মামলায় ধীরগতি

বিজ্ঞাপন
>
  • স্বাধীনতার ৩৯ বছর পর গঠন করা হয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
  • ২০১০ সালের ২৫ মার্চ যাত্রা শুরু হয় ট্রাইব্যুনালের।
  • যাত্রা শুরু হওয়ার পর পরিচিত শীর্ষ অপরাধীদের বিচারপ্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।
  • এখন স্থানীয় পর্যায়ের স্বল্প পরিচিত আসামিদের মামলার কার্যক্রম চলছে।
  • জামায়াতে ইসলামীর বিচারের দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। 
default-image

৪৭ বছর আগে বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের সময় নিরীহ বাঙালির ওপর পাকিস্তানি শাসকেরা চালিয়েছিল বর্বর গণহত্যা, ধর্ষণ, নিপীড়নসহ মানবতাবিরোধী নৃশংসতা। এই নৃশংস মানবতাবিরোধী অপরাধে সক্রিয় সহযোগিতা করেছিল বাংলাদেশের কিছু দোসর। মুক্তিযুদ্ধের সময় চালানো তাদের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য স্বাধীনতার ৩৯ বছর পর গঠন করা হয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। আট বছর আগে, ২০১০ সালের ২৫ মার্চ যাত্রা শুরু হয় ট্রাইব্যুনালের। যাত্রা শুরুর পর পরিচিত শীর্ষ অপরাধীদের বিচারপ্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। এখন স্থানীয় পর্যায়ের স্বল্প পরিচিত আসামিদের মামলার কার্যক্রম চলছে। কিন্তু যুদ্ধাপরাধী সংগঠন হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর বিচারের দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই।

২০১৩ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি নবম জাতীয় সংসদে ট্রাইব্যুনালের আইনে ব্যক্তির পাশাপাশি দলের বিচারের বিধান যুক্ত করে সংশোধনী পাস হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৪ সালের ১৮ আগস্ট জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। এরপর জামায়াতের বিরুদ্ধে একাত্তরে যুদ্ধাপরাধ, গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধসহ সাত ধরনের অপরাধ সংঘটনের অভিযোগ এনে তদন্ত সংস্থা ২০১৪ সালের মার্চে ট্রাইব্যুনালে রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান কৌঁসুলির কার্যালয়ে প্রতিবেদন দেয়। কিন্তু এর দৃশ্যমান অগ্রগতি জানা যায়নি।

যোগাযোগ করা হলে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী রানা দাশগুপ্ত প্রথম আলোকে বলেন, ‘তদন্ত সংস্থা কয়েক বছর আগে জামায়াতের বিষয়ে প্রতিবেদন দাখিল করেছিল। এরপর একটি প্রসিকিউশন দল গঠন করা হয়। কাগজপত্র পড়ে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করার প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছিল। তবে ইচ্ছা থাকলেও আমরা তা পারিনি।’

অবশ্য যুদ্ধাপরাধী সংগঠন হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর বিচারের প্রসঙ্গ এখনো আলোচনায়। এ বিষয়ে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির প্রথম আলোকে বলেন, শীর্ষস্থানীয় গণহত্যাকারী ব্যক্তিদের বিচার করলেও এখন পর্যন্ত গণহত্যাকারীদের প্রধান সংগঠন জামায়াতে ইসলামীসহ রাজাকার, আলবদর ও আলশামস প্রকৃতির সংগঠনগুলোর বিচারের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। গণহত্যার জন্য দায়ী পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিচারের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এটি দুর্ভাগ্যজনক।

প্রথম ট্রাইব্যুনালের যাত্রা শুরুর পর বিচারকাজ আরও গতিশীল করতে ২০১২ সালের ২২ মার্চ আরেকটি ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়, যার নাম রাখা হয় ট্রাইব্যুনাল-২। অবশ্য ২০১৫ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর দুই ট্রাইব্যুনালকে একীভূত করে আবার একটি ট্রাইব্যুনাল করা হয়।

রাষ্ট্রপক্ষের তথ্য অনুসারে, ট্রাইব্যুনাল থেকে প্রথম রায় এসেছিল ২০১৩ সালের ২১ জানুয়ারি। এ পর্যন্ত মোট রায়ের সংখ্যা ৩১টি। সাজাপ্রাপ্ত আসামি ৬৮। এর মধ্যে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ৪২, দণ্ডিত পলাতক ৩২ এবং আটক আসামির সংখ্যা ৩৬। বর্তমানে ট্রাইব্যুনালে বিচার ও প্রাক্‌-বিচারপর্যায়ে ৩১টি মামলা রয়েছে, যার একটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ। তদন্ত সংস্থার তথ্য অনুসারে, কার্যক্রম শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত ৬০টি মামলার তদন্ত শেষ হয়েছে। ট্রাইব্যুনালে ২৩টি মামলার কার্যক্রম চলমান আছে। আরও ৩০টি অভিযোগের তদন্ত চলছে, যেখানে আসামির সংখ্যা ৩০।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী রানা দাশগুপ্ত প্রথম আলোকে বলেন, মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার অব্যাহত রেখে ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার পাওয়ার প্রত্যাশা পূরণে আরেকটি ট্রাইব্যুনাল সচল করা দরকার। কারণ, ৩০টি মামলা বিচারাধীন আছে। একটি ট্রাইব্যুনাল স্বাভাবিকভাবে বছরে দুটি বা তিনটি মামলা নিষ্পত্তি করতে পারে।

নিষ্পত্তির অপেক্ষায় ২০টির বেশি আপিল

ট্রাইব্যুনালের দণ্ডাদেশের রায়ের বিরুদ্ধে আসামিপক্ষ ও রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করেছে। নয়টি মামলার ক্ষেত্রে আপিল নিষ্পত্তি হয়েছে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ আদালতে আপিল নিষ্পত্তি হয়ে ছয় আসামির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, সর্বশেষ ২০১৬ সালের মার্চে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতা মীর কাসেম আলীর আপিল নিষ্পত্তি হয়। ২০টির বেশি আপিল এখন আপিল বিভাগে নিষ্পত্তির অপেক্ষায়।

ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার সহসমন্বয়ক এম সানাউল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দু-একটি চিঠিপত্র লিখেছি যে আমাদের সাক্ষী, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি ও বিচারপ্রার্থীর মাঝে একটি হতাশা কাজ করে। এটা ত্বরান্বিত করার চেষ্টা বা উদ্যোগ নেওয়ার জন্য অনুরোধ করেছি।’

দুই বছরেও আপিল শুনানি না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপক্ষের আরেক আইনজীবী তুরিন আফরোজ। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘এই বিচার শুরু হয়েছে প্রায় ৪০ বছর পর। আমরা মামলাগুলো ট্রাইব্যুনালে দ্রুত নিষ্পত্তি করবার চেষ্টা করেছি। এখন সর্বোচ্চ আদালতে আপিল শুনানি যদি না হয়, তাহলে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পথ আরও দীর্ঘসূত্রতার বেড়াজালে আটকে যাবে।’

তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, মৃত্যুদণ্ডাদেশের রায়ের বিরুদ্ধে জামায়াতের নেতা এ টি এম আজহারুল ইসলাম ও মুহাম্মদ আবদুস সুবহান এবং সাবেক কৃষি প্রতিমন্ত্রী সৈয়দ মো. কায়সারের পৃথক আপিল শুনানির জন্য বেশ কয়েকবার কার্যতালিকায় উঠেছিল।

এ ছাড়া ট্রাইব্যুনালের দেওয়া মৃত্যুদণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে যশোরের সাখাওয়াত হোসেন, মো. বিল্লাল হোসেন, মহিবুর রহমান বড় মিয়া, আওয়ামী লীগের বহিষ্কৃত নেতা মো. মোবারক হোসেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জের মাহিদুর রহমান, পটুয়াখালীর ফোরকান মল্লিক, বাগেরহাটের শেখ সিরাজুল হক ওরফে সিরাজ মাস্টার ও খান আকরাম হোসেন, নেত্রকোনার আতাউর রহমান ও ওবায়দুল হক তাহের, কিশোরগঞ্জের আইনজীবী সামসুদ্দিন আহম্মেদ ও মোসলেম প্রধান, জামালপুরের মো. সামসুল হক ওরফে বদর ভাই, এস এম ইউসুফ আলীসহ অন্যদের আপিল নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। এ ছাড়া জাপার সাবেক সাংসদ আবদুল জব্বারের দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করেছে।

দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম প্রথম আলোকে বলেন, আপিল বিচারাধীন, এ নিয়ে নানামুখী বক্তব্য ঠিক নয়। এসব আপিল অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শুনানি হওয়া উচিত। এ জন্য পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আট বছরের কার্যক্রমসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের পরিস্থিতি প্রসঙ্গে কথা হয় একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবিরের সঙ্গে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, এখানে সাফল্য ও ব্যর্থতা দুই-ই আছে। দেশীয় আইনে, দেশীয় বিচারব্যবস্থায়, সীমিত লোকবল ও অর্থবল নিয়ে আট বছরে ৬০ জনের বেশি শীর্ষস্থানীয় গণহত্যাকারীর বিচার ট্রাইব্যুনাল সম্পন্ন করেছেন। এটি কম অর্জন নয়। এর পাশাপাশি ক্ষোভের বিষয় হচ্ছে যে গতিতে বিচারকাজ আরম্ভ হয়েছিল, সেটি অনেক মন্থর হয়ে গেছে। দীর্ঘ দুই বছর ধরে আপিলের শুনানি হচ্ছে না।

ছয় আসামির ফাঁসি

কাদের মোল্লা: ১২ ডিসেম্বর ২০১৩

কামারুজ্জামান: ১১ এপ্রিল ২০১৫

সাকা চৌধুরী: ২১ নভেম্বর ২০১৫

মুজাহিদ: ২১ নভেম্বর ২০১৫

নিজামী: ১০ মে ২০১৬

কাসেম আলী: ৩ সেপ্টেম্বর ২০১৬

আমৃত্যু কারাদণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াতের দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী কারাগারে আছেন। এর আগে আপিল শুনানির অপেক্ষায় থাকা অবস্থায় মারা যান জামায়াতের গোলাম আযম ও বিএনপির মো. আবদুল আলীম।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন