নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম নেতা। ডাকসুর এই সাবেক ভিপি আওয়ামী লীগের রাজনীতিতেও সক্রিয় ছিলেন বহু বছর। বিরোধী দলের আন্দোলন ও দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে তিনি কথা বলেছেন প্রথম আলোর সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সোহরাব হাসান
default-image

প্রথম আলো: আপনারা দীর্ঘদিন ধরেই আন্দোলনের কথা বলছেন। কিন্তু আন্দোলনটা করতে পারলেন না কেন?

মাহমুদুর রহমান মান্না: আন্দোলন করতে পারলাম না, তা ঠিক নয়। আওয়ামী লীগ একটি ঐতিহ্যবাহী দল, মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছে, বঙ্গবন্ধুর মতো বিশাল মাপের নেতা এই দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন; সেই দলটি অনেক অপকৌশল করে, মানুষের ভোটাধিকার হরণ করে নির্বাচনে জিতেছে। এরপর তারা বিরোধী দলের ওপর দমনপীড়ন চালাচ্ছে। মানুষকে রাস্তায়ই দাঁড়াতে দিচ্ছে না। সন্ত্রাস-নির্যাতনের কারণে আমরা সেভাবে মাঠে নামতে পারছি না। সরকার বলছে, আমরা আন্দোলন করতে পারছি না। যদি পুলিশ দিয়ে নেতা-কর্মীদের ধরপাকড় করা না হয়, হামলা-মামলা চালানো না হয়, আমরা দেখিয়ে দেব আন্দোলন কাকে বলে। মানুষ রাস্তায় নামতে পারলে পরিস্থিতি বদলে যাবে। মানুষ তো ক্ষমতাসীনদের ওপর খেপে আছে।

নির্বাচনের আগে যে আপনারা জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন করেছিলেন, এখন তার অস্তিত্ব আছে কি?

মাহমুদুর রহমান মান্না: জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অস্তিত্ব তো আছে। জোট ভেঙে দেওয়া হয়নি। কিন্তু কার্যকরী বা সক্রিয় আছে, বলব না। যে যার মতো কর্মসূচি নিয়ে এগোচ্ছে। করোনাও একটি কারণ। জোটের অনেক নেতা ঘর থেকেই বের হচ্ছেন না। কাদের সিদ্দিকী জোটে নেই। গণফোরাম, জেএসডি, বিএনপির নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ আছে।

বিজ্ঞাপন

২০১৮ সালের নির্বাচনের ফল জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট প্রত্যাখ্যান করেছে। আবার ঐক্যফ্রন্টের সদস্যরা সংসদেও গেছেন। এর মাধ্যমে কি আপনারা সংসদকে বৈধতা দিলেন না?

মাহমুদুর রহমান মান্না: আমি মনে করি বিএনপির কয়েকজন ও গণফোরামের দুজন সদস্য সংসদে যোগ দিয়েছেন, এতে সংসদ বৈধ হয়ে যায়নি। যেখানে ‘দিনের ভোট রাতে হয়’, সেখানে সংসদ বৈধতা পায় কীভাবে। তবে আমি বলব, বিএনপির সংসদে যাওয়ার কোনো যুক্তি ছিল না। দরকারও ছিল না। এতে তাদের লাভ হয়নি।

আওয়ামী লীগকে এখন স্বৈরাচার বলছেন। কিন্তু আপনি অনেক বছর এই দলে ছিলেন। সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। তখন কি দল গণতান্ত্রিক ছিল?

মাহমুদুর রহমান মান্না: কঠিন প্রশ্ন। আপনি যদি কোনো সংগঠনে থাকেন, তখন মোহবিষ্টতা থাকে। আমি যখন আওয়ামী লীগে যোগ দিই, তখন বিরোধী দলে ছিল। দলের প্রতি অনুরাগ তো ছিলই। সময়ের ব্যবধানে সেই অনুরাগ কেটেও যায়। সব দলেই এটা হয়। ভালো-মন্দ মিলিয়েই দল। তখন মনে হয়নি দল স্বৈরাচারী হয়ে গেছে। কিন্তু ২০১৪ সালের যে নির্বাচন, তা প্রকৃত অর্থে কোনো নির্বাচন ছিল না। ২০০৮ সালে আমাকে মনোনয়ন না দেওয়া চূড়ান্ত অগণতান্ত্রিক ছিল। তৃণমূল থেকে আমার নাম পাঠানো হয়নি। কাজটি করা হয়েছে আমাকে বাদ দেওয়ার জন্যই। কেননা ওই আসনে আওয়ামী লীগের বিকল্প কোনো প্রার্থীই ছিলেন না। ওই আসনে ২০১৮ সালেও আওয়ামী লীগ প্রার্থী দেয়নি। জাতীয় পার্টির প্রার্থী জিতেছেন।

কিন্তু ২০০৭-২০০৮ সালেই তো আওয়ামী লীগের সঙ্গে আপনার বিচ্ছেদ ঘটল। অভিযোগ আছে, সেনাসমর্থিত সরকারের কুশীলবের সঙ্গে আপনার সখ্য ছিল?

মাহমুদুর রহমান মান্না: আমি চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলতে পারি, আওয়ামী লীগ একটি প্রমাণও দিতে পারবে না। ২০০৭ সালে যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার শপথ নিল, সেই অনুষ্ঠানে তো দলের সভানেত্রীসহ আওয়ামী লীগের অনেক নেতা যোগ দিয়েছিলেন। আমি আওয়ামী লীগের সংস্কার উদ্যোগের পক্ষে ছিলাম। কিন্তু সংস্কারের নামে কোনো গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করিনি। আমাকে ষড়যন্ত্র করে বাদ দেওয়া হয়েছে।

দেশে অনেক দল আছে। আবার নাগরিক ঐক্য কেন?

মাহমুদুর রহমান মান্না: আমি করতাম আওয়ামী লীগ। তার আগে বাসদ করেছি। তারও আগে জাসদ সমর্থিত ছাত্রলীগ থেকে দুবার ডাকসুর ভিপি হয়েছি। সংগঠনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ছিলাম। আওয়ামী লীগ থেকে যখন মোহমুক্ত হলো, তখন কিন্তু দেখলাম বিদ্যমান দলগুলো দিয়ে হবে না। বিএনপির ওপর ভরসা করা যায় না। আমি তো বাম রাজনীতি করা মানুষ। কিন্তু নব্বইয়ে যখন সমাজতান্ত্রিক শিবিরে ধস নামল, তখন ভাবলাম এই পথে হবে না। আমাদের একটি কল্যাণমূলক রাষ্ট্র করতে হবে। বিদ্যমান দলগুলো মুখে জনগণের কল্যাণের কথা বললেও কাজে কিছু করছে না। এই বাস্তবতা থেকেই নাগরিক ঐক্য গড়ে তোলা। পরিবর্তনের রাজনীতি করতে চাইলাম, যাতে রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তির সমাবেশ ঘটবে।

আপনারা বলছেন, দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। সরকার বলেছে, সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন হবে। তাহলে সংকট উত্তরণের উপায় কী?

মাহমুদুর রহমান মান্না: সরকার কী বলল না বলল, সেটাকে গুরুত্ব দিতে চাই না। এই সরকার ভোট ডাকাতির সরকার। দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়, সেটি তো তারা ২০১৮ সালেই প্রমাণ করেছে। একটি অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকার। সেটি ধ্বংস করা হয়েছে। সংকট উত্তরণে আমি এখনই কোনো ফর্মুলা দিতে চাই না। সবাই একত্রে বসে ফর্মুলা বের করা সম্ভব। এরশাদের পতনের আগে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছেও কোনো ফর্মুলা ছিল না। পরে সব দল বসে বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদকে বেছে নিয়েছে।

বিজ্ঞাপন

কিন্তু সরকার যদি সংবিধান অনুযায়ী আবার নির্বাচন করতে চায়, আপনারা কী করবেন?

মাহমুদুর রহমান মান্না: এই সংবিধানের দোহাই দিয়ে লাভ নেই। সরকার তো সংবিধানকে কেটে ছিঁড়ে রক্তাক্ত করেছে। সরকার দাবি মানছে না। কিন্তু দাবি মানানোর মতো পরিস্থিতি পুরোই বিদ্যমান। কিন্তু নেতৃত্ব নেই। ওখানে হাত দিতে হবে। কেউ না কেউ আসবে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থান তো ছাত্ররাই করেছে। মানুষ বিকল্প নেতৃত্ব বেছে নেবে। সামাজিক আন্দোলন তো হচ্ছে। কোটা সংস্কার আন্দোলন, নিরাপদ সড়ক আন্দোলন এবং সাম্প্রতিক ধর্ষণবিরোধী আন্দোলন।

আপনারা বলছেন সরকার ব্যর্থ। কিন্তু করোনার মধ্যেও দেশের অর্থনীতি এগিয়ে চলেছে। গড় আয়ে বাংলাদেশ ভারতকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে।

মাহমুদুর রহমান মান্না: ডেটা বিশ্লেষণ করা দরকার। আমাদের ক্রয়ক্ষমতা কম। ভারতের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বেশি। তাহলে গড় আয় বেশি হয়ে লাভ কী? আর প্রবৃদ্ধি নিয়ে অর্থনীতিবিদেরাই ভিন্নমত পোষণ করেছেন। সিপিডি ভিন্ন কথা বলেছে।

অনেকে বলেন, মানুষের পেটে ভাত আছে বলেই তারা রাস্তায় নামছে না। কী বলবেন?

মাহমুদুর রহমান মান্না: মানুষের পেটে ভাত থাকলেই যে রাস্তায় নামবে না, সে কথা ঠিক নয়। আমি উল্টো বলব, পেটে ভাত থাকলেই মানুষ রাস্তায় নামতে পারে। পেটে ভাত না থাকলে কীভাবে নামবে? আমেরিকার মানুষের পেটেও ভাত আছে। তারা রাস্তায় নেমেছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে। আন্দোলনকারীরা দেখিয়ে দিয়েছে ‘ব্ল্যাক ম্যাটারস’।

আপনার বিরুদ্ধে সরকার উৎখাতের মামলা হয়েছিল। সেই মামলার অগ্রগতি কী?

মাহমুদুর রহমান মান্না: আমি ১৮ নভেম্বর আদালতে হাজিরা দিয়ে এলাম। এত বছর হয়ে গেল সরকার চার্জশিট দিতে পারেনি। কীভাবে দেবে, এই মামলার তো ভিত্তি নেই। যে টেলিফোন বার্তার ভিত্তিতে মামলাটি করা হয়েছিল, সেই ব্যক্তিকেই খুঁজে পায়নি তারা। ব্রিটেনপ্রবাসী একজনকে ধরেছিল, তিনি চ্যালেঞ্জ করেছেন। প্রথমে সরকার বলল এটি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে উসকানি। পরে বলল, সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্র। আমি যা বলি প্রকাশ্যেই বলেছি। এখানে গোপনীয় কিছু নেই। ষড়যন্ত্রের কিছু নেই।

রাজনৈতিক দলবিধি অনুযায়ী আপনার দল নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধনভুক্ত নয়। কীভাবে নির্বাচন করবেন?

মাহমুদুর রহমান মান্না: নিবন্ধনের মাধ্যমে রাজনীতিকে কিছু দলের কাছে মৌরসিপাট্টা দেওয়া হয়েছে। এর প্রয়োজন নেই। দেশে এখন গণতন্ত্র নেই। মানুষের নিরাপত্তা নেই। যেখানে গণতন্ত্র নেই, সেখানে দলের নিবন্ধন দিয়ে কী হবে? তারপরও বলব, মার্কাটা দরকার। স্থানীয় নির্বাচনে দেখেছি, ভালো প্রার্থীও মার্কার কারণে হেরে যাচ্ছেন। নিবন্ধনের জন্য নির্বাচন কমিশন যেসব শর্ত দিয়েছে, তা মানা অসম্ভব।

আপনারা বলছেন সরকার ব্যর্থ। কিন্তু আপনারাও কোনো সফলতা দেখাতে পারছেন না।

মাহমুদুর রহমান মান্না: আমরা চেষ্টা করছি। জোটগতভাবে লড়াই করছি। আমি মনে করি, রাজনৈতিক অভিপ্রায়যুক্ত আরও সামাজিক শক্তি এগিয়ে আসবে। দেখুন, সব দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দিয়েছে। এখানে সরকার ভয় পাচ্ছে বলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখেছে। তারপরও ছাত্ররা রাস্তায় আছে। এরাই সরকারের দমনপীড়ন ও ব্যর্থতার বিরুদ্ধে জোরদার আন্দোলন করবে। আমি নিজেও যুব ও ছাত্রদের সংগঠিত করার চেষ্টা করছি। সমর্থনও পাচ্ছি। আমরা বিএনপির ওপর ভর করে নয়, বিএনপিকে সঙ্গে নিয়ে এগোতে চাই। গত ডাকসু নির্বাচনে দেখা গেল, বিএনপির ছাত্রদলের সমর্থন নেই। যুবদলের সক্রিয়তা নেই।

আওয়ামী লীগ বলছে তারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সমুন্নত রাখছে আর আপনার বিরোধী শক্তির সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন?

মাহমুদুর রহমান মান্না: মুক্তিযুদ্ধবিরোধী জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে আমরা জোট করিনি। আমরা বিএনপির সঙ্গে জোট করেছি। বিএনপি মুক্তিযুদ্ধবিরোধী দল নয়। বিএনপিতে আওয়ামী লীগের চেয়ে কম মুক্তিযোদ্ধা নেই। আর এখন আওয়ামী লীগই ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীকে প্রশ্রয় দিচ্ছে। সম্প্রতি হেফাজতে ইসলামে যে বিরোধ হলো, তাতেও সরকারের হাত আছে। আগে আওয়ামী লীগ এ রাজনীতি করেনি, এখন করছে। দেশকে পিছিয়ে দিচ্ছে। আমরা সামনে নিয়ে যেতে চাই, মানুষকে বোঝাতে চাই, গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলন করছি। গণতন্ত্রই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা।

গণমাধ্যমের ভূমিকাকে কীভাবে দেখেন?

মাহমুদুর রহমান মান্না: সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও গণমাধ্যমের ভূমিকার প্রশংসা করি। প্রথম আলোসহ অনেক গণমাধ্যম থেকেই আমরা দেশের প্রকৃত চিত্র পাই। আবার গণমাধ্যমের ওপর সরকারের চাপও আছে। টিভির টক শো নিয়ন্ত্রিত। নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে, কাকে ডাকা যাবে আর কাকে ডাকা যাবে না। কিন্তু এসব করেও সরকার সত্য ঢাকতে পারছে না।

সরকারের দাবি, তারা সফলভাবে করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলা করছে।

মাহমুদুর রহমান মান্না: যেখানে দুই-তৃতীয়াংশ বেসরকারি হাসপাতালের লাইসেন্স নেই, সেখানে সরকার সফলভাবে করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলা করল কীভাবে। স্বাস্থ্যসেবা পুরোপুরি ভেঙে পড়ছে। সরকার যে মৃতের সংখ্যা ও আক্রান্তের সংখ্যা বলছে, তা অনেকেই বিশ্বাস করছে না। টিআইবি বলেছে, তথ্য গোপন করা হয়েছে। এ অবস্থায় সফলতা দাবি করা হাস্যকর। আমাদের দেশে যে করোনা ভয়াবহ রূপ নেয়নি, তার কারণ বাংলাদেশের মানুষ পরিশ্রমী। তাদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা পশ্চিমের অনেক দেশের চেয়ে বেশি। এতে সরকারের কোনো কৃতিত্ব নেই।

প্রথম আলো: আপনাকে ধন্যবাদ।

মাহমুদুর রহমান মান্না: আপনাকেও ধন্যবাদ।

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন