default-image

রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন তুঙ্গে উঠলে সরকার আন্দোলনকে নস্যাৎ করার জন্য ২০ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা জারি করে হরতাল, সভা ও শোভাযাত্রা নিষিদ্ধ ঘোষণা করল। সে রাতেই মেয়েদের হোস্টেলে কানাঘুষায় খবর পৌঁছাল যে ২১ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভঙ্গ না করে সভা শেষে শান্তিপূর্ণভাবে শোভাযাত্রা করা হবে। এ নিয়ে ছাত্রীদের মধ্যে দেখা দিল বিতর্কের ঝড়। বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের কর্মসূচির সবই কি তাহলে বিফলে যাবে? তবে কি ৩০ জানুয়ারি থেকে ২০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সব চেষ্টা ও প্রস্তুতি নস্যাৎ হবে? নানা দ্বিধাদ্বন্দ্বের মধ্যে সকালেই এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ছাত্রী সংগ্রহের জন্য আমরা বেরিয়ে গেলাম। কিছুসংখ্যক ছাত্রী থেকে গেল হোস্টেলে। আমরা পায়ে হেঁটে দূর-দূরান্ত থেকে ছাত্রীদের সংগ্রহ করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণের আমতলায় এলাম। পথশ্রমে ক্লান্ত আমরা একে অন্যের দিকে শূন্য চোখে তাকাচ্ছি। মনে আছে, রোকেয়া আপা একটু মোটা মানুষ। তিনি আমার দিকে তাকিয়ে বলে উঠলেন, ‘মনে হচ্ছে পায়ের রগ বুঝি ছিঁড়ে গেছে।’ সেদিন সব কথা বলার মতো মানসিক অবস্থা ছিল না। বোরকা শামসুন কাছেই ছিল। ওর দিকে তাকিয়ে একটু হেসেছিলাম। সকাল তখন ১০টা-১১টা। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীরা আমতলায় জমায়েত হয়েছে। মধুদার দোকানে চলছে তুমুল রাজনৈতিক আলোচনা। মধুদাও চা-নাশতার সেবাদান করছেন নগদে ও বাকিতে। ইতিমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় গেটের উল্টো দিকে সিটি এসপি মাসুদের নেতৃত্বে একটি জিপ ও দু-তিন ট্রাকবোঝাই পুলিশ নেমে অবস্থান নিল। সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক আবদুল মতিন, গাজীউল হক, এস এ বারী এ টি, জুলমত আলী খান, কাজী গোলাম মাহবুব, অলি আহাদ, মোহাম্মদ তোয়াহা, কে জি মুস্তাফা, মুস্তাফা নূর-উল ইসলাম, এম আর আখতার মুকুল, কমরুদ্দিন শহুদ, শামসুল ইসলাম, শামসুল হক, আবসারউদ্দীন, মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান শেলী, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ, শহীদ খান, আবদুস সামাদ আজাদ, মোহাম্মদ সুলতান, শহীদুল্লা কায়সার, গোলাম মওলা, আহমদ রফিক, ফরিদউদ্দিন আহমেদ, জয়নুল আবেদিন, ইলিয়াস, মোস্তফা, কিবরিয়া, আবুল মাল আবদুল মুহিত, আজমল হোসেনসহ অনেক চেনা-অচেনা মুখের সমাবেশ ঘটেছে। ছাত্রছাত্রীর মধ্যে চলছে পরস্পরবিরোধী বাগ্​বিতণ্ডা। কেউবা হতবাক হয়ে তাকিয়ে শুনছে। এ যেন প্রচণ্ড বিস্ফোরণের আগে ঝড়ের পূর্বাভাস।

বিজ্ঞাপন

ইতিমধ্যে ১৪৪ ধারা না ভাঙার অনুরোধ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ছাত্রদের কাছে আসেন ভাইস চ্যান্সেলর সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন প্রক্টর অধ্যাপক মুজাফফর আহমদ, ডিন জুবেরী ও ড. নিউম্যান। উপস্থিত ছাত্ররা বিনয়ের সঙ্গে সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে।

আমতলায় গাজীউল হকের সভাপতিত্বে দুপুর প্রায় ১২টার দিকে ছাত্রসভা শুরু হয়। তুমুল বিক্ষোভের মধ্যে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ নিয়ে তর্ক-বিতর্ক চলে। বিষয়টি তুঙ্গে পৌঁছালে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করার পক্ষে বিপুলসংখ্যক ছাত্রছাত্রীর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে মেনে নেওয়া হলো। ফল হিসেবে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি ভেঙে যায়। ভাষাসংগ্রাম সাধারণ ছাত্রছাত্রীর স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনে রূপ নেয়।

স্থির হয় ১০ জন করে ছাত্রছাত্রীর একেকটি দল মিছিল করে বেরোবে। মিছিলের গুরুত্ব বুঝে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে আমরা যে ছাত্রীদের নিয়ে এসেছিলাম, তাদের বাড়ি চলে যাওয়ার নির্দেশ দিলাম। কিন্তু আমরা চলে যাওয়ার পর এসব ছাত্রী আমতলায় সভা করে এবং রাষ্ট্রভাষা অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার শপথ নেয়। তাদের মধ্যে ছিল কাজী খালেদা, মন্তু, পুতুল, মনোয়ারা, আমিনা বেগমসহ অনেকে। সবার নাম এখন মনে পড়ছে না।

ছাত্রছাত্রীরা কার আগে কে যাবে-এই প্রতিযোগিতা শুরু হলো। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের সঙ্গে মিছিলে যোগ দেওয়ার জন্য ছাত্রীরা গেটের কাছে চলে গেল। গেটের পাশে তখন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্, মুজাফফর আহমদ, ফিজিক্যাল ইনস্ট্রাক্টর মতিউর রহমানসহ কয়েকজন অধ্যাপক ও অসংখ্য ছাত্রছাত্রী জমায়েত হয়েছে। পুলিশের কয়েকজন লাঠি হাতে কর্ডন করে দাঁড়িয়ে আছে গেটে। বাকিরা রাইফেল হাতে পজিশন নিয়ে আছে। ড. শহীদুল্লাহ্​র চেহারায় উদ্বেগ। তিনি বলে উঠলেন, ওরা পজিশন নিয়ে আছে।

default-image

ঠিক হলো, গ্রেপ্তার এড়ানোর জন্য ছাত্রীরা প্রতিটি দলের অগ্রভাগে থাকবে। সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক আবদুল মতিন কাগজ-কলম নিয়ে নামের তালিকা তৈরি করতে শুরু করলেন। প্রথম দলগুলোর নাম লেখা গেলেও পরে তা আর সম্ভব হয়নি। সমুদ্রের উত্তাল তরঙ্গের মতো বিক্ষুব্ধ ছাত্রছাত্রীরা ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ স্লোগান দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিল; কেউ পুলিশ কর্ডনের লাঠির ওপর দিয়ে, কেউবা লাঠির নিচ দিয়ে। কিছু ছাত্র বেরোচ্ছিল দেয়াল টপকে, কিছু ছাত্র মধুদার ক্যানটিনের পাশ দিয়ে ফোকর গলে। আপসহীন ইস্পাতকঠিন শপথে উদ্বুদ্ধ সংগ্রামী ছাত্রছাত্রীদের আটকায় কে! সাফিয়া আপা, হালিমা ও আমি গেটের কাছে আসি এবং সব ছাত্রী যাতে মিছিলে যোগ দিতে পারে, সে সুযোগ সৃষ্টিতে সাহায্য করি। সাফিয়া আপা যান লাঠির ওপর দিয়ে, হালিমা লাঠির নিচ দিয়ে। দুটোর কোনোটাই আমার মনঃপূত হলো না। সে জন্য আমি ক্রমাগত ধাক্কা দিয়ে লাঠির কর্ডন সরিয়ে ফেলতে আপ্রাণ চেষ্টা করি এবং কর্ডন ভেদ করে তৃতীয় দলের সঙ্গে মিছিলে যোগ দিই।

প্রথম ও দ্বিতীয় দলের ছাত্রছাত্রীদের পুলিশ ট্রাকে তুলে নেয়। আপসহীন বিক্ষুব্ধ ছাত্রছাত্রীর ধাক্কায় পুলিশ কর্ডন ভেঙে যায়। সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় পুলিশের লাঠিচার্জ। আমি নিজেও তার হাত থেকে রেহাই পাইনি। পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের শেল ছুড়লে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে ত্রাসের সঞ্চার হয়। কাঁদানে গ্যাসের সঙ্গে আমাদের অনেকেরই পরিচয় ছিল না। স্থানটি মুহূর্তে অন্ধকার হয়ে গেল। চোখ জ্বালা করছিল। শেলটি পড়ে গাজীউল হকের ওপর। আহত গাজীউল হককে ছাত্ররা ধরাধরি করে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যায়। কাঁদানে গ্যাসের প্রভাব থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য রুমাল ভিজিয়ে আনতে অনেকেই ছুটে যায় বেলতলার পুকুরে। কাঁদানে গ্যাস ও লাঠিচার্জের মধ্যেই আমি ছুটে গেলাম অ্যাসেমব্লি হলের (জগন্নাথ হল) দিকে। নৈরাজ্য সৃষ্টিকারী কিছু মাত্র মিছিল ভন্ডুল করে দেওয়ার উদ্দেশ্যে পুলিশের ওপর ইটপাটকেল ছুড়তে থাকে। পুলিশের সঙ্গে কিছু ছাত্রছাত্রীও এতে আহত হয়।

বিজ্ঞাপন

বেলা প্রায় সাড়ে তিনটায় মিছিল মেডিকেলের মোড়ে পৌঁছালে জেলা প্রশাসক কোরেশীর নির্দেশে পুলিশ অবিরাম গুলি ছুড়তে থাকে। সঙ্গে সঙ্গে প্রাণ দেয় বরকতসহ অনেকে। মেডিকেলের উল্টো দিকে এস এম হলের প্রভোস্ট এম এ গনির বাড়ি। তাঁর বাড়ির সীমানায় কাঁটাতারের বেড়া। রাস্তার ধারে একটি রেস্টুরেন্ট, দু-একটি বইয়ের দোকান ও মুদিদোকান ছিল। রেস্টুরেন্টের এক কোণে অনেকগুলো ভাঙা রিকশার স্তূপ। বর্তমানে সে স্থানটি শহীদ মিনার। কাঁদানে গ্যাস আর গুলির মধ্যে ঠিক বুঝতে পারছিলাম না গুলি আসছে কোন দিক থেকে। তাই দৌড়ে গিয়ে ভাঙা রিকশার অংশের মধ্যে আশ্রয় নিলাম। কিন্তু সে জায়গাটা নিরাপদ মনে হলো না। অনবরত গুলি চলতে থাকল ঠা ঠা করে। গুলির মধ্যেই কাঁটাতারের বেড়া পার হয়ে গনি সাহেবের বাড়ির ভেতরে গিয়ে আশ্রয় নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। অগ্নিসাক্ষী হয়ে বেঁচে থাকার সেই উত্তেজনাপূর্ণ মুহূর্তগুলোর অনুভূতি ব্যক্ত করার ভাষা আমার জানা নেই। ভাঙা রিকশার স্তূপের ওপর চড়ে কাঁটাতারের ওপর দিয়ে লাফ দিলাম। কাঁটাতারের মধ্যে আমার শাড়ি আটকে গেল। কাঁটাতার থেকে কেউ আমার শাড়ি ছাড়িয়ে দিয়েছিল। অবিরাম গুলির মধ্যে পেছনে ফিরে তাকিয়ে দেখার মতো সময় ছিল না। আমি আজও জানি না, সেই মহান মানুষটি কে ছিলেন।

ভেতরে গিয়ে দেখি আহত সারা তৈফুর, সুফিয়া ইব্রাহিম, বোরকা শামসুন, সুরাইয়া ও ডলি। ওরা আমার আগেই কাঁটাতারের বেড়া পার হয়ে চলে এসেছে। আহত অবস্থায় একজন অন্যজনের দিকে তাকাচ্ছিলাম। ওরা আমাকে দেখে বিচলিত হয়ে গনি সাহেবের বাড়ি থেকে পানি চেয়ে এনে খাওয়াল। কার কী হয়েছে, সেদিকে হুঁশ নেই। আমরা সবাই আতঙ্কগ্রস্ত। পুলিশি জুলুমে আমাদের কতজন হত, আহত বা গ্রেপ্তার হয়েছে, কিছুই জানি না। তাদের জন্য আমরা বিচলিত হয়ে আছি।

পরিবেশ তখন এমনই থমথমে যে হোস্টেলে ফিরে যাওয়ার সাহস পাচ্ছি না। দিনটি ছিল মেঘলা। পুলিশ ছাড়া পথে এতক্ষণে আর কোনো প্রাণী নেই। ক্ষুধা, তৃষ্ণা ও আতঙ্কের মধ্যে ভাবছিলাম সংগ্রামী ভাইবোনদের কথা। রাস্তার দিকে তাকিয়ে দেখি বাংলা বিভাগের অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী যাচ্ছেন। তাঁর সেই চিন্তিত মুখখানি আজও আমার মনে উদ্ভাসিত। ‘মুনীর ভাই’ বলে ডাক দিলাম। তিনিই আমাকে হোস্টেলে পৌঁছে দিলেন। (সংক্ষেপিত)

রওশন আরা বাচ্চু: ভাষাসংগ্রামী

সূত্র: ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ (দৈনিক প্রথম আলো, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০০২) থেকে

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন