default-image

সম্প্রতি ২৭ বাংলাদেশির আটকে পড়াকে ঘিরে ভিয়েতনামে মানব পাচারের বিষয়টি সামনে এলেও একটি সংঘবদ্ধ চক্র বছর দুয়েক ধরেই ওই অপরাধের সঙ্গে যুক্ত। গণমাধ্যমে বিজ্ঞাপন দিয়ে লোকজনকে মিথ্যা আশ্বাসের ফাঁদে ফেলে চক্রটি লোকজনকে ভিয়েতনামে নিয়ে যায়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা, পাচারের শিকার লোকজন ও মানবাধিকারকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে এসব কথা জানা গেছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, পাচারের শিকার অনেককে আগে মালয়েশিয়াসহ ভিয়েতনামের প্রতিবেশী দেশে পাঠানো হয়েছে। আর বছর দেড়েক ধরে কম বেতনে ভিয়েতনামে কাজ করতে বাধ্য করা হচ্ছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও ভিয়েতনামে বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তারা জানান, ২০১৮ সালের মে থেকে এ বছরের জুলাই পর্যন্ত ৪০ জনের প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা করেছে দূতাবাস। তাঁদের মধ্যে ৩৩ জন মানব পাচারকারীদের প্রতারণার শিকার হয়ে দেশটিতে গিয়েছিলেন।

মানব পাচারের শিকার ১১ জন ৩ জুলাই বাংলাদেশ দূতাবাসের সহযোগিতায় ভিয়েতনাম থেকে ঢাকায় ফেরেন। ফিরে আসা ছয়জনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাঁদের সবাই গত বছরের নভেম্বরে কয়েক শ ডলারের কাজের চুক্তিতে ভিয়েতনামে যান। অথচ তাঁরা কেউই প্রতিশ্রুত কাজ কিংবা বেতন পাননি। অনেকেই নিয়মিত কাজ পাননি। এ ছাড়া পাচারকারী চক্র তাঁদের বেতন থেকে টাকা কেটে রাখত। দেশে টাকা পাঠাতে চাইলে টাকা নিত। সব মিলিয়ে অবর্ণনীয় দুর্ভোগে পড়া লোকজন দেশে ফিরতে বাধ্য হন।

তাঁরা জানান, গত সাত মাসে তাঁদের সঙ্গে অন্তত ৩০০ থেকে ৫০০ বাংলাদেশির দেখা হয়েছে, যাঁদের অধিকাংশই গেছেন গত দেড় বছরে।

জানতে চাইলে ভিয়েতনামে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত সামিনা নাজ গত শনিবার প্রথম আলোকে বলেন, ‘২০১৮ সালের নভেম্বরে এখানকার একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রায় ৫০ জন বাংলাদেশির বিষয়ে দূতাবাসের কাছে জানতে চেয়েছিল। পরে আমরা জেনেছি, ঢাকার একটি প্রতিষ্ঠান তাঁদের ভিয়েতনামের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য আনছে। এরপর আমরা খোঁজ নিয়ে জানতে পারি, ঢাকার মোহাম্মদপুরের একটি প্রতিষ্ঠান চাকরিসহ ডিপ্লোমার কথা বলে লোকজনকে ভিয়েতনামে আনার সঙ্গে যুক্ত। এ নিয়ে পরে দূতাবাসের পক্ষ থেকে ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে ঢাকায় জানিয়ে দেওয়া হয়, একটি চক্র পর্যটন ভিসায় বাংলাদেশ থেকে লোকজনকে এনে বিপদে ফেলছে। কারণ, ভিয়েতনামে এভাবে কর্মী নিয়োগের কোনো সুযোগ নেই।’

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, মানব পাচারকারীদের প্রলোভনে পড়ে ভিয়েতনামে বিড়ম্বনার শিকার অন্তত ১০ বাংলাদেশিকে ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে ঢাকায় ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করে বাংলাদেশ দূতাবাস। ২০১৯ সালে প্রতারিত হওয়া ১২ জনকে দূতাবাস ফেরত পাঠায়।

ভিয়েতনামে পাচারের শিকার হয়ে ঢাকায় ফেরা ১২ অভিবাসী কর্মীর আইনি সুরক্ষার বিষয়ে কাজ করেছিল বাংলাদেশ নারী শ্রমিক কেন্দ্র (বিএনএসকে)। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক সুমাইয়া ইসলাম গতকাল রোববার প্রথম আলোকে বলেন, ফিরে আসা ১২ অভিবাসী কর্মীর সঙ্গে কথা বলে তাঁরা জেনেছেন, তাঁদের প্রলোভন দেখিয়ে ভিয়েতনামে নেওয়া হয়। পরে তাঁদের পরিস্থিতি বুঝে ইতালিতে নেওয়ার আশ্বাসও দেওয়া হয়। তিনি আরও বলেন, দেশে ও দেশের বাইরে একটি প্রভাবশালী সংঘবদ্ধ চক্র ভিয়েতনামে মানব পাচারের সঙ্গে যুক্ত।

তবে প্রায় দুই বছর ধরে মানব পাচারকারীদের খপ্পরে পড়া লোকজনকে ফেরত পাঠানো এবং এ নিয়ে ঢাকায় বার্তা পাঠানোর পরও যে চক্রটি থামেনি, তা আটকে পড়া ২৭ বাংলাদেশির দুর্ভোগ থেকে স্পষ্ট।

ভিয়েতনামের একটি ফোম তৈরির কারখানায় প্রতি মাসে ৪৫০ ডলার বেতনে কর্মী নেওয়া হবে—রাজধানীর নয়া পল্টনের মসজিদ গলির একটি প্রতিষ্ঠানের দালালেরা ফেনীর তরুণ জহির আহমেদকে এমন কথা বলেছিলেন। এরপর ওই প্রতিষ্ঠানকে ৩ লাখ ২০ হাজার টাকা দিয়ে গত বছরের নভেম্বরে ভিয়েতনামে যান জহির আহমেদ। সে দেশে নিয়ে জহিরকে কাজ দেওয়া হয় একটি করাতকলে। আর মাসিক বেতন ধরা হয় ১৮০ ডলার।

নিজের তিক্ত অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিতে গিয়ে জহির আহমেদ গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘ভিয়েতনামে যাওয়ার আগে ধারণা করতে পারিনি এত বাজে পরিস্থিতিতে পড়তে হবে। কিন্তু কয়েক লাখ টাকা দিয়ে যখন এসেই গেছি, কিছুদিন থেকে চেষ্টা করি। বাংলাদেশ ও ভিয়েতনামে অবস্থানকারী বাংলাদেশের কয়েকজন নাগরিক এই সংঘবদ্ধ চক্রের সদস্য। তাঁরা আমাদের দেখিয়ে সেখানকার নিয়োগকারীদের জানান, তাঁদের টাকায় আমরা ভিয়েতনামে গেছি। তাই আমাদের বেতনও তাঁরা নিয়ে নেন। দেশে টাকা পাঠাতে চাইলে সেখান থেকে টাকা কেটে রাখেন। পরে বাধ্য হয়ে প্রাণ বাঁচাতে দেশে ফিরে এসেছি।’

জহির আহমেদ বলেন, গত ছয় মাসে শ তিনেক বাংলাদেশির সঙ্গে তাঁর হো চি মিন সিটিতে দেখা হয়েছে, যাঁদের সবাই ওই চক্রের খপ্পরে পড়ে ভিয়েতনামে গেছেন। আর ভিয়েতনামের যে পরিস্থিতি, তাতে এখনো বাংলাদেশের অভিবাসী কর্মীদের সেখানে গিয়ে কাজের কোনো সুযোগ নেই।

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন