default-image

শুধু গতানুগতিক কাজকর্মে সীমাবদ্ধ না থেকে নগরবাসীকে সঙ্গে নিয়ে এবং তাঁদের সম্পৃক্ত করে নাগরিক সেবায় আমূল পরিবর্তন আনতে চান ঢাকার ছয় মেয়র পদপ্রার্থী। তাঁদের মতে, ঢাকা শহরের প্রায় সব সমস্যাই চিহ্নিত। এখন দলমত-নির্বিশেষে সবাইকে নিয়ে সমন্বিতভাবে নগর ভবনকে সত্যিকার নাগরিক সেবার কেন্দ্রে পরিণত করাই নির্বাচিত মেয়রের কাজ।
গতকাল সোমবার প্রথম আলো আয়োজিত ‘আমি যদি মেয়র হই’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে মেয়র পদপ্রার্থীরা নাগরিক সেবার মান উন্নয়নের মাধ্যমে পরিবর্তনের পক্ষে তাঁদের অবস্থান তুলে ধরেন। রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলোর কার্যালয়ে এই গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
নগরের সমস্যা সমাধানে অংশগ্রহণমূলকভাবে কাজ করা প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত মেয়র প্রার্থী আনিসুল হক। নির্বাচিত হলে এলাকাভিত্তিক অংশগ্রহণমূলক কমিটি গঠন করার কথা বলেন তিনি। সেই সঙ্গে প্রয়োজন হলে নগর সরকার গঠনের জন্য চেষ্টা করবেন বলেও জানান তিনি।
আনিসুল হক বলেন, ইশতেহার তৈরির আগে ঢাকার ৫২টি সমস্যা নিয়ে একটি জরিপ করেছেন তিনি। এর মধ্যে ৬৮ শতাংশের মতে, নগরের সবচেয়ে বড় সমস্যা মশা। এ রকম বিভিন্ন সমস্যা চিহ্নিত করা হয়েছে। এখন সমাধানের পালা।

default-image

উত্তর সিটিতে বিএনপি-সমর্থিত মেয়র পদপ্রার্থী তাবিথ আউয়াল বলেন, ‘ঢাকা বসবাসের অযোগ্য হয়ে আছে, এটা আমরা জানি। আমরা সেবা পাচ্ছি না। দিন দিন সেবার মান নিচের দিকে যাচ্ছে।’
ঢাকা নিয়ে ১৫ বছর ধরে গবেষণার দাবি করে তাবিথ বলেন, সমস্যা চিহ্নিত। এখন সমাধান করতে হবে। গতানুগতিক চিন্তায় সেটা হবে না। অপরিকল্পিতভাবে ঢাকা শহর গড়ে ওঠার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, নির্বাচিত হলে সমন্বিতভাবে কাজ করবেন। তাঁর স্বপ্ন নারী ও শিশুবান্ধব ঢাকা গড়ে তোলা।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত মেয়র পদপ্রার্থী সাঈদ খোকন বলেন, মেয়র নির্বাচিত হলে প্রথমেই বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে নিয়ে একটি সংলাপ করবেন। নাম হবে ‘ঢাকা ডায়ালগ’। এর ভিত্তিতে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
বিভিন্ন জরিপ ও গবেষণায় ঢাকা সম্পর্কে নেতিবাচক তথ্য প্রকাশ হওয়া সম্পর্কে সাঈদ খোকন বলেন, ঢাকা একটি আবেগময় ও স্মৃতিময় বন্ধনে জড়ানো শহর। এই বন্ধনের মধ্যেই তিনি সংকট সমাধানের সম্ভাবনা দেখতে পান। দলমত-নির্বিশেষে নগরবাসীকে সম্পৃক্ত করে নতুন ঢাকা উপহার দেওয়ার অঙ্গীকার করেন তিনি।

সাঈদ খোকন বলেন, তাঁর বাবা ঢাকার প্রথম নির্বাচিত মেয়র মোহাম্মদ হানিফ ‘নগর সরকার’-এর প্রস্তাব দিয়েছিলেন। নির্বাচিত হলে তিনিও ‘নগর সরকার’ গঠনের উদ্যোগ নেবেন।
উত্তর সিটি করপোরেশনে বিকল্পধারা বাংলাদেশ-সমর্থিত মেয়র পদপ্রার্থী মাহী বি. চৌধুরী বলেন, ‘ঢাকার সমস্যা চিহ্নিত হওয়ার বিষয়ে সবাই ঐকমত্যে পৌঁছেছি। এখন কী করব, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কীভাবে করব।’ তিনি বলেন, ‘আমরা নিরাপদ ঢাকা চাই, চলমান ঢাকা চাই, আলোকিত ঢাকা চাই।’
নির্বাচিত হলে সমস্যা সমাধানে নবীন-প্রবীণ মিলে ‘স্বচ্ছতা কমিটি’ এবং প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীদের আমন্ত্রণ জানিয়ে ‘বিশেষ উপদেষ্টা কাউন্সিল’ গঠন করার ঘোষণা দেন মাহী। এ ছাড়া দায়িত্ব পেলে ঢাকাকে প্রজন্মের শহরে পরিণত করার আগ্রহ প্রকাশ করেন।
নির্বাচিত হলে সবার জন্য বাসযোগ্য মানবিক ঢাকা গড়ে তোলার কথা বলেন একই সিটিতে সিপিবি-বাসদ-সমর্থিত মেয়র পদপ্রার্থী আবদুল্লাহ আল ক্বাফী। ৭১ দফা নির্বাচনী অঙ্গীকার তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমরা তারুণ্যের পুনর্জাগরণ চাই। এ জন্য ৭১ দফা প্রতিশ্রুতি দিয়েছি।’
মেয়র নির্বাচিত হলে ন্যায়পাল নিয়োগ ও দুর্নীতিমুক্ত নগর প্রশাসন গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়ে এই প্রার্থী নিজেও দুর্নীতি থেকে দূরে থাকতে আট দফা ব্যক্তিগত অঙ্গীকারনামা তুলে ধরেন।
নগরের বিভিন্ন সমস্যার কথা উল্লেখ করে একই সিটিতে মেয়র পদপ্রার্থী জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি (জোনায়েদ সাকি) বলেন, ‘নগর সরকার’ ছাড়া সমস্যার প্রকৃত সমাধান সম্ভব না। নির্বাচিত হলে নাগরিকদের মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করবেন তিনি। তাঁর মতে, মানুষ পরিবর্তন চায়, এই নির্বাচনের মাধ্যমেই সেই পরিবর্তন হবে।
ইশতেহার ঘোষণার অনুষ্ঠান থাকায় গোলটেবিলে উপস্থিত হতে পারেননি ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে বিএনপি-সমর্থিত মেয়র পদপ্রার্থী মির্জা আব্বাসের পক্ষে তাঁর স্ত্রী আফরোজা আব্বাস।
নতুন প্রার্থীদের বিভিন্ন প্রতিশ্রুতির কথা উল্লেখ করে নগর বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, ‘আমি আনন্দিত ও আশান্বিত। আমি ভাবছি, এত দিন ওনারা কোথায় ছিলেন। ওনারা নিশ্চয়ই ঢাকাকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন। আমি মনে করি, এঁদের মধ্যে যিনি নির্বাচিত হবেন, তিনি ঢাকাকে এগিয়ে নিতে পারবেন।’
বৈঠকে স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ তোফায়েল আহমেদ সম্ভাব্য মেয়রদের কাউন্সিলরদের সমন্বয়ে কাজ করার পরামর্শ দিয়ে বলেন, মেয়র একনায়কের মতো সিটি করপোরেশন চালাতে পারেন না। তাঁকে অংশগ্রহণমূলকভাবে নগর প্রশাসন চালাতে হবে। অতীতে এমনও হয়েছে দু-তিন বছরেও কাউন্সিলরদের নিয়ে সভা করেননি মেয়র।
একঝাঁক তরুণের মেয়র পদপ্রার্থী হওয়ার ঘটনাকে ইতিবাচক অভিহিত করে অধ্যাপক সারওয়ার জাহান বলেন, সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সুশাসন। এ জন্য দরকার স্বচ্ছভাবে কাজ করা, জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
বৈঠকের সঞ্চালক ও প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান শুরুতে সবাইকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, নির্বাচিত হওয়ার পর মেয়রদের ভালো কাজে সমর্থন দেওয়া হবে। একই সঙ্গে ভুল কাজের সমালোচনা করা হবে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন