ছে। পুড়িয়ে মারা হচ্ছে। পরীক্ষা দিতে দিচ্ছে না। শিশুরা এসব ঘটনার প্রতিবাদ হিসেবেই মানববন্ধন করছে। শিশুদের দিয়ে মানববন্ধন করানো হচ্ছে দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য। এতে করেও যদি খালেদা জিয়ার মন নরম হয়। তাই এ ধরনের প্রতিবাদকে রাজনীতির সঙ্গে গুলিয়ে ফেললে চলবে না।’
কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন বলেন, মানববন্ধনে দাঁড়িয়ে এক শিশু কেঁদে ফেলল। পাঁচ জানুয়ারি তার প্রথম স্কুল ছিল। সে যেতে পারেনি। এই শিশুকে কিন্তু এ কথা বলার জন্য কেউ শিখিয়ে দেয়নি। আর তারা মানববন্ধনে রাজনীতি বা বোমার কথা বলেনি। তারা বলেছে তারা স্কুলে যেতে চায়। তিনি শিশুদের যথাযথ নিরাপত্তা নিশ্চিত করেই এ ধরনের মানববন্ধন আয়োজন করার জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রতি আহ্বান জানান।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক চিকিৎসক মো. তাজুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, শিশুদের দিয়ে এ ধরনের মানববন্ধন করানোর পেছনে যুক্তি দেওয়া হচ্ছে যে তারা তাদের অধিকার আদায় করতে চাইছে। এই যুক্তিটা আরও ভয়াবহ। শিশুরা পেট্রলবোমায় দগ্ধ হচ্ছে, শিক্ষাবঞ্চিত হচ্ছে—এর পেছনেও রয়েছে রাজনীতি। অর্থাৎ তাদের বিকৃত রাজনৈতিক দর্শনের মধ্যে ঢোকানো হচ্ছে একটি আদর্শিক মোড়কে।
তাজুল ইসলাম আরও বলেন, ‘কৈশোর হচ্ছে শিশুদের মানস গঠনের সময়। এ সময় আমরা তাদের যে ধরনের আদলে গড়তে চাই, সেভাবেই গড়ে তোলা সম্ভব। আর এ সুযোগটাকেই আমরা কাজে লাগাতে চাইছি। জঙ্গিরা মাদ্রাসার শিশুদের ব্যবহার করে। বিভিন্ন দলের রাজনৈতিক নেতারা টাকাপয়সার বিনিময়ে পথশিশু বা বখে যাওয়া শিশুদের দিয়ে আগুন লাগানোসহ বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করে। এখন শিশুদের মানববন্ধনে দাঁড় করানোর মাধ্যমে নতুনভাবে ব্যবহার করা শুরু হয়েছে। এই ব্যবহৃত শিশুরা একধরনের মনোবৈকল্যের মধ্য দিয়ে বড় হবে। পঙ্কিলতার আবর্তে পড়ে তারা দেশের উন্নয়ন নিয়ে চিন্তা করতে পারবে না। নৈতিক পথে চলতে পারবে না। এটা একটি জাতির জন্য ভয়াবহ পরিস্থিতির জন্ম দেবে। কেননা, এই শিশুরাই দেশের ভবিষ্যৎ।’

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন