default-image

বিশিষ্ট সাংবাদিক ও প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক মিজানুর রহমান খানের মৃত্যুতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে বিশিষ্টজন ও তাঁর পরিচিতজনেরা শোক জানিয়েছেন। তাঁকে নিয়ে নিজেদের ব্যক্তিগত ঘটনার স্মৃতিচারণা করেছেন। সেখান থেকে কিছু লেখা তুলে ধরা হলো পাঠকদের জন্য।


মিজানুর রহমান খান করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিলেন। সোমবার সন্ধ্যায় রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি ইন্তেকাল করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তাঁর বয়স হয়েছিল ৫৩ বছর।


অধ্যাপক আলী রীয়াজ

রাজনীতি ও সরকার বিভাগ, ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাষ্ট্র

মিজানুর রহমান খানের সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটে ২০০৫ সালে, ১৫ বছর আগে, ঢাকায় প্রথম আলোর সূত্রে। এরপরে আমার ঢাকা সফরে প্রতিবার মিজানের সঙ্গে দেখা হয়েছে, কথা হয়েছে। এর বাইরে টেলিফোনে, ই-মেইলে যোগাযোগ তো আছেই। মিজান যখন বাংলাদেশবিষয়ক দলিলের সন্ধানে যুক্তরাষ্ট্রের আর্কাইভে কাজ করতে এলেন, তখন আমাদের দেখা হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু ফোনে নিয়মিত কথা হলেও শেষ পর্যন্ত দেখা হয়নি।
মিজানের লেখা পড়ে ভিন্নমত জানাতে, ঐকমত্য প্রকাশ করতে বহুবার কথা হয়েছে। আমার কঠোর সমালোচনা সত্ত্বেও মিজান কখনোই আমার ওপরে ক্ষুব্ধ হননি, উপরন্তু হাসিমুখেই এগুলো সহ্য করেছেন। আমি ঢাকায় যে বোনের বাড়িতে থাকি, সেখানে মিজান আসেন; বোনকে বলি, ‘মিজান আসবে; চিনতে পেরেছেন?’ মিজানকে আমার বোন চেনেন প্রথম আলোর লেখক আর টেলিভিশনের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গুরুগম্ভীর বিষয়ের আলোচক হিসেবে; আমার বন্ধু হিসেবেও। আমি বলি, ‘ওই যে মিজান, উচ্চ স্বরে কথা বলে।’
মিজান উচ্চ স্বরে কথা বলেন, কিন্তু তাঁর বিনয় এবং অপরের প্রতি, অপরের মতের প্রতি শ্রদ্ধা অপরিসীম। উচ্চ স্বরে কথা না বললে মিজানকে মানায় না। তাঁর হাসি সংক্রামক। অনেকবার মিজানকে বলেছি, ‘আপনার ওপরে তো আমি রাগ করেছি।’ মিজানের ওপরে এর চেয়ে বেশি রাগ করা সম্ভব বলে আমার কখনোই মনে হয়নি। মিজানের শারীরিক অবস্থার অবনতির খবরে উদ্বিগ্ন হয়ে আছি।
গত দিনগুলোতে জাকারিয়ার (প্রথম আলোর সাংবাদিক) সঙ্গে কথা বলার সময়ে আশা করেছি জাকারিয়া বলবে, এখন ভালোর দিকে। সেটা শুনি না, কিন্তু ভেবেছি, অবস্থার অবনতি হচ্ছে না। সেটাই বা কম কী। এখন আমরা এমন একসময়ে আছি যে সামান্য আলোর রেখাই মনে হয় অনেক বড়।
মিজান শিগগিরই ভালো হবেন, আবার উচ্চ স্বরে কথা বলবেন, টেলিফোনে কথা হবে, ঢাকায় দেখা হবে, আমি মিজানকে বলব, ‘আমি তো আপনার ওপরে রাগ করেছি’, মিজান হেসে উঠে বলবে, ‘কেন রীয়াজ ভাই?’ তাঁর হাসি সংক্রমিত হবে আমার মধ্যে। এইটুকু প্রত্যাশা তো করতেই পারি, পারি না?

বিজ্ঞাপন

অধ্যাপক আসিফ নজরুল

আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

একজন সৎ, খাঁটি ও বিশুদ্ধ সাংবাদিকের জন্য আমার ভালোবাসা। আল্লাহ, তুমি আমাদের মিজানকে (মিজানুর রহমান খান) ভালো রেখো। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।

মনজুরুল আহসান বুলবুল

সাংবাদিক

মেনে নেওয়া কঠিন। মিজানুর রহমান খান, সহকর্মী, বন্ধু, আপনাকে বিদায় বলা খুবই কষ্টের। আপনার এভাবে চলে যাওয়া মেনে নেওয়া কঠিন। আপনাকে উদাহরণ হিসেবে দাঁড় করিয়েই তরুণদের বলি, ‘সাংবাদিকতা মূর্খদের পেশা নয়, আজকের যুগে সাংবাদিকতা করতে  গেলে মিজানের মতো শিক্ষিত হতে হয়।’ সংবিধান আর আইন নিয়ে আপনার পেশাগত দক্ষতা সবার সামনে দৃষ্টান্ত। নানা বিষয়ে মার্কিন গোপন দলিল নিয়ে আপনার কাজের তুলনা হয় না। আপনার শূন্যতা পূরণ হতে অনেক সময় লাগবে।

কুদ্দুস আফ্রাদ

ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের একাংশের সভাপতি মনটা ভালো নেই। খুবই খারাপ। সন্ধ্যায় খ্যাতিমান সাংবাদিক ও একদা সহকর্মী মিজানুর রহমান খানের মৃত্যুসংবাদে সবকিছু এলোমেলো মনে হচ্ছে।

আশরাফুল আলম খোকন

প্রধানমন্ত্রীর উপ–প্রেস সচিব

সাংবাদিকতার শুরুতেই মিজান ভাইয়ের সঙ্গে কাজ করেছি। যদিও খুব অল্প দিন এবং আমি ছিলাম একেবারেই শিক্ষানবিশ। তবুও তখনই বুঝতে পারতাম, তিনি পড়াশোনা জানা একজন সাংবাদিক—গতানুগতিক না। দিনের পর দিন ওনার লেখাগুলো প্রায় গোগ্রাসেই গিলেছি, শুধু পড়েছি বললে ভুল হবে। ওনার অনেক কিছুর সঙ্গে আমি একমত ছিলাম না। কিন্তু এটা বলতেই হবে, তাঁর সাংবাদিকতা ছিল অন্য মাত্রার। আমি তাঁর লেখার এবং সাংবাদিকতার অন্যতম একজন ভক্ত। ওপারে ভালো থাকবেন, মিজান ভাই।

রুহিন হোসেন প্রিন্স

সিপিবি নেতা

একজন মিজানুর রহমান খান। তাঁর প্রকাশিত লেখা প্রথমেই পড়া। অল্প দেখায়, দাঁড়িয়ে অল্প সময়ে অনেক কথা। গভীরতায় ঢুকে যাওয়া। অনেক কিছু জানার। আর তো হবে না। এই বয়সে চলে যাওয়া। এটাও মেনে নিতে হবে। শোকাহত আমরা। শ্রদ্ধাঞ্জলি।

মাহমুদুর রহমান মান্না

রাজনীতিক

মিজানুর রহমান খান আর নেই। তাঁর অকালপ্রয়াণে আমি গভীর শোক জানাচ্ছি। তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি। তাঁর শোকাহত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাই আমি। করোনা এই দেশের অনেক গুরুত্বপূর্ণ মানুষকে আমাদের কাছ থেকে নিয়ে গেছে, যার সর্বশেষ সংযোজন মিজানুর রহমান খান। অত্যন্ত কম বয়সে (৫৩ বছর) মারা গেছেন মিজান। তাঁর মতো মানুষেরা সময়ের সঙ্গে আরও অনেক পরিণত হয়ে ওঠেন। আরও পরিণত একজন মিজানের কাজ থেকে আমরা বঞ্চিত হয়েছি, এটা ভীষণ হতাশার। কিন্তু এটাও আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, এই সময়ের মধ্যে তিনি যা করেছেন, সেটাও ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ এবং সেটা অনাগত দিনেও আমাদের পথ দেখাবে।

পীর হাবিবুর রহমান

সাংবাদিক

করোনায় বড় অকালেই চলে গেলেন আমার একসময়ের সহকর্মী মিজানুর রহমান খান। প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক। সংবিধান ও আইন আদালতের এমন বিশ্লেষণ পাণ্ডিত্য আর মিলবে না কলামে। শূন্যস্থান পূরণ হওয়ার নয় মিজানুর রহমান খানের। গভীর শোক ও বেদনায় বিদায় বন্ধু। মেধাবীরা চলে যায় কেন অকালে! আল্লাহ রহম করো।

মিজানুর রহমান খান

বিবিসির সাংবাদিক

তাঁর সঙ্গে আমার কখনো কথা হয়নি। কিন্তু তাঁর কথা অনেকের কাছে শুনেছি। অনেকে মনে করতেন আমি তিনি। এই ভেবে আমাকে মেসেজ পাঠিয়েছেন। বলেছেন, তিনি আমার লেখার ভক্ত, আমার নিবন্ধ তাঁর ভালো লাগে। আমি অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে জবাব দিয়েছি এই বলে যে তিনি অন্য এক ব্যক্তি।

তাঁর কথা প্রথম শুনি যখন আমি বিচিত্রার সাংবাদিক। তিনি তখন বাংলাবাজার পত্রিকায় কাজ করেন। কেউ যখন তাঁকে বলতেন, ভাই, এ সপ্তাহে বিচিত্রায় আপনার কভার স্টোরি পড়েছি, তখন নাকি তিনি খুব লজ্জা পেতেন এবং বলতেন যে তিনি সেটা লিখেননি। সম্প্রতি তিনি যখন অসুস্থ হয়ে পড়েন, তখন অনেকেই আমার সুস্থতার জন্য প্রার্থনা করে আমাকে মেসেজ পাঠিয়েছেন। প্রচণ্ড বেদনার সঙ্গে আমি তখন তাঁদের জানিয়েছি যে আমি সুস্থ আছি, কিন্তু শুনেছি ওনার অবস্থা ভালো না; আসুন, আমরা সবাই তাঁর জন্য প্রার্থনা করি।

আমার খুব ইচ্ছে ছিল তাঁর সঙ্গে পরিচিত হওয়ার। আমার ধারণা, আমার মতো তিনিও হয়তো নাম নিয়ে একই রকম প্রশ্নের মুখে পড়তেন। ইচ্ছে ছিল, দেখা হলে তাঁর সঙ্গে এটা নিয়ে মজা করব। তাঁর সঙ্গে আমার আর কোনো দিন পরিচয়ও হবে না।

প্রথম আলোর সাংবাদিক মিজানুর রহমান খানের মৃত্যুর খবরে আমার এ রকম অনুভূতি হচ্ছে যেন আমার নিজের মৃত্যু হয়েছে। তাঁর অনন্ত জীবনের জন্য প্রার্থনা করছি এবং আশা করছি, আরেক জীবনে তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয় হবে।

আব্দুন নূর তুষার

মিডিয়া ব্যক্তিত্ব

এক গাড়িতে বহুবার ঢাকার বাইরে গেছি। আইনি বিষয়ে গল্প-তর্ক করেছি। ভালো মানুষ ছিলেন। অকপটে নিজের কথা বলতেন। বিদায় নয়, আপনাকে স্মৃতির স্থায়ী অংশে বাকি জীবন রাখতে হবে। মিজানুর রহমান খান, ভাই আমার।

নুরুল হক

ডাকসুর সাবেক ভিপি

স্বল্প সময়ের জানাশোনায় অসাধারণ পাণ্ডিত্যের অধিকারী একজন সহজ-সরল মানুষ মনে হয়েছে। তরুণদের নিয়ে খুবই আগ্রহী একজন ইতিবাচক মানুষ ছিলেন, ইন্টারভিউয়ের সুবাদে তিন–চারবার সামনাসামনি কথা হয়েছিল। সরল মনে বেশ কিছু ভালো পরামর্শ দিয়েছেন, যা আমাদের মতো তরুণ নেতৃত্বের জন্য অনুসরণীয়। এত তাড়াতাড়ি চলে যাবেন, ভাবতে পারিনি মিজান ভাই! আল্লাহ আপনাকে বেহেশত নসিব করুন।

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন