মিরকাদিমের বাতাসে শুধুই হাহাকার

বিজ্ঞাপন
default-image
>দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো ৩৩ জনের মধ্যে ৩০ জনই মুন্সিগঞ্জের বাসিন্দা। সদরের ১৯ জনের মধ্যে ১১ জন মিরকাদিমের।

সোমবার সকালটা ছিল রোদঝলমলে। মুন্সিগঞ্জের কাঠপট্টি ঘাট থেকে নিঃশঙ্কচিত্তে ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা করে এমএল মর্নিং বার্ড। দুর্ঘটনার দূরতম শঙ্কাও ছিল না লঞ্চটির শতাধিক যাত্রীর মনে। অথচ সদরঘাটের কাছে পৌঁছাতেই হঠাৎ সবকিছু এলোমেলো। মুহূর্তেই তাজা প্রাণগুলো পরিণত হয়ে যায় লাশে। মুন্সিগঞ্জে এখন বাড়ি বাড়ি চলছে মাতম।

সোমবারের লঞ্চ দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো ৩৩ ব্যক্তির মধ্যে ৩০ জনই মুন্সিগঞ্জের বাসিন্দা। এর মধ্যে মুন্সিগঞ্জ সদর উপজেলার ১৯, টঙ্গিবাড়ী উপজেলার ১১ জন এবং শ্রীনগরের একজন। সদরের ১৯ ব্যক্তির মধ্যে আবার ১১ জনই মিরকাদিম পৌর এলাকার বাসিন্দা।

গোয়ালগুন্নি এলাকার সুমন তালুকদার (৩৫)। ১৪ বছর আগে ভালোবেসে বিয়ে করেন ঝুমা বেগমকে (৩০)। সংসারে ১০ ও ১১ বছরে দুই ছেলে। সুমন ঢাকার ইসলামপুরে একটি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মী। অফিসে পৌঁছাতে দেরি হয়ে যাবে, তাই সোমবার সকালে তড়িঘড়ি করে বের হয়ে যান। স্ত্রীকে বলেছিলেন, কথা বলার সময় নেই। বাড়ি ফিরে এসে অনেক কথা বলবেন। সুমন বাড়ি ফিরেছেন ঠিকই, তবে লাশ হয়ে। তাঁর ‘অনেক কথা’ আর শোনা হলো না স্ত্রী ঝুমার।

কাঁদতে কাঁদতে মূর্ছা যাচ্ছিলেন একই এলাকার অপর ব্যাংককর্মী শাহাদাত হোসেনের (৪৮) স্ত্রী, ছেলে, ভাই ও অন্য স্বজনেরা। স্ত্রী রিতা বেগম শোকে স্তব্ধ ছিলেন। শরীরে যেন কান্নার শক্তিটুকুও আর নেই তাঁর। ১০ বছরের ছেলে সিহাব বলছিল বাবার কথা। বাবা বলেছিলেন, বাড়ি ফিরে ক্রিকেট খেলার ব্যাট কিনে দেবেন। বাড়ির পাশের দোকান থেকে খাবার কিনে দেবেন। বাবা মারা গেছেন, এতটুকু বুঝতে পেরেছে সিহাব। তবে ব্যাট ও খাবার কিনে দিতে বাবা যে আর কখনো আসবেন না, তা বোঝার বয়স হয়নি।

নৈদিঘির পাথর এলাকার দিদার হোসেন (৪৫)। ছোট দুই বোন ও বড় ভাইয়ের মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার পরই সংসারী হওয়ার সুযোগ মিলেছিল। মাত্র সাত মাস আগে বিয়ে করেছিলেন। স্ত্রী রোকসানা বেগমকে বলেছিলেন, পরিবারের সবার দিকে যেমন করে খেয়াল রেখেছিলেন, তেমনি করে বুড়ো বয়স পর্যন্ত তাঁকে আগলে রাখবেন। কখনো রোকসানাকে কষ্ট দেবেন না। রোকসানা বলেন, তাঁর স্বামী কথা রাখেননি। তাঁকে না ভোলার মতো কষ্ট দিয়ে চলে গেলেন। সঙ্গে তাঁর আদরের ছোট বোন হাফেজা খাতুনকেও (৩৮) নিয়ে গেছেন।

default-image

দিদার ও হাফেজার বড় ভাই আওলাদ বলেন, তাঁদের আরেক বোন মাহফুজার স্বামী অসুস্থ। তাঁকে দেখতে ঢাকায় যেতে চেয়েছিলেন হাফেজা। দিদার ঢাকার বেগম বাজারে ডালের আড়তে কাজ করতেন। তাই বোনকে সঙ্গে নিয়ে যান। মাহফুজার বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে কাজে যাওয়ার কথা ছিল দিদারের। বলেছিলেন, বোনকে সঙ্গে নিয়েই আবার সন্ধ্যায় বাড়িতে ফিরে আসবেন।

একই এলাকায় পাপ্পু মিয়াদের (৩২) বাড়ি। স্ত্রী-সন্তান ছাড়াও মা-বাবা আর এক বোনকে নিয়ে সংসার। বড় দুই ভাইয়ের আলাদা সংসার হলেও ভাইদের মধ্যে অসম্ভব মিল। চার ভাইবোনের মধ্যে পাপ্পু সবার ছোট। অভাবের সংসারে পড়াশোনা হয়নি। কৈশোরেই তাই বাবা ও বড় দুই ভাইয়ের পথ ধরে শুরু হয় হকারের কাজ। ঢাকার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মৌসুমি ফল কিনে এনে কখনো মুন্সিগঞ্জের পথেঘাটে, কখনো ঢাকা থেকে ছেড়ে যাওয়া দূরপাল্লার লঞ্চে বিক্রি করতেন। দীর্ঘ এক যুগের বেশি সময় এই কাজ করেছেন। এরই মধ্যে ছয় বছর আগে পাশের গ্রামের মেয়ে ইয়াসমিনকে বিয়ে করে সংসার শুরু করেন।

ছলছল চোখে এসব বলছিলেন পাপ্পুর বড় ভাই শামীম মিয়া। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, দেশে করোনাভাইরাসের প্রকোপ শুরু হলে পাপ্পু ব্যবসা ছেড়ে ঘরে বসে কাটিয়েছেন। কয়েক দিন আগে থেকে আবারও ব্যবসা শুরু করেন। প্রতিদিনের মতো সোমবার সকালেও ঘর ছাড়েন পাপ্পু। রৌদ্রোজ্জ্বল সকালে পাপ্পুকে বিদায় দেন পরিবারের অন্যরা। তখন কেউই ভাবেননি, এটাই হবে তাঁর শেষবিদায়।

পাপ্পু আর ফিরবেন না সে কথা জানেন পরিবারের সবাই। তবে এমন ঘটনার যেন আর পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সেই চাওয়া স্ত্রী ইয়াসমিনের। অবুঝ মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতেই ইয়াসমিন বলছিলেন, এটা কেবলই দুর্ঘটনা নয়। দোষীদের শাস্তি দিতে হবে। এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি বন্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে।

মিরকাদিম পৌরসভার মেয়র শহিদুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, এমন লাশের মিছিল এলাকার কেউ দেখেনি আগে। তিনি প্রতিটি শোকার্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান। পাশাপাশি দোষী ব্যক্তিদের কঠিন শাস্তির দাবি করেন।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন