শুধু ঈদের দিন নয়, সব সমই অসহায় মানুষের পাশে থাকার চেষ্টা করেন মিরপুরের বাসিন্দা জান্নাত। পড়ালেখার পাশাপাশি তিনি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন। সাপ্তাহিক ছুটির দিনের পাশাপাশি অফিসের কর্মঘণ্টার বাইরে তিনি মানবসেবায় কাজ করেন।

জান্নাত পাঁচ বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে নানা ধরনের মানবসেবামূলক কাজ করে আসছেন। ব্যক্তিগত উদ্যোগের পাশাপাশি বিভিন্ন সংগঠনের হয়ে মানুষের জন্য কাজ করেন তিনি। এসব সংগঠনের মধ্যে অন্যতম আলোকিত শিশু, কামরান অ্যান্ড নেটওয়ার্ক, শাকিল সাইদ ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট। সম্প্রতি তিনি নিজে ‘প্রত্যাশার আলো’ নামের একটি সংগঠন গড়ে তুলেছেন।

জান্নাত জানালেন, তাঁর সেবামূলক কাজ স্বাভাবিকভাবেই চলছিল। গত বছর দেশে করোনা হানা দিলে তিনি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। এই মহাসংকটে কীভাবে মানুষের পাশে দাঁড়ানো যায়, তা নিয়ে ভাবতে থাকেন। প্রথমেই তাঁর মাথায় আসে মানুষকে মাস্ক ও স্যানিটাইজার দিয়ে সহায়তা করার কথা। এ জন্য পরিচিতজনদের নিয়ে তিনি একটা দল গঠন করেন। ব্যক্তিগত উদ্যোগে মাস্ক-স্যানিটাইজার সংগ্রহের পর তা বিতরণ পরিকল্পনার একপর্যায়ে যোগাযোগ হয় ‘আলোকিত শিশু’ নামের একটি সংগঠনের সঙ্গে। সংগঠনটির কাছ থেকে মাস্ক-স্যানিটাইজার নিয়ে তা রাজধানীর মিরপুরের বিভিন্ন আবাসিক-অনাবাসিক এলাকায় বিতরণ করেন।

দেশে করোনার সংক্রমণ বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে সরকার ‘লকডাউন’ ঘোষণা করে। প্রথম দফার সেই লকডাউনে সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতিতে পড়েন দিনমজুরসহ নিম্ন আয়ের মানুষেরা। কারণ, লকডাউনে তাঁদের আয়ের পথ বন্ধ হয়ে যায়। এবার জান্নাত দিনমজুরদের জন্য ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রমে যুক্ত হন। শুরুতে তিনি ছিলেন দলের একজন সদস্য। পরবর্তী সময়ে দক্ষতা-যোগ্যতায় তিনি নেতৃত্বের দায়িত্ব পান। আগারগাঁও দিয়ে শুরুর পর ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় এই ত্রাণ কার্যক্রম প্রসারিত হয়। তার মধ্যে ঢাকার বিভিন্ন বস্তিও ছিল।

গত বছর করোনার মধ্যে বিভিন্ন সংগঠনের হয়ে গোষ্ঠীভিত্তিক সহায়তা কার্যক্রমে অংশ নিয়েছেন জান্নাত। তাঁর নেতৃত্বে রাজধানীর পুরান ঢাকার বেশ কিছু মুক্তিযোদ্ধা পরিবারকে বাজারসদাই সহায়তা দেওয়া হয়। এ ছাড়া করোনাকালে বন্ধ থাকা স্কুলের শিক্ষক, প্রতিবন্ধী, অ্যাসিডদগ্ধ নারী, তৃতীয় লিঙ্গ, বেদে, যৌনকর্মীদের সহায়তা কার্যক্রমে তিনি যুক্ত হন।

করোনাকালে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য জান্নাত কাজ করেছেন। তিনি কখনো সহায়তা নিয়ে ছুটে গেছেন ঢাকার বিভিন্ন এলাকায়, কখনো ঢাকার বাইরে। শাকিল সাইদ ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের প্রতিষ্ঠাতা প্রবাসী শাকিল সাইদ বলেন, ‘আমাদের অনেক সহায়তা কার্যক্রমে জান্নাত নিষ্ঠার সঙ্গে অংশ নিয়েছেন। তাঁকে নিঃস্বার্থভাবে মানবসেবার কাজ করতে দেখে খুব ভালো লেগেছে।’

মানবসেবার কাজ করতে করতে জান্নাত অসুস্থ পর্যন্ত হয়ে পড়েছিলেন। তবুও তিনি থেমে থাকেননি। অসুস্থ শরীর নিয়ে তিনি ছুটে গেছেন মানুষের পাশে। গত বছর তাঁর মা মালেকা বেগম করোনায় আক্রান্ত হন। এ জন্য স্বজনদের কেউ কেউ জান্নাতকে দোষারোপ করেন। তাঁরা বলাবলি করেন, বাইরে বাইরে ঘুরে জান্নাতই ঘরে করোনা নিয়ে এসেছেন। মা সুস্থ হলে জান্নাত আবার স্বেচ্ছাসেবার কাজে নেমে পড়েন। মালেকা বেগম বলেন, ‘যে যা-ই বলুক, আমার মেয়েটা যে মানুষের সেবা করে, তাতে আমার গর্বই হয়। পরিবারের সবাই তাকে এই কাজে সব সময় উৎসাহ দিই। আমরা চাই, সবাই জান্নাতের মতো মানুষের সেবায় এগিয়ে আসুক।’

চলতি বছর দেশে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ এলে আবার লকডাউন জারি করা হয়। এবার কোনো সংগঠনের হয়ে নয়, ব্যক্তিগত উদ্যোগে সহায়তা শুরু করেন জান্নাত। তাঁর এই কাজে হাত বাড়িয়ে দেন পরিচিতজনেরা। তিনি নিম্নবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবার কিংবা যাঁরা চাকরি হারিয়ে অসহায় অবস্থায় আছেন, তাঁদের বাজার করে দেন। কাউকে মোবাইলের মাধ্যমে টাকা পাঠান। কারও জন্য ওষুধ, বাচ্চার জন্য দুধের ব্যবস্থা করেন। সহায়তা নিয়ে পবিত্র রমজানে সাহ্‌রি ও ইফতারি দিয়েছেন।

এবারের পবিত্র ঈদুল ফিতরের আগেই জান্নাত ঠিক করে রেখেছিলেন, যে করেই হোক ঈদের দিন তিনি ঢাকার ভাসমান মানুষের জন্য ভালো খাবারের আয়োজন করবেন। তাঁর ‘প্রত্যাশার আলো’ সংগঠনের উদ্যোগে বন্ধু, পরিচিতজনসহ অনেকেই নানাভাবে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেন। বাজারসহ রান্নার সার্বিক আয়োজনে জান্নাতের ব্যবসায়ী বাবা স্বপন মিয়া সাহায্য করেন। রান্নায় বাবুর্চিদের দিকনির্দেশনা দেন তাঁর মা মালেকা বেগম। ঈদের দিন সেই খাবার ঢাকার ভাসমান মানুষের মধ্যে বিতরণ করেন জান্নাত ও তাঁর দল। জান্নাত বলেন, ‘এটা ছিল আমার জীবনের সেরা ঈদ। এতগুলো মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর মতো আনন্দ কি আর হতে পারে!’