default-image

১৯৫২ সালের বিস্ফোরণপর্ব ও রক্তস্নাত অধ্যায় এক দিনে হয়নি। তা ছিল দীর্ঘদিনের সংগ্রাম ও সাধনার ফসল। ভাষাসংগ্রামের এই দীর্ঘ ইতিহাসকে ভুলে গেলে চলবে না।

১৯৫২ সালের ৩১ জানুয়ারি আমরা ঢাকা বার লাইব্রেরি হলে সকলে একত্র হয়ে একটা সভা করলাম। সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক করা হলো আমাকেই। সভায় আমি ২১ ফেব্রুয়ারি ধর্মঘট সাফল্যমণ্ডিত করার জন্য কী কী পদক্ষেপ ও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, সে সম্পর্কে বক্তৃতা করি। আমার বক্তব্যে উদ্ভূত পরিস্থিতির ওপরে আমার মতামত প্রকাশ করে বলি, ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করা আমার মনে হয় সমীচীন হবে না। কারণ, সরকার আইন ভঙ্গের নামে সকল নেতাকে গ্রেপ্তার করে আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা করবে। এতে করে আন্দোলন স্তিমিত হয়ে যাবে এবং গণতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হবে। প্রবীণ নেতারা অনেকেই ১৪৪ ধারা ভঙ্গ না করার জন্য বক্তব্য রাখেন।

[২১ ফেব্রুয়ারি ভোরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের আমতলার] সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো ১০ জনের দল করে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করা হবে। তদনুযায়ী প্রতি দলে ১০ জন করে ছাত্র বিশ্ববিদ্যালয় গেট দিয়ে রাস্তায় নেমে এলে তাদের পুলিশ ট্রাকে তুলে নেয়। চার-পাঁচ দল রাস্তায় বের হওয়ার পর পুলিশ টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করে। পুলিশ বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে ঢুকে পড়ে এবং লাঠিচার্জ করতে থাকে। এতে ছাত্র–জনতা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। আমি আহত ছাত্রদের সাহায্যে এগিয়ে যাই এবং আমরা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার স্লোগান দিতে দিতে মেডিকেল কলেজ হোস্টেলে যাই।

মেডিকেল কলেজ হোস্টেলের সামনে বিপুলসংখ্যক লোকের সমাবেশ ঘটে। পুলিশি নির্যাতনের বিরুদ্ধে উপস্থিত ছাত্র-জনতার মধ্যে প্রচণ্ড ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। জনতা পুলিশের ওপর ব্যাপকভাবে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করতে থাকে। পুলিশ রাস্তায় ফায়ারিং পজিশন নেয়। তাতে বিক্ষু্ব্ধ ছাত্র-জনতা পুলিশের প্রতি আরও মারমুখী হয়ে ওঠে। ছাত্রসভা অল্প সময়ের মধ্যেই শেষ হয়ে যায়। বিকেলে পরিষদের অধিবেশন শুরুর আগে আবার উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।

বিজ্ঞাপন

অধিবেশন শুরু হওয়ার কথা ছিল ৩টা ৩০ মিনিটে। এর আগেই মেডিকেল কলেজ হোস্টেলে অসংখ্য ছাত্র-জনতার সমাবেশ এবং প্রচণ্ড ভিড় পরিলক্ষিত হয়। পুলিশ তখন মেডিকেল কলেজের সব রাস্তা ঘেরাও করে রাখে। বেলা তিনটার পর চরম উত্তেজনার মুখে ছাত্ররা পুলিশের ওপর ইটপাটকেল ছুড়তে থাকে। পুলিশ ছাত্রদের দিকে যখন বন্দুক উঁচিয়ে ধরে, তখন ছাত্ররা আরও উত্তেজিত হয়ে বেশি বেশি ইটপাটকেল ছুড়তে থাকে এবং মাইকে নানা জ্বালাময়ী স্লোগান দিতে থাকে। এই চরম উত্তেজনার মুখে হঠাৎ বিকেল চারটার দিকে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ কোরাইশি পুলিশকে গুলি চালানোর নির্দেশ দেন। সিটি এসপি মাসুদ মাহমুদের নেতৃত্বে পুলিশ মেডিকেল কলেজের হোস্টেলের চারদিকে নির্বিচারে গুলিবর্ষণ শুরু করে।

আমার পেছনে হোস্টেলের বারান্দার সিঁড়িতে দাঁড়ানো আবুল বরকতের মাথায় গুলি লাগে এবং সে সঙ্গে সঙ্গে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। তার শরীর থেকে প্রচুর রক্তক্ষরণ হচ্ছিল। আমি হোেস্টলের বারান্দায় বরকতের ঠিক সামনে দঁাড়িয়ে ছিলাম। আমার পেছনের সিঁড়িতে দাঁড়ানো ছিল বরকত। বরকতের মাথায় গুলি না লাগলে সেদিন হয়তো আমিই মৃত্যুমুখে পতিত হতাম। সে যে কী এক করুণ ও ভয়াবহ দৃশ্য। সে দৃশ্য আমার সমস্ত বোধশক্তিকে মুহূর্তে অবশ করে দিয়েছিল। এই রকম একটি মর্মান্তিক ঘটনা আমি এই প্রথম প্রত্যক্ষ করলাম। সে দৃশ্য চোখে ভেসে উঠলে আমি আজও শিহরিত হয়ে যাই, আন্দোলিত হয়ে যাই। এই হত্যাকাণ্ডের পর আমি যে উত্তেজনা দেখেছি, যে গণরোষ দেখেছি, তাতে আমি বুঝতে পেরেছি মানুষের ক্ষোভ আর ক্রোধ কাকে বলে। রফিক উদ্দিন নামে আরেকজন যুবকের পুলিশের গুলিতে মাথার খুলি উড়ে যায়। হত্যাকাণ্ডের খবর মুহূর্তের মধ্যে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। ঢাকায় অফিস–আদালত, দোকানপাট, হাট-বাজার সবকিছু বন্ধ হয়ে যায়। হাজার হাজার মানুষের স্রোতে মেডিকেল কলেজের হোস্টেলে সেদিন এক অভাবনীয় দৃশ্যের অবতারণা হয়। মানুষের বিশাল ঢল ও রক্তের বিনিময়ে মানুষের মধ্যে ঐক্য দেখে সেদিন আমি বিমোহিত হয়েছিলাম। শহরের আইনশৃঙ্খলা সেদিন ভেঙে পড়ে। সবকিছু সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।

১৪৪ ধারা ভঙের পর যে পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে, এটা নিয়ে আমি আবুল হাশিম, শামসুল হক ও অন্য প্রবীণ নেতাদের সঙ্গে আলোচনা
করি এবং আমরা যা ঘটে গেছে, তার সকল দায়দায়িত্ব নিয়ে অগ্রসর হয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য পরবর্তী সব কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের শপথ ঘোষণা করি। ২১ ফেব্রুয়ারি রাতে রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদের নেতারা মেডিকেল কলেজ হোস্টেলে আন্দোলনের পরবর্তী কর্মসূচি সম্পর্কে আলোচনার জন্য এক সভায় মিলিত হই। এই সভায় আমি, অলি আহাদ, গোলাম মাওলা, মোহাম্মদ তোয়াহা, আবদুল মতিন প্রমুখ উপস্থিত ছিলাম। সভায় আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে আমরা অনির্দিষ্টকালের জন্য ধর্মঘট ও বিক্ষোভ মিছিলের কর্মসূচি গ্রহণ করি।

সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক হিসেবে ২১ ফেব্রুয়ারি সব ঘটনা পর্যবেক্ষণের জন্য আমাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরিস্থিতি মূল্যায়ন পর্যবেক্ষণ ও আন্দোলন পরিচালনার দায়িত্ব আমার ওপরই অর্পিত ছিল। পরিষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কাজ করাটা আমার নৈতিক দায়িত্ব বলে মনে করেছি। আমি বিশ্বাস করতাম, ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করলে নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতি ও আন্দোলন বাধাগ্রস্ত হতে পারে, আন্দোলন স্তিমিত হয়ে যেতে পারে এবং সব অঘটনের দায়দায়িত্ব বর্তাবে পরিষদের ঘাড়ে এবং কার্যত হয়েছিল তা-ই।

বিজ্ঞাপন

২১ ফেব্রুয়ারি প্রাদেশিক পরিষদের সভা ছিল । আমাদের উদ্দেশ্য ছিল সারা দেশে ব্যাপক জনসমাগম করে জনপ্রতিনিধিদেরকে আমাদের দাবি ও মনোভাবের ব্যাপারে ধারণা দিয়ে তাদের মাধ্যমে আমাদের দাবিকে বাস্তবায়ন করা। ২০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আমরা সে লক্ষ্যে কাজ করেছি। ২০ ফেব্রুয়ারি বিকেলে ১৪৪ ধারা জারি করা হলো। রাত সাড়ে ১২টা পর্যন্ত আমরা নবাবপুরে সংগ্রাম পরিষদে অফিসে সভা করলাম। তখনো আমরা ১৪৪ ধারা ভাঙার ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত নিইনি। কেননা আমাদের কাছে তথ্য ছিল, সরকার যে কোনোভাবেই হোক, একটা গন্ডগোল বাধিয়ে দিয়ে আমাদের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত করতে চাইছে। আমরা কোনো অবস্থাতেই সরকারের উসকানিতে পা দিতে চাইনি। বৃহত্তর ও ধারাবাহিক আন্দোলন সরকারের হীন চক্রান্তে যাতে ধূলিসাৎ না হয়, সে জন্য আমরা সচেষ্ট ছিলাম। রাত একটার দিকে শুনলাম, ঢাকা হলের পুকুরপাড়ে কিছু ছাত্র ১৪৪ ধারা ভঙের বিষয়ে আলোচনা করছেন। ২১ ফেব্রুয়ারি সকালে মধুর ক্যানটিনের সামনে আমাদের অজ্ঞাতসারে এবং অনুমতি ছাড়াই ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করা হয়।

আমরা প্রথমে ১৪৪ ধারা ভঙের বিপক্ষে থাকলেও যখন আমতলার ছাত্রসভায় ১৪৪ ধারা ভাঙার পক্ষে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় এবং ছাত্রজনতার ওপর নেমে আসে অত্যাচার আর নির্যাতনের নির্মম আঘাত, তখন আমরা বাস্তব পরিস্থিতি মেনে নিয়ে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম। ২১ ফেব্রুয়ারি পরবর্তী প্রতিটি কার্যক্রমে আমি ও সংগ্রাম পরিষদের নেতাদের ছিল সক্রিয় অংশগ্রহণ।

১৯৫২ সালের বিস্ফোরণপর্ব ও রক্তস্নাত অধ্যায় এক দিনে হয়নি। তা ছিল দীর্ঘদিনের সংগ্রাম ও সাধনার ফসল। ভাষাসংগ্রামের এই দীর্ঘ ইতিহাসকে ভুলে গেলে চলবে না। (সংক্ষেপিত ও ঈষৎ পরিমার্জিত)

কাজী গোলাম মাহবুব: আইনজীবী, আহ্বায়ক, সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ

কাজী গোলাম মাহবুব, ভাষা আন্দোলন ও অন্যান্য প্রসঙ্গ (সম্পাদনা: এম আর মাহবুব, ভাষা আন্দোলন গবেষণা জাদুঘর, ২০০৫) গ্রন্থ থেকে

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন