default-image

‘বাংলাদেশে গণহত্যার বিচার’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে গতকাল শনিবার গণহত্যাবিষয়ক বিশেষজ্ঞ হেলেন জারভিস বলেছেন, যুদ্ধের বিশেষ অস্ত্র হিসেবে ধর্ষণকে পদ্ধতিমূলকভাবে ব্যবহার করার ঘটনা বাংলাদেশে হয়তো বিশ্বে প্রথম।
গতকাল সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে ‘যৌন নির্যাতনসংশ্লিষ্ট অপরাধ ও ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য প্রতিকার’ শীর্ষক আলোচনায় হেলেন জারভিস এ কথা বলেন। রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর এ সম্মেলনের আয়োজন করে। গত শুক্রবার থেকে তিন দিনের এ সম্মেলন শুরু হয়েছে।
কম্বোডিয়ার বিশেষ আদালতের গণসংযোগ বিভাগের সাবেক প্রধান হেলেন জারভিস আরও বলেন, অতীতে যুদ্ধের সময় ধর্ষণের বিচার ছিল বিরল ঘটনা। তবে যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে ধর্ষণকে প্রয়োগের বিচার প্রথম হয় কম্বোডিয়ার আদালতে, যেখানে ধর্ষণকে মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যা সংঘটনের উপাদান হিসেবে ধরা হয়।
আর্জেন্টিনার গবেষক সিলভিনা আন্দ্রেয়া আলোনসোর পক্ষে তাঁর গবেষণাপত্রের সারমর্ম পড়ে শোনান যুক্তরাষ্ট্রের গণহত্যাবিষয়ক বিশেষজ্ঞ অ্যামি ফাগিন। আন্দ্রেয়ার গবেষণাপত্রে বলা হয়, আর্জেন্টিনার সামরিক শাসনামলে নারীদের ব্যবহার করা হতো ‘প্রাকৃতিক ইনকিউবেটর’ হিসেবে, যেখানে নারীদের ধর্ষণ করে জীবিত রাখা হতো অনাকাঙ্ক্ষিত সন্তান জন্ম দেওয়ার জন্য। ওই সন্তান যখন ভূমিষ্ঠ হতো, তখন নারীদের খুন করে সন্তানটিকে বিক্রি করে দিত। ১৯৮৩ সালে আর্জেন্টিনায় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর এ পর্যন্ত মাত্র ১১৬টি এ ধরনের শিশুকে পুনর্বাসন করা সম্ভব হয়েছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের একাধিক মামলায় ধর্ষণের বিচার বিষয়ে আদালতের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগে শিক্ষক উম্মে ওয়ারা। এ পর্বে আরও বক্তব্য দেন সুইজারল্যান্ডের ডিলিং উইথ দ্য পাস্ট অ্যান্ড প্রিভেনশন অব মাস অ্যাট্রোসিটিজ টাস্কফোর্সের মিশেল গটরেট।
বিচারকদের অভিজ্ঞতা বর্ণনার পর্বে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর সাবেক চেয়ারম্যান বিচারপতি এ টি এম ফজলে কবীর বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধকালে যুদ্ধবন্দী ১৯৫ জন পাকিস্তানি সেনাসদস্যদের বিচারের উদ্যোগ সৃষ্টি করার জন্য বাংলাদেশ সরকারের পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। এ জন্য সরকারের দায়িত্ব, আন্তর্জাতিক গোষ্ঠী ও সংস্থাগুলোর মাধ্যমে পাকিস্তানকে চাপ প্রয়োগ করে ফিরিয়ে দেওয়া ওই ১৯৫ সেনাসদস্যের বিচার করতে বাধ্য করা।
এ পর্বে আরও বক্তব্য দেন আর্জেন্টিনার আদালতের বিচারক ড্যানিয়েল হোরাসিও ওবলিগাডো ও কম্বোডিয়ার আদালতের বিচারক আনিয়েৎশকা ক্লোনোউইকা-মিলার্ট। গণহত্যাবিষয়ক বিশেষজ্ঞদের আন্তর্জাতিক সমিতির সভাপতি ড্যানিয়েল ফিয়েরস্টেইন এই পর্ব সঞ্চালনা করেন।
বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধের বিচার নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলের দ্বৈতনীতির সমালোচনা করেন ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সাবেক সদস্য পাওলো কাসাকা। ‘স্মৃতি, ন্যায়বিচার ও গণমাধ্যম: ন্যায়বিচার নিশ্চিতে আন্তর্জাতিক মহলের ভূমিকা’ শীর্ষক আলোচনা পর্বে তিনি বলেন, যেকোনো দেশের চেয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় যে গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে, তার কারণ খুব স্পষ্ট ও পরিষ্কার। এটা ছিল একটি জাতির পরিচয় নিশ্চিহ্ন করার গণহত্যা। বাংলাদেশের ট্রাইব্যুনালের শুরু থেকে আন্তর্জাতিক মহল মানবাধিকারের কথা তুলে একে সমালোচনা করেছে। অথচ খোদ পশ্চিমা বিশ্ব সব সময় গণহত্যার বিচারের পক্ষে কথা বলেছে।
এ পর্বে আরও বক্তব্য দেন আর্জেন্টিনার গবেষক আইরিন ভিক্টোরিয়া মাসিমিনো ও ইউরোপীয় পার্লামেন্টের আরেক সদস্য হেলমুট শলস, বাংলাদেশের ট্রাইব্যুনালে রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি তাপস কান্তি বল।
গতকাল দিনের শেষ হয় ‘গণহত্যা প্রতিরোধে শিল্পকলা ও গবেষণার ভূমিকা’ শীর্ষক আলোচনা দিয়ে। এ পর্বে বক্তব্য দেন বাংলাদেশের ওয়াকিলুর রহমান, যুক্তরাষ্ট্রের অ্যামি ফাগিন, জার্মানির মিরিয়াম বেরিংমেয়ার প্রমুখ।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন