default-image

সবুজ ঘাস বিছানো খানিকটা খোলা জায়গা। তার সামনে কিনার বাঁধানো পুষ্করিণী। তাতে শাপলা ফুটেছে, কিছু মাছও আছে। নাগরিক কৃত্রিমতায় যতটুকু নিসর্গের স্নিগ্ধতার সন্নিবেশ ঘটানো যায় সেই চেষ্টাই করা হয়েছে আগারগাঁওয়ে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে।
বাংলাদেশের সবুজ-সজল প্রকৃতির পরিচয় তুলে ধরার সঙ্গে ইতিহাস-ঐতিহ্য আর মহান মুক্তিযুদ্ধের গৌরবগাথার মেলবন্ধন ঘটেছে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের নিজস্ব নতুন ভবনে। সামনের এই খোলা প্রাঙ্গণ যেখানে মিশেছে মূল ভবনের সঙ্গে, সেখানে সাত বীরশ্রেষ্ঠর প্রতীক প্রাচীন স্থাপত্যরীতির সাতটি স্তম্ভ। এই স্তম্ভগুলো নওগাঁ জেলার পত্নীতলায় (দিবর দিঘিতে) স্থাপিত একাদশ শতকের রাজা দিব্যকের স্তম্ভের অনুকৃতি। ঐতিহাসিকেরা মনে করেন দিব্যকের স্তম্ভই বাংলার প্রথম বিজয়স্তম্ভ। সে কারণেই মুক্তিযুদ্ধে বাঙালির অবিস্মরণীয় বিজয়ের স্মারক সংগ্রহশালায় এই স্তম্ভ রচনা।
এ বছর ১৬ এপ্রিল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয়েছে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের এই নতুন ভবন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এর দ্বরোদ্ঘাটন করেছেন, তিনি ২০১১ সালের ৪ মে এর ভিত্তিপ্রস্তরও স্থাপন করেছিলেন। উদ্যোক্তাদের পক্ষ থেকে ভবন নির্মাণের তহবিল সংগ্রহের জন্য আহ্বান জানানো হয়েছিল সর্বস্তরের জনসাধারণের প্রতি। সেই আহ্বানে বিপুল সাড়া মিলেছে ব্যক্তি থেকে প্রতিষ্ঠান পর্যায়ে। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর এখন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক দেশের একটি অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠান। একই সঙ্গে একটি ছোট উদ্যোগের নানা বাধা পেরিয়ে জনসম্পৃক্ততার ভেতর দিয়ে মহিরুহে পরিণত হওয়ার সফল দৃষ্টান্ত।
সেগুনবাগিচায় ভাড়াবাড়িতে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৯৬ সালের ২২ মার্চ। এটি ছিল একেবারেই ব্যক্তিগত পর্যায়ের উদ্যোগ। সেই দিনগুলোর স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে জাদুঘরের অন্যতম ট্রাস্টি মফিদুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘তখন মুক্তিযুদ্ধের ২৫ বছর পেরিয়ে যাচ্ছিল। মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্ট অনেকে মারা যাচ্ছিলেন। নিয়মিত মেলামেশার একটা পর্যায়ে আমরা সমমনা কয়েকজন ভেবেছিলাম কোথাও তেমন বড় কিছু সংগ্রহ নেই। জাতির এত বড় অর্জনের চিন্তা-স্মৃতি সংরক্ষিত হওয়া দরকার। সেই সূত্রেই জাদুঘরের পরিকল্পনা করা হয়েছিল।’ তিনি জানালেন, সবচেয়ে কঠিন ছিল স্মারক সংগ্রহ করা। এসব স্মারক ব্যক্তিগতভাবে প্রত্যেকের কাছেই খুবই আবেগময়। সে কারণে দাতাদের কাছে আস্থা অর্জন করাটা ছিল জরুরি। দৃশ্যমান একটি অবকাঠামো থাকা অনিবার্য মনে হয়েছিল। তাই প্রথমেই বাড়ি ভাড়া করা হয়েছিল। এরপর সারা দেশে জেলায় জেলায় গিয়ে সুধী সমাবেশ করে মানুষের কাছে জাদুঘরের কারণ ও উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করতে হয়েছে। এসব সমাবেশ থেকেও অনেক নিদর্শন সংগৃহীত হয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টিরা প্রথম থেকেই সচেষ্ট ছিলেন প্রতিষ্ঠানটিকে সর্বজনীন করে তুলতে। চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন জাদুঘরের সঙ্গে জনসাধারণের একটি যোগসূত্র তৈরির। তাঁরা একটি পরিসর সৃষ্টি করছেন এবং সেখানে বিভিন্ন স্তরের মানুষ এসে তাঁদের ভূমিকা রেখেছেন। এটাই মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের সাফল্যের প্রধান কারণ বলে মনে করেন ট্রাস্টিরা। মূল্যবান স্মারক থেকে শুরু করে বিপুল অর্থদানের ভেতর দিয়ে জনগণ এই প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে। দেহাবশেষ, মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদদের ব্যবহৃত সামগ্রী, অস্ত্র, দলিল, চিঠিপত্র ইত্যাদি মিলিয়ে ১৭ হাজারের বেশি নিদর্শন এখন জাদুঘরের সংগ্রহে রয়েছে। আর ১০২ কোটি টাকা ব্যয়ে তৈরি হয়েছে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের নয়তলা ভবন।
ভবনের ভূগর্ভস্থ তিনটি তলায় রয়েছে কার পার্কিং, আর্কাইভ, ল্যাবরেটরি, প্রদর্শনশালা ইত্যাদি। নিচতলায় জাদুঘর কার্যালয় ও মিলনায়তন।

default-image

প্রথম তলায় শিখা অম্লান, বঙ্গবন্ধু ও চার নেতার ব্রোঞ্জ ভাস্কর্য, মুক্তমঞ্চ, ক্যানটিন, স্মারক বিক্রয়কেন্দ্র, টিকিট কাউন্টার। এখানে একটি হেলিকপ্টার ও একটি বিমানও রয়েছে ছাদের সঙ্গে আটকানো। এগুলো ব্যবহৃত হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধে। দ্বিতীয় তলায় গবেষণাকেন্দ্র, পাঠাগার। তৃতীয় ও চতুর্থ তলায় চারটি মূল প্রদর্শনকক্ষ। পঞ্চম তলায় আন্তর্জাতিক প্রদর্শনকক্ষ। এটি অস্থায়ী। এর কাজ এখনো চলছে।
প্রথম প্রদর্শনকক্ষের নাম ‘আমাদের ঐতিহ্য, আমাদের সংগ্রাম’। এই প্রদর্শনকক্ষটিতে প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, পাকিস্তান পর্ব, রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন হয়ে ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচন পর্যন্ত দেশের ভূপ্রকৃতির বৈশিষ্ট্য, ইতিহাস ও সংস্কৃতি তুলে ধরা হয়েছে। ফসিল, প্রাচীন টেরাকোটা, মৃৎপাত্র, শিলাখণ্ডসহ নানা প্রকার নিদর্শনের সঙ্গে রয়েছে ঐতিহাসিক ঘটনা ও ব্যক্তির আলোকচিত্র।
দ্বিতীয় প্রদর্শনকক্ষের নাম ‘আমাদের অধিকার আমাদের ত্যাগ’। এই কক্ষটি থেকেই দর্শক সরাসরি ঢুকে পড়বেন মহান মুক্তিযুদ্ধের পর্বে। ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়বে বিশাল এক সাদাকালো ছবি। স্বাধীনতার দাবিতে রেসকোর্স ময়দানে অগণিত মানুষের বিশাল সমাবেশ, ১৯৭০ সালের ৩ জানুয়ারি ছবিটি তুলেছিলেন শুক্কুর মিয়া নামের এক আলোকচিত্রী। যে ক্যামেরাটি দিয়ে দৃশ্যটি ধারণ করা হয়েছিল, সেই ক্যামেরাটিও আছে ছবির নিচে। এখানে আছে ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর সেই ঐতিহাসিক ভাষণের ছবি। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে বীর বাঙালিরা হাতের কাছে যে যা পেয়েছেন তাই নিয়েই প্রতিরোধযুদ্ধে নেমেছিলেন। গাজীপুর পয়েন্টে টুটু বোরের রাইফেল নিয়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর প্রতিরোধে নেমেছিলেন মুক্তিযোদ্ধারা। সেই রাইফেল আর গুলির বাক্সসহ আছে শহীদ ও মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যবহৃত বিভিন্ন সামগ্রী। আছে কুষ্টিয়ার মেহেরপুরে প্রবাসী সরকার গঠনের দৃশ্য।
এই গ্যালারির একটি অংশে চমৎকার স্থাপনাকর্মের মধ্য দিয়ে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতের গণহত্যার ঘটনা। অপারেশন সার্চলাইট নামে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ঢাকায় ঘুমন্ত বাঙালির ওপর ট্যাংক, কামান, সাঁজোয়া যান নিয়ে অতর্কিতে হামলা চালায়। গ্যালারির এই অংশটি অন্ধকার। সেখানে দেখা যায় ইটের দেয়াল ভেঙে ভেতরে ঢুকছে একটি সামরিক যান। তার হেডলাইট জ্বলছে। সেই আলোয় চোখে পড়ে মেঝের চারপাশে পড়ে আছে গুলিতে নিহত মৃতদেহ। দেয়ালে আছে ঢাকার বিভিন্ন স্থানে চালানো গণহত্যার আলোকচিত্র।
পরের দুটি প্রদর্শনকক্ষ চতুর্থ তলায়। এর প্রথমটির শিরোনাম ‘আমাদের যুদ্ধ, আমাদের মিত্র’। এখানে আছে ভারতে আশ্রয় নেওয়া শরণার্থীদের জীবনযাত্রা, বিদেশি গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের বড় আকারের ডিজিটাল প্রিন্ট। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ, বিভিন্ন সেক্টরে ভাগ হওয়া, রাজাকারদের তৎপরতা, মুক্তিযোদ্ধাদের গেরিলাযুদ্ধের আশ্রয়স্থল এসব। এর পাশাপাশি আছে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে দেশে–বিদেশে যাঁরা বিভিন্নভাবে সহায়তা করেছেন, জনমত সৃষ্টি করেছেন সে দিকগুলো। পণ্ডিত রবিশঙ্করের উদ্যোগে যুক্তরাষ্ট্রে আয়োজিত কনসার্ট ফর বাংলাদেশ, সেই কনসার্টে বিটলসের বিখ্যাত শিল্পী জর্জ হ্যারিসন যে গানটি গেয়েছিলেন সেই ‘বাংলাদেশ বাংলাদেশ’ গানের জর্জের হাতে লেখা পাণ্ডুলিপি, সুরের স্টাফ নোটেশন।
শেষ প্রদর্শনকক্ষটির নাম রাখা হয়েছে ‘আমাদের জয়, আমাদের মূল্যবোধ’। এতে আছে নৌযুদ্ধের বিভিন্ন নিদর্শন। বিলোনিয়ার যুদ্ধের রেলস্টেশনের রেলিং, ট্রলি এসব। মিত্রবাহিনীর ছত্রীসেনাদের আক্রমণ। দগ্ধ বাড়িঘর। সবশেষে বিজয় অর্জন। শেষ হয়েছে ১৯৭২ সালের স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সংবিধানের অনুলিপিটি দিয়ে।

আরও কিছু কর্মসূচি
নতুন প্রজন্মের মনে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা জাগিয়ে রাখা এবং যুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গে তাদের পরিচয় করিয়ে দিতে কিছু কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর। এর মধ্যে অন্যতম মুক্তিযুদ্ধের কথ্য ইতিহাস সংগ্রহ। জাদুঘরের কর্মসূচি সমন্বয়ক রফিকুল ইসলাম জানালেন, ২০০৯ সাল থেকে শুরু হয়েছে এই কর্মসূচি। দেশের প্রতিটি জেলার স্কুল পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের নিজ নিজ এলাকার মুক্তিযোদ্ধা, যুদ্ধে হতাহতের শিকার পরিবারের সদস্য, স্বজন ও প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছ থেকে তাঁদের অভিজ্ঞতা শুনে লিখে পাঠিয়েছে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে। এতে ৬৪ জেলার ১৫ হাজার স্কুলের ১ লাখের বেশি শিক্ষার্থী অংশ নিয়ে ৪০ হাজারের বেশি প্রত্যক্ষদর্শীর ভাষ্য লিখে পাঠিয়েছে। এই কথ্য ইতিহাস রয়েছে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের সংগ্রহে। এসব ভাষ্যের মধ্য থেকে যাচাই–বাছাই করে ‘ছাত্রছাত্রীর সংগৃহীত মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষদর্শীর ভাষ্য’ নামে গ্রন্থাকারে ছয়টি খণ্ড প্রকাশিত হয়েছে।
এ ছাড়া ১৯৯৭ সাল থেকে চলছে ‘আউটরিচ’ কর্মসূচি। এতে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের পক্ষ থেকে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের জাদুঘরে আনা হয়। তারা জাদুঘর পরিদর্শন করে। একটি প্রামাণ্যচিত্র দেখানো হয়। কুইজ প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। বিজয়ীদের পুরস্কার দেওয়া হয়। গত ডিসেম্বর পর্যন্ত এই কর্মসূচিতে ৭৮৯টি স্কুলের ১ লাখ ৯২ হাজার ৭৬১ জন শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছে।
আরেকটি কর্মসূচি হলো মুক্তির উৎসব। প্রতিবছর এই উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। আউটরিচে যেসব শিক্ষার্থী অংশ নেয় তাদের নিয়ে দিনভর আয়োজন করা হয় মুক্তির উৎসব।
মুক্তিযুদ্ধের বছরে যাদের জন্ম তারাই এখন জীবনের অর্ধশতাব্দীর কোঠা ছুঁই ছুঁই পর্যায়ে। সময়ের নিরন্তর প্রবাহে মুক্তিযুদ্ধ আরও দূর থেকে দূরান্তে চলে যাবে। কিন্তু তার গৌরব ও চেতনা ম্লান হবে না কোনো দিন। নতুন প্রজন্মের মধ্যে সেই চেতনা জাগিয়ে রাখার কাজ করে যাবে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর।

আশীষ-উর-রহমান: সাংবাদিক।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0