default-image

‘শেখ মুজিবুর রহমানও আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় জড়িত’ ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি পাকিস্তান টাইমস-এর রাওয়ালপিন্ডি সংস্করণে এ রকম একটি শিরোনামের প্রতি স্বাভাবিকভাবেই আমার দৃষ্টি আকর্ষিত হয়। শিরোনামটি খুব বড় নয়। পত্রিকার প্রথম বা শেষ পৃষ্ঠায় ছোট্ট একটি শিরোনাম।

সেদিন ১৯ জানুয়ারি ১৯৬৮। রাওয়ালপিন্ডিতে অবস্থিত পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সদর দপ্তরের কাছে আইএসআই (ইন্টার সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্স) ইন্টারোগেশন সেন্টারে কয়েক দিন জিজ্ঞাসাবাদের সঙ্গে দৈহিক ও মানসিক নির্যাতনের পর আজ আমি একটু শোবার এবং পত্রিকা দেখার সুযোগ পাই। পত্রিকা বা অন্য কোনো পড়ার সামগ্রী কিংবা রেডিও বা টিভি আমার জন্য নিষিদ্ধ। আমার এসকর্ট অফিসারের ঝুঁকিপূর্ণ সৌজন্য আমাকে পত্রিকা পড়ার সুযোগ এনে দেয়।

করাচির কাছে মালির ক্যান্টনমেন্ট থেকে ১০ জানুয়ারি ১৯৬৮ তারিখে আমি গ্রেপ্তার হই। ২ জানুয়ারি ১৯৬৮ তারিখে আমি করাচির ইংরেজি দৈনিক পত্রিকা ডন-এ আমাদের বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু তথ্য ফাঁস হওয়ার এবং নামোল্লেখ ব্যতীত কয়েকজনকে গ্রেপ্তারের খবর পড়ি। পাকিস্তান সরকারের ১ জানুয়ারি ১৯৬৮ তারিখের একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তির ওপর ভিত্তি করে ডন সংবাদটি প্রকাশ করে। ৬ জানুয়ারি ১৯৬৮ সন্ধ্যায় রেডিও পাকিস্তানের খবরে, সরকারের ভাষায়, সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার ষড়যন্ত্রের তদন্তের অগ্রগতির আরও বিবরণ এবং তখন পর্যন্ত গ্রেপ্তার করা ২৮ জনের নাম প্রচার করা হয়, যাঁদের মধ্যে ৬ জনের সঙ্গে আমার পরিচয় ছিল। ওই ২৮ জনের মধ্যে আমার নাম ছিল না। পরের দিন পাকিস্তান সরকারের ৬ জানুয়ারি ১৯৬৮ তারিখের সংবাদ বিজ্ঞপ্তির বরাত দিয়ে সব দৈনিক পত্রিকায় খবরটি প্রকাশিত হয়। এর আগে উল্লিখিত ১৯ জানুয়ারি ১৯৬৮ তারিখের দ্য ডেইলি পাকিস্তান টাইমস-এর খবরটি পাকিস্তান সরকারের ১৮ জানুয়ারি ১৯৬৮ তারিখের অপর একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তির বরাত দিয়ে ছাপা হয়েছিল।

বিজ্ঞাপন

আমাকে জিজ্ঞাসাবাদের ধরন এবং উল্লিখিত সংবাদপত্র ও রেডিওর খবর থেকে আমার কাছে প্রতীয়মান হয়, এসব অভিযোগের ভিত্তিতে একটি বিচারকার্য সংঘটিত হবে এবং একজন অভিযুক্ত হিসেবে আমাকে বিচারের সম্মুখীন হতে হবে। এ সময় সব অভিযুক্তের নাম আমার জানা ছিল না। বস্তুত ৩৫ জন অভিযুক্তের তালিকা আরও পরে চূড়ান্ত করা হয়।

১৯ জানুয়ারি ১৯৬৮ তারিখের পত্রিকার খবর থেকে পরিষ্কার বোঝা যায়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান (তখনো তিনি বঙ্গবন্ধু হননি) সম্ভাব্য মামলার প্রধান অভিযুক্ত হবেন। তবে তখন পর্যন্ত এ কথা বোঝার উপায় ছিল না যে সশস্ত্র বাহিনীর আইনের অধীনে কোর্ট মার্শালে বিচারকার্য সম্পন্ন হবে, নাকি প্রচলিত বা কোনো নতুন আইনে অন্য কোনো আদালতে বিচার হবে।

মামলার বিবরণ, ধারা ও গোটা কার্যক্রম বিশ্লেষণ করলে এ মামলার নাম ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’ হওয়া যৌক্তিক নয়। কারণ, মামলাটির এ রকম নামকরণ করার পক্ষে কেবল একটি যুক্তি রয়েছে। সরকারি ভাষ্য অনুযায়ী স্টুয়ার্ড মুজিবুর রহমান (অভিযুক্ত-৩) ও মোহাম্মদ আলী রেজা (অভিযুক্ত-৩৩) ১২ থেকে ১৫ জুলাই ১৯৬৭ তারিখের মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানকে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন করে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে সম্ভাব্য ভারতীয় সাহায্যের বিষয়ে ভারতীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনার জন্য আগরতলায় যান। সরকারি এই ভাষ্য সত্যি হলেও আমাদের প্রতিনিধিদ্বয়ের আগরতলা সফরের ফলে কোনো ভারতীয় সাহায্য আমাদের কাছে বা অন্য কারও কাছে আসার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তদুপরি মামলার বিবরণসংবলিত অভিযোগে বিবৃত সভাগুলো ও কার্যাবলি, যা মামলাটির মূল বিষয় ছিল, পাকিস্তানের উভয় অংশে ১৯৬৪ সালের প্রথম দিক থেকে ১৯৬৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত মূলত করাচি, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও কুমিল্লায় সংঘটিত হয় এবং তা মামলার শুরুতে সরকারপক্ষ ট্রাইব্যুনালে পড়ে শোনায়। সেসব বিবরণ বা কথিত ঘটনাবলির তুলনায় আগরতলা সফরের ঘটনা খুবই কম গুরুত্বপূর্ণ। সে কারণে মামলার নামের আগে ‘আগরতলা’ শব্দটি সংযোজনের যৌক্তিকতা খুবই কম।

যুক্তিসংগত কারণে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা আমাদের জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের অন্যতম প্রধান ও ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে ইতিহাসে চিহ্নিত হয়, যদিও নামকরণের ক্ষেত্রে তা চিহ্নিত হয় নামের অপপ্রয়োগ হিসেবে। সরকারি প্রচারযন্ত্র, সরকারি প্রেস বিজ্ঞপ্তি, আইয়ুব খানের চরেরা এবং কতিপয় সংবাদপত্র আগরতলা শব্দটি নিয়ে এত বেশি প্রচারণা চালায় যে তখন থেকেই মামলাটি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা নামে খ্যাত হয় এবং এ নামেই আমাদের ইতিহাসের অংশ হয়। (সংক্ষেপিত)

শওকত আলী: আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার ২৬ নম্বর আসামি। পরে কর্নেল, সাংসদ ও জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার।

সত্য মামলা আগরতলা (প্রথমা প্রকাশন ২০১১, পৃ ১৩–১৭) গ্রন্থ থেকে

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন