মানুষকে কাঁদিয়ে, শোকে ভাসিয়ে পৃথিবী থেকে চির বিদায় নিল শিশু জিহাদ। গতকাল রোববার শরীয়তপুরে দাফন করা হয় তার লাশ। বিক্ষুব্ধ মানুষ তার মৃত্যুর জন্য দায়ী ব্যক্তিদের শাস্তিরও দাবি জানিয়েছে।

ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাইপে পড়ার দুই ঘণ্টার মধ্যে জিহাদের মৃত্যু হয়েছে। পানিতে ডুবে সে মারা গেছে। মাথায়ও আঘাত রয়েছে।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হিমঘর থেকে গতকাল সকাল নয়টার দিকে জিহাদের লাশ মর্গে নেওয়া হয় ময়নাতদন্তের জন্য। ঢাকা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান হাবিবুজ্জামান চৌধুরীর নেতৃত্বে তিন সদস্যের মেডিকেল বোর্ড ময়নাতদন্ত করে। পরে নিজ কক্ষে সংবাদ ব্রিফিংয়ে হাবিবুজ্জামান বলেন, জিহাদ পানিতে ডুবে মারা গেছে। তবে তার মাথার সামনে ও পেছনে আঘাতের চিহ্ন আছে। ওই আঘাতের কারণেই তার মৃত্যু হতে পারত। ধারণা করা হচ্ছে, পাইপে পড়ার দুই ঘণ্টার মধ্যেই তার মৃত্যু হয়েছে।

জুস খাওয়ার কোনো আলামত পেয়েছেন কি না, জানতে চাইলে হাবিবুজ্জামান বলেন, কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। পুলিশকে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন দিয়ে দেওয়া হয়েছে।

রাজধানীর শাহজাহানপুরে গত শুক্রবার বিকেল চারটার দিকে খেলতে গিয়ে রেলওয়ে পাম্পের পরিত্যক্ত পানির পাইপে পড়ে যায় চার বছরের জিহাদ। শুরু হয় উদ্ধার তৎপরতা। ঘটনাস্থলে জড়ো হয় অসংখ্য মানুষ। এ খবর ছড়িয়ে পড়ায় সারা দেশের মানুষের নজর কেড়ে নেয় ঘটনাটি। তাকে জীবিত উদ্ধারের জন্য প্রার্থনাও শুরু হয়। রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষায় থাকে মানুষ। একপর্যায়ে বলা হয়, ভেতরে কোনো শিশু নেই। ঘটনাটি ‘গুজব’। ২৩ ঘণ্টা পর শনিবার বেলা তিনটার দিকে উদ্ধার অভিযান স্থগিত করে ফায়ার সার্ভিস। এর কিছুক্ষণ পরই খাঁচার সাহায্যে জিহাদকে তুলে আনে স্বেচ্ছাসেবীরা। নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এই ঘোষণা শোকার্ত করে তোলে মানুষকে।

শনিবার সন্ধ্যায় শাহজাহানপুর থানার উপপরিদর্শক মো. আবু জাফরের করা লাশের সুরতহাল প্রতিবেদনে বলা হয়, বুকে, হাঁটুতে, মাথার পেছনে, কপালের বাঁ পাশে ও চোখের ওপর ছিলে যাওয়ার চিহ্ন রয়েছে।

ময়নাতদন্ত শেষে জিহাদের লাশ নিয়ে স্বজনেরা রওনা হন গ্রামের বাড়ি শরীয়তপুরের উদ্দেশে। তাকে শেষবারের মতো দেখতে শাহজাহানপুরে বাসার সামনে ছিল অসংখ্য মানুষের ভিড়। কিন্তু সময়স্বল্পতার কারণে লাশ সেখানে নেওয়া হয়নি।

চোখে পানি, মনে ক্ষোভ: জিহাদের লাশ শরীয়তপুরে নেওয়ার খবর আগেই পৌঁছে যায় গোসাইরহাট উপজেলার নাগেরপাড়া গ্রামের বাড়িতে। মাইকে এ খবর প্রচার করা হয়। তাই দুপুর থেকেই সেখানকার মানুষ অপেক্ষায় থাকে লাশ আসার। বিকেল সাড়ে চারটার দিকে লাশবাহী গাড়ি পৌঁছায় নাগেরপাড়া বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয় মাঠে। তখন মাঠে হাজারো মানুষ। অনেকে অঝোরে কাঁদতে থাকেন। এ করুণ মৃত্যুর জন্য দায়ী ব্যক্তিদের শাস্তির দাবিতে বিক্ষোভও করেন অনেকে। বিকেল পাঁচটার দিকে ওই মাঠে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। সন্ধ্যা ছয়টার দিকে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। জিহাদের প্রথম জানাজা হয় বিকেল চারটার দিকে ডামুড্যা উপজেলার শীতলকাঠি গ্রামে নানার বাড়িতে।

নাগেরপাড়া গ্রামে গতকাল গিয়েছিলেন শরীয়তপুরের জেলা প্রশাসক রাম চন্দ্র দাস, গোসাইরহাটের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কামরুন্নাহার, সহকারী পুলিশ সুপার সুমন দেবসহ অনেকেই। জেলা প্রশাসক বলেন, ‘জিহাদের এমন মর্মান্তিক মৃত্যুতে আমরা গভীর শোকাহত। দাফন সম্পন্ন করার জন্য তার পরিবারকে জেলা প্রশাসন থেকে ২০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে।’

দুপুরে নাগেরপাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, জিহাদের দাদা আজিজ ফকির, চাচা রতন ফকির, ফুফু সুফিয়া বেগম বিলাপ করছেন। বাড়ির দক্ষিণ কোণে কবর খোঁড়া হয়েছে।

আজিজ ফকির বলেন, মানুষের এমন উদাসীনতা ও অসর্তকতায় আর যেন কাউকে স্বজন না হারাতে হয়।

নাগেরপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এনায়েত করিম বলেন, ‘জিহাদের এমন মৃত্যুতে এলাকার সব মানুষ শোকে কাতর। রেলওয়ের কর্মকর্তা ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের উদাসীনতায় আমরা ক্ষুব্ধ। এ ঘটনায় দায়ী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত।’

স্মৃতিস্তম্ভ করার দাবি: রেলওয়ের ওই পাম্প ঘিরে গতকালও ছিল মানুষের ঢল। দূরদূরান্ত থেকে মানুষ এসেছেন পাইপটি দেখতে। কেউ কেউ দোষীদের শাস্তির দাবি জানাচ্ছেন। কেউ কেউ পাইপটিকে ঘিরে স্মৃতিস্তম্ভ তৈরির দাবি জানালেন।

দুপুরে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, পাম্পটির আশপাশে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। জিহাদের বাসায় কেউ নেই। সবাই লাশ নিয়ে গ্রামের বাড়ি গেছেন।

পাম্পের পাশে দাঁড়ানো এক যুবক বললেন, ‘জিহাদের ঘটনা সারা দেশের মানুষকে নাড়া দিয়েছে। সে এখন সতর্কতার প্রতীক। তাই পাইপটিকে ঘিরে স্মৃতিস্তম্ভ করা দরকার। এর মাধ্যমে তার প্রতি একদিকে যেমন আমরা স্নেহ-ভালোবাসা জানাতে পারব, অন্যদিকে স্মৃতিস্তম্ভটি এই বার্তা দেবে যে, যেন কারও অবহেলার কারণে এ ধরনের আর কোনো ঘটনা না ঘটে।’

গ্রেপ্তার নেই: জিহাদের মৃত্যুর ঘটনায় করা মামলার দুই আসামি রেলওয়ের উপসহকারী প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর আলম ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এসআর হাউসের মালিক আবদুস সালামকে গতকাল রাত পর্যন্ত গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।

জানতে চাইলে পুলিশের মতিঝিল বিভাগের উপকমিশনার আনোয়ার হোসেন প্রথম আলোকেবলেন, ঘটনার পর আসামিরা পালিয়ে গেছেন। তাঁদের গ্রেপ্তারে চেষ্টা চলছে।

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন