মিসরের পথে পথে

বিজ্ঞাপন

১.

হোটেল কক্ষে গিয়ে বের হয়ে পড়লাম। সময় কম এর মাঝে আমাকে ঘুরে দেখতে হবে। কিন্তু তার আগে কিছু খেতে হবে। আক্কাস ভাই বললেন কুশারি খেতে। কুশারি হল এক প্রকার খাবার যেটা ভাত, নুডলস, কালাই , ডাবলি এসব কিছু একসঙ্গে মিক্সড করা। সঙ্গে টমেটোর একটা সস টাইপ দেওয়া যেটা দিয়ে খেতে হয়। খাবারটা মন্দ না। ডেজার্ট হিসেবে খেলাম রোজ বি লাবান। বাংলাদেশে যেটা কে আমরা পায়েস বলি। খাবার শেষে আর এক মিনিট ও অপেক্ষা না ‘মিশন টু পিরামিড’।

কায়রোতে পিরামিড অবস্থিত গিজার আহরাম নামক স্থানে। আহরাম শব্দের অর্থ পিরামিড। ঢোকার পথে আমরা একটা ঘোড়ার গাড়ি নিয়ে নিলাম। কারণ পুরো জায়গাটা অনেক বড়। হেঁটে দেখা সম্ভব না। সব মিলে ৯ টা পিরামিড অবস্থিত। ফারাও খুফু, তার ছেলে কাফ্রা, কাফ্রার ছেলে মেনকুওর এবং তাদের রানিরা। প্রতিটা ফারাও এর পিরামিডের পাশে তাদের রানিদের পিরামিড। রানিদের পিরামিডগুলো আকারে ছোট। এদের মাঝে খুফু পিরামিডটি সবচেয়ে বড়। মাটি থেকে প্রায় ৩০০ ফুট ওপরে রাখা ছিল তার কফিন। আবার কাফ্রের কফিনটা রাখা ছিল মাটি থেকে নিচে। অর্থাৎ খুফু কফিন দেখতে আমাদের ওপরে উঠতে হয়েছে আর কাফ্রে দেখতে নিচে নামতে হবে। গাইড আমাদের এমনটাই বলল। এখানে একটা কথা না বললেই না প্রতিটি পিরামিড এমন করে বানানো যে আপনাকে ঢুকতে এবং বের হতে হবে মাথা নিচু করে। গাইড আমাদের বললেন ফারাওরা চাইত জীবিত থাকা অবস্থায় যেমন সবাই তাদের সামনে মাথা নিচু করে থাকতেন মৃত্যুর পরও সবাই তাদের কাছে মাথা নিচু করে থাকবেন। তাই পিরামিডটাই এমন করে বানানো যে ঢুকতে হবে মাথা নিচু করে বের হতে হবে মাথা নিচু করে। এখানে একটা কথা বলে রাখা ভালো প্রতিটা জায়গায় আলাদা করে টিকিট কাটতে হয়। অর্থাৎ প্রধান গেটে, পিরামিডের ঢোকার গেটে টিকিট কেটে ঢুকতে হয়।

পিরামিড থেকে বের হয়ে আরও কিছুক্ষণ আমরা ঘুরলাম পুরো জায়গাটা। বেলা পড়ে এসেছে এখন যেতে হবে নীল নদে। নীল নদের গল্প কে না জানে। মিশরিও সভ্যতা গড়ে উঠেছে এই নীল নদকে ঘিরে। যেখান যেখান দিয়ে নীল নদ বয়ে গিয়েছে সেখান সেখান দিয়ে মানব বসতি গড়ে উঠেছে। মিসরীয় রা নীল নদকে ‘নাইল’ বলে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তন হয় সবকিছু। নাইল ও আর আগের মতো নেই। তবু এখনো নাকি গ্রাম অঞ্চলের কাছ দিয়ে বয়ে যাওয়া নাইল কিছুটা দূষণমুক্ত। বিকেল বেলা নাইলে নৌকা ভ্রমণ পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ।

আমি যে হোটেলে উঠেছি সেটা হুসেন মসজিদের পাশে। হুসেন মসজিদ বিখ্যাত এই জন্য যে এখানে হজরত হোসেন (রা.) কবর আছে বলে মিশরিওদের দাবি। কৌতূহল বশে রাতের খাবারের পর গেলাম ওখানে। রাতে ঘরে ফিরলাম। হুসাইনি মসজিদকে ঘিরে গড়ে ওঠা দোকানগুলো জমে উঠেছে। সারা রাত খোলা থাকবে দোকানগুলো। Cairo never sleep.

২.
আজকে আমরা যাচ্ছি আলেক্সজান্ডারিয়া। প্রথমে যাব কায়েদ বাই কেল্লা তারপর যাব আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরিতে। বাস, ট্রেন , মাইক্রো থেকে আমরা ঠিক করলাম ট্রেনে যাব। সকাল ৯ টায় ট্রেন তাই খুব সকালে উঠেই কোনো মতে ব্রেক ফাস্ট করে রওনা দিলাম। এখানে ব্রেক ফাস্টে একটা মজার ঘটনা আছে। যে ছেলেটা রেস্তোরাঁয় খাবার দিচ্ছিল তাকে বললাম টিস্যু দিতে। আরবিতে টিস্যুকে ক্লিনিক্স বা মিন্দির বলে। ছেলেটা আমাকে এক বক্স টিস্যু দিয়ে গেল। বলে রাখি সে ইংরেজি বলতে পারে না। বিল দেওয়ার সময় সে টিস্যুর বিল ধরল ৯ ইজিপশিয়ান পাউন্ড। আমি তো অবাক। পরে বুজলাম সে মনে করেছে আমি এক বক্স টিস্যু কিনব। যাই হোক আমি এক বক্স টিস্যু নিয়ে ঘরে ফিরলাম।

default-image

ট্রেনের জার্নি আমার সব সময়ই ভালো লাগে। আড়াই ঘণ্টার মতো লাগে কায়রো থেকে আলেক্সজান্দিয়া যেতে । এর মাঝে ট্রেনে হালকা খাবার খেয়ে নিলাম। তবে এবার আর ভুল করলাম না টিস্যু চাইতে। ট্রেন থেকে নেমে ট্যাক্সি নিলাম। ভূমধ্য সাগরের পাশে এই শহরটি অপূর্ব সুন্দর। সঙ্গে আছে হাড় কাঁপানো ঠান্ডা বাতাস।

কায়েদ বাই কেল্লা:
কৈতবে (অথবা কৈতবে এর দুর্গ, আলেক্সান্ডার) মিসরের আলেকজান্দ্রিয়ায় ভূমধ্যসাগর উপকূলে অবস্থিত ১৫ তম শতাব্দীর আত্মরক্ষামূলক দুর্গ। এটি ১৪৭৭ খ্রিষ্টাব্দে (88২ এএইচ) সুলতান আল-আশরাফ সাঈফ আল-দিদিন কায়েত বে দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। পূর্ববাংলার মুখ থেকে ফেরাস আইল্যান্ডের উত্তরের উপকূলে পূর্ব দিকে অবস্থিত দুর্গটি অবস্থিত।

প্রত্নতাত্ত্বিক ফেরাস আইল্যান্ডের পূর্ব দিকে পূর্ববাংলার প্রবেশপথে অবস্থিত। এটি আলেক্সান্ডার বিখ্যাত লাইটহাউসের সঠিক স্থানে নির্মিত হয়েছিল, যা প্রাচীন বিশ্বের সাতটি আশ্চর্যের মধ্যে একটি ছিল। লাইটহাউস আরব বিজয়ের সময় পর্যন্ত অব্যাহতভাবে চলতে থাকে, তখন বেশ কিছু বিপর্যয় ঘটে এবং লাইটহাউজটির আকার কিছুটা পরিবর্তিত হয় তবে এটি এখনো চলতে থাকে। আহমেদ ইবনে তুলুন (আনুমানিক ৮৮০ খ্রিষ্টাব্দ।) আমলে পুনর্নির্মাণ শুরু হয়। এক সময়ের ভূমিকম্পে অষ্টভুজ অংশকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল। নিচে বেঁচে গিয়েছিল, কিন্তু এটি শুধু ওয়াচটার্টার হিসাবে কাজ করতে পারে এবং ওপরে একটি ছোট মসজিদ নির্মিত হয়েছিল। ১৪ তম শতাব্দীতে একটি খুব বিধ্বংসী ভূমিকম্প ছিল এবং পুরো ভবনটি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল।

পৃথিবীর সপ্তম আশ্চর্যের একটি আলেক্সজান্দ্রিয়ার বাতিঘর। কয়েকটি সুনামির পর এটি ভেঙে গেলে কায়েদ বাই এখানে দুর্গ তৈরি করেন। এই দুর্গটির যেকোনো পাশ থেকে পরিষ্কার সমুদ্র দেখা যায়। দুর্গে ভেতর ছোট ছোট জানালার মতো আছে যেটি দিয়ে দেখলে সমুদ্রকে খুব কাছে মনে হয়। দুর্গের সামনে কিছুটা বাগানের মতো আছে। মন ভালো করে দেওয়ার মতো একটা জায়গা এটি।

মিসরের আলেকজান্দ্রিয়াতে আলেকজান্দ্রা গ্রেট গ্রন্থাগার প্রাচীন বিশ্বের বৃহত্তম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থাগারগুলো মধ্যে একটি ছিল। গ্রন্থাগারটি মাওসিয়ন নামক একটি বড় গবেষণা প্রতিষ্ঠানের অংশ ছিল, যা আর্টসের নয়টি দেবী মূসকে উৎসর্গ করেছিল। আলেকজান্দ্রিয়ায় একটি সর্বজনীন গ্রন্থাগারের ধারণা সম্ভবত টলেমি আই সোটারের আলেকজান্দ্রিয়াতে বসবাসরত একজন নির্বাসিত এথেনীয় রাজপরিবারের ডেমেট্রিয়াস ফ্যালেরুমের প্রস্তাবিত হতে পারে, যিনি লাইব্রেরির পরিকল্পনা প্রতিষ্ঠা করেছেন তবে সম্ভবত গ্রন্থাগারটি সম্ভবত শাসনকাল পর্যন্ত নির্মিত হয়নি। তার পুত্র টলেমি ফিলাডেলফাস। গ্রন্থাগারটি দ্রুত পপিরাস স্ক্রোলগুলির একটি বড় সংখ্যা অর্জন করে, মূলত টোলমেমিক রাজাদের আগ্রাসী এবং গ্রন্থগুলো সংগ্রহের জন্য সুশাসিত নীতিগুলোর কারণে। এটি অজানা অবিকল যে কোনো সময়ে স্ক্রোলগুলিতে কত সংখ্যক স্ক্রল রাখা হয়েছিল, তবে আনুমানিক ৪০,০০০ থেকে ৪০০০০০ এর উচ্চতা।

আলেক্সান্ডার লাইব্রেরিটি পৃথিবীর সব পুরোনো লাইব্রেরির মাঝে একটি। বিশাল বড় এই লাইব্রেরিতে আছে বিভিন্ন ভাষার বই। একটি কক্ষে রাখা আছে অনেক পুরোনো হাতে লেখা বই। এ ছাড়া ও রয়েছে অনেক পুরোনো প্রিন্টিং মেশিন, কিছু ভাষকর্য।

default-image

৩.
আমি মিশর এসেছি এই দিনটার জন্যই। আজকে আমরা কায়রো মিউজিয়াম যাব যেখানে আছে ফারাওদের মমি এবং বালক রাজা তুতান খামুনের সোনার মুখোশ। সকাল সকাল চলে গেলাম মিউজিয়ামে। লম্বা লাইন পেরিয়ে টিকিট পেলাম। মিউজিয়ামে ঢুকতে টিকিট, মমির ঘরে ঢুকতে আর একটা টিকিট এবং ছবি তোলা এবং ভিডিও করার জন্য আলাদা টিকিট কাটতে হয়। সত্যি কথা বলতে কি আমার মতো যারা মিশর সভ্যতার ব্যাপারে বিশাল আগ্রহী তাদের সারা দিন চলে যাবে এখানে।

‘মমি’ মুভি দেখেছেন? ঠিক সেই সব জিনিস পাবেন এখানে। পিরামিডে রাখা ভাস্কর্য, পাথরের গায়ে খোদাই করা হায়ারোগ্লাফিকস, সেই সময়ে ব্যবহার করা রুপার গয়না আর বিশেষ আকর্ষণ তুতানখামুনের সোনার মুখোশ। এখানে বলে রাখা ভালো মমির ঘরে আর তুতান খামুনের মুখোশের ঘরে ছবি তোলা সম্পূর্ণ নিষেধ। মিউজিয়ামে বিভিন্ন ফ্লোরে রাখা কফিনগুলো দারুণ। কোনোটা সাদামাটা কোনটি রংচং-এ । এর মাঝে একটা কফিন বেশ রং চং করা। এটা একজন ধর্মগুরুর ছিল। পুরো কালো রং এর কফিনে হায়ারোগ্লাফিকস লেখাগুলো যেন জীবন্ত।

মমি ঘরে ঢোকার ঠিক আগ মুহূর্তে দেখা পেলাম আনুবিসের। আনুবিসের কথা মনে আছে? মিসরীয়রা বলে ড. আনুবিস। মুখটা যার শিয়ালের মতো। মমিফিকেশনে তার অনেক অবদানের জন্য তাকে ড. আনুবিস বলা হয়। লোকমতে সে অনেক চালাক ছিল নিজেকে লুকিয়ে রাখত বলে এই মুখোশ সে পড়ত।

মমির ঘরে মোট ১১ টার মতো মমি। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ফারাও ও তাদের রানিদের মমি। কোনো মমি মুখোশ পড়া, কোনো মমি অদ্ভুত শুকনো পাতা দিয়ে মালার মতো করে পড়া। কি অদ্ভুত! হাজার হাজার বছর আগে এরা জীবন্ত ছিল, প্রচণ্ড ক্ষমতাধর ছিল আর আজ শুকনো দেহ পড়ে আছে, একটা খোলোশ। ফারাও রামেসিস ২ মমি এখানে রাখা। আমরা মুসলিমরা কম বেশি তার ঘটনা জানি।

default-image

বালক রাজা তুতানখামুনের গল্প আমরা কমবেশি সবাই জানি। ১৮ তম রাজবংশের একটি মিসরীয় ফারাও (শাসনকাল ১৩৩২-১৩২৩ খ্রিষ্টাব্দ), মিসরীয় ইতিহাসের সময়কালে নতুন রাজ্য বা কখনো কখনো নতুন সাম্রাজ্য সময়ের নামে পরিচিত। তার অক্ষত সমাধি আবিষ্কারের পরে, কথিতভাবে কিং টুট হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। তার আসল নাম, তুতানখাতেন, অর্থ ‘আসীন জীবন্ত চিত্র’, তুতঙ্কামুন মানে ‘আমুনের জীবন্ত চিত্র’। হায়ারোগ্লিফগুলোতে, তুতঙ্কামুন নামটি সাধারণত আমেন-তুত-আখ নামে লেখা হয়েছিল, কারণ একটি শ্রদ্ধাশীল প্রথা যা যথাযথ শ্রদ্ধা প্রদর্শন করার জন্য শব্দটির শুরুতে একটি ঐশ্বরিক নাম রাখে।

তুতেন খামুন বিয়ে করেন সৎ বোন আনকেসেনামুনকে। যিনি ছিলেন প্রতাপশালী রানি নেফারতিতির এবং রাজা আখেনাতেনের মেয়ে। সেই হিসাবে নেফারতিতি একভাবে তুত এর সৎ মা এবং শাশুড়ি। তুতানখামুনের মমি এখানে নেই সেটা আছে লুকজর নামক শহরে। যেখানে তাকে সমাধি করা হয়েছিল।

আমার মিশর মিশন এখানেই শেষ। বাড়ির পথে পা বাড়ালাম সঙ্গে নিলাম কিছু সুন্দর স্মৃতি আর মজার কিছু অভিজ্ঞতা। মিশরিওদের কাছে চা অনেক। তবে আমাদের মতো ওরা দুধ মিশিয়ে চা খায় না রং চা বা ব্ল্যাক টি ওরা খেয়ে থাকে। সূর্যমুখী ফুলের বীজ ভাজা যেটাকে বলে লিব। খুব প্রিয় এদের কাছে। রুটি ওদের প্রধান খাবার। ইজিপশিয়ান এই রুটি ওদের পথে ঘাটে সবখানে পাওয়া যায়।

কেউ মিশর যেতে চাইলে কিছুটা সাবধান থাকবেন যদি বোঝে আপনি টুরিস্ট নানাভাবে ওরা আপনাকে ঠকাবে, মিসরীয়দের এই স্বভাবের জন্য তাদার দুর্নামও কম না।

মিশর ফারাও এর দেশ হিসাবে প্রকাশ করতেই বেশি পছন্দ করে। প্রাচীন মিশর এবং মুসলিম কালাচর মিলে মিশে এক নতুন কালচার তৈরি হয়েছে এখানে। মিসরের সিনাই অঞ্চলে অবস্থিত তুর পাহাড় যেটি মুসা (আ.) নবীর ইতিহাসে বিশেষ আলোচিত কিন্তু সেই গল্প এখানে কমই প্রচলিত।

প্রথম দিন টয়লেট গিয়ে বেশ অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। মুসলিম দেশ কিন্তু পানির কোনো ব্যবস্থা নাই। এরপর আবিষ্কার করলাম ফ্লাশের মতোই আর একটা লাইন নিয়ে কমোডের ভেতর থেকে পানি ব্যবস্থা করা হয়েছে কোনো আলাদা পুশ শাওয়ার নেই। এমনটা আগে কোথাও দেখি নাই।

ফারাওদের দেশ মিশর যার বাতাসে মিশে আছে প্রাচীন সভ্যতা এবং না জানা অনেক রহস্য। কে জানে অজানা সেই রহস্যের সমাধান কে কবে করবে!

ডানা মির্জা : লেখক ও কেবিন ক্রু

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন