default-image

শরীরে অক্সিজেন কম নিয়ে যেসব করোনা রোগী হাসপাতালে আসছেন, তাঁদের মৃত্যু বেশি হচ্ছে। ৩৫ শতাংশের মৃত্যু হচ্ছে হাসপাতালে আসার এক দিনের মধ্যে। মৃত্যু পর্যালোচনায় দেখা গেছে, অসংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত ব্যক্তিদের করোনায় মৃত্যুর ঝুঁকি বেশি।

রাজধানীর মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যাওয়া ৯৩ জন করোনা রোগীর চিকিৎসার কাগজপত্র পর্যালোচনা করে এই তথ্য পাওয়া গেছে। তাতে দেখা গেছে, ভেন্টিলেটর ব্যবহার করে একজন রোগীকেও বাঁচাতে পারেনি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। পর্যালোচনার সঙ্গে যুক্ত চিকিৎসক ও গবেষকেরা বলছেন, ভেন্টিলেটরের চেয়ে বেশি প্রয়োজন উচ্চ প্রবাহের অক্সিজেন সরবরাহের ব্যবস্থা।

এই পর্যালোচনাকে দেশের করোনা চিকিৎসার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন জনস্বাস্থ্যবিদ ও চিকিৎসকেরা। সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এ এস এম আলমগীর প্রথম আলোকে বলেন, কত দিন চিকিৎসা হলো, চিকিৎসায় কী কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, কোনো ভুল ছিল কি না, তা এ ধরনের পর্যালোচনা থেকে বেরিয়ে আসে। চিকিৎসাব্যবস্থার উন্নতির জন্য এটা দরকার। মূল উদ্দেশ্য মৃত্যু কমানো।

করোনায় প্রতিদিন মৃত্যু হচ্ছে। দেশে প্রথম মৃত্যু হয়েছিল ১৮ মার্চ। করোনায় গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ১ হাজার ৯২৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এক দিনে ৬৪ জনের মৃত্যুও হয়েছে। মৃত্যু কমানোই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন জনস্বাস্থ্যবিদেরা।

পাবলিক হেলথ অ্যাডভাইজারি কমিটি করোনায় মৃত্যু শূন্যে নামিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে বলেছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে। প্রায় তিন সপ্তাহে আগে একটি ধারণাপত্র ও কর্মকৌশল কমিটির পক্ষ থেকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে দেওয়া হয়েছিল। অধিদপ্তর এ ব্যাপারে এখনো কোনো উদ্যোগ নেয়নি বলে জানা গেছে।

ধারণাপত্র তৈরির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন জনস্বাস্থ্যবিদ আবু জামিল ফয়সাল। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘মুগদা মেডিকেলের মতো ঢাকা মেডিকেল বা অন্য কোনো হাসপাতালে একই কাজ হওয়া দরকার। গবেষণার তথ্য চিকিৎসার উন্নতিতে, মানুষকে সচেতন করার কাজে ব্যবহার করতে হবে। করোনায় আর একজনেরও মৃত্যু হবে না—এটাই লক্ষ্য হওয়া উচিত।’

রোগীর তথ্য পর্যালোচনা

২০ এপ্রিল মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে করোনা রোগীর চিকিৎসা শুরু হয়। গতকাল পর্যন্ত এই হাসপাতালে ১ হাজার ৬৬৫ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে মারা গেছেন ১৫৩ জন। মারা যাওয়া প্রথম ৯৩ জনের তথ্য পর্যালোচনা করেছেন কলেজের অধ্যক্ষ টিটু মিয়াসহ আরও ১০ জন চিকিৎসক ও গবেষক। এর মধ্যে করোনা সন্দেহে কোনো মৃত্যু নেই।

>মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ৯৩ জনের মৃত্যুর তথ্য পর্যালোচনা করেছে। এই অভিজ্ঞতা চিকিৎসার উন্নতির কাজে লাগাতে হবে।

হাসপাতালে আসার পর কখন মৃত্যু হচ্ছে, তা দেখার চেষ্টা করা হয়েছে পর্যালোচনায়। দেখা গেছে, হাসপাতালের আসার এক থেকে দুই ঘণ্টার মধ্যে মারা গেছেন ১১ জন, প্রথম ২৪ ঘণ্টায় মারা গেছেন আরও ২২ জন। ভর্তি হওয়ার ৪৮ ঘণ্টা বা দুই দিন পর মারা গেছেন ১২ জন। বাকিরা মারা যান ৩ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে।

মারা যাওয়া রোগীদের ৭৫ শতাংশ ছিলেন পুরুষ, ২৫ শতাংশ নারী। এঁদের মধ্যে ব্যবসায়ী ছিলেন বেশি। চিকিৎসক, সাংবাদিক ও দিনমজুর ছিলেন দুজন করে।

মৃত ব্যক্তিদের বয়সের বিভাজনও করা হয়েছে। সবচেয়ে বেশি মারা গেছেন ৫১ থেকে ৬০ বছর বয়সীরা। এঁদের হার ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ। এরপর সবচেয়ে বেশি মৃত্যু ৬১-৭০ বছর বয়সীদের, হার ২৩ দশমিক ৬৬ শতাংশ। ১ জুলাই নিয়মিত সংবাদ বুলেটিনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক নাসিমা সুলতানা সারা দেশে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের বয়সের তথ্য তুলে ধরেন। তাতে দেখা যায়, মৃতদের ৪৩ শতাংশের বয়স ৬০ বছরের বেশি।

মৃত্যুর কারণ

অধ্যাপক টিটু মিয়া বলেন, ‘মারা যাওয়া রোগীদের বড় অংশটি হাসপাতালে এসেছিলেন অনেক বিলম্বে। এঁরা যখন হাসপাতালে এসেছিলেন, তখন অধিকাংশের অক্সিজেন পরিস্থিতি খারাপ ছিল।’

করোনা চিকিৎসায় অক্সিজেনের ভূমিকা অনেক বড়। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা বলেছেন, রক্তে দ্রবীভূত অক্সিজেন থাকতে হবে ৯৪ শতাংশের বেশি। রক্তে অক্সিজেন কমে গেলে একাধিক অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দ্রুত অকেজো হয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। রক্তে অক্সিজেন কমে গেলে অনেকে বুঝতে পারেন না, স্বাভাবিক চলাফেরা করতে থাকেন (একে বলে হ্যাপি হাইপোক্সিয়া)। অনেকে তাই বিলম্ব করে হাসপাতালে আসেন।

৯৩ জনের তথ্যে দেখা যায়, ১৫ জনের অক্সিজেন ছিল ৬০ শতাংশের নিচে। অক্সিজেনের পরিমাণ ৬১ থেকে ৭২ শতাংশের মধ্যে ছিল ১৫ জনের। অক্সিজেন ৭৩-৮৪ শতাংশের মধ্যে ছিল ৩১ জনের। ৮৫ থেকে ৯৫ শতাংশের মধ্যে ছিল ৩০ জনের। অক্সিজেনের কোনো সমস্যাই ছিল না দুজনের। রক্তে দ্রবীভূত অক্সিজেন কম থাকা মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ বলে মনে করছেন চিকিৎসকেরা।

হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার সময় ৯৩ জনেরই করোনার উপসর্গ ছিল। ৬০ শতাংশের জ্বর ছিল, ৭১ শতাংশের শ্বাসকষ্ট ছিল, ৩৭ শতাংশের কাশি ছিল। অর্থাৎ কারও কারও একাধিক উপসর্গ ছিল, কারও তিনটি উপসর্গই ছিল।

মৃত ব্যক্তিদের ৫২ শতাংশের ছিল উচ্চ রক্তচাপ এবং অর্ধেকের ছিল ডায়াবেটিস। করোনায় আক্রান্ত হওয়ার আগেও কেউ কেউ অন্য রোগে আক্রান্ত ছিলেন। সেসব কাগজপত্র রোগীরা হাসপাতালে এনেছিলেন। এঁদের মধ্যে ২৯ জন দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগে ভুগছিলেন, ১০ জনের ছিল হৃদ্‌রোগ, অ্যাজমা ছিল ৭ জনের, ক্যানসারে ভুগছিলেন ৬ জন, শ্বাসতন্ত্রের জটিলতা ছিল ৩ জনের, ১ জনের ছিল যকৃতের রোগ।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বা খ্যাতনামা চিকিৎসা সাময়িকীতে বর্তমান সময়ে যেসব নিবন্ধ প্রকাশিত হচ্ছে, তাতেও দেখা যাচ্ছে অন্য রোগ থাকা ব্যক্তিরা (কোমরবিড) করোনায় আক্রান্ত হলে তাঁদের মৃত্যুঝুঁকি বেশি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও চীনের যৌথ মিশন ১৬ থেকে ২৪ ফেব্রুয়ারি চীনার উহানসহ বিভিন্ন শহরের হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া ৫৫ হাজার ৯২৪ জন রোগীর তথ্য বিশ্লেষণ করেছিল। এর মধ্যে ২ হাজার ১১৮ রোগী মারা যান। মিশন প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, ক্যানসার, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের জটিলতা ও ক্যানসারে আক্রান্তদের মৃত্যুঝুঁকি বেশি। 

বিশেষ পর্যবেক্ষণ

এই হাসপাতালে উচ্চ প্রবাহে অক্সিজেন দেওয়ার জন্য ৪টি হাই ফ্লো নাসাল ক্যানুলা আছে। আর সচল ভেন্টিলেটর আছে ১০টি।

মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসকেরা ৯৩ জন রোগীর ক্ষেত্রে দুটি বিশেষ পর্যবেক্ষণের কথা বলেছেন। ৩৩ জন রোগীকে একটি পর্যায়ে আইসিইউ সেবা দেওয়া হয়। এঁদের মধ্যে ২২ জনকে ভেন্টিলেটরে নেওয়া হয়। কিন্তু একজনকেও বাঁচানো যায়নি। অধ্যাপক টিটু মিয়া বলেন, ‘ভেন্টিলেটরে নেওয়ার এক-দুই ঘণ্টার মধ্যেই রোগী মারা যেতে দেখা গেছে। ভেন্টিলেটরের চেয়ে হাই ফ্লো অক্সিজেন আমাদের বেশি দরকার।’

একটি সূত্র বলছে, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেরও অভিজ্ঞতা মোটামুটি একই। তবে এখানে ভেন্টিলেটরে রেখে কয়েকজনকে বাঁচানো সম্ভব হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন অধ্যাপক বলেছেন, ‘ভেন্টিলেটরকে অপ্রয়োজনীয় ভাববার কারণ নেই। এর যৌক্তিক ব্যবহার হতে হবে। একজনের জীবন ফিরিয়ে দেওয়া অনেক বড় ব্যাপার।’

সামনের পথ

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও চীনের যৌথ মিশন তাদের সুপারিশে বলেছিল, পরিস্থিতির উন্নতি করতে হলে রোগী ব্যবস্থাপনা, রোগের পরিস্থিতি, কী কারণে রোগ মারাত্মক হচ্ছে—এসব তথ্য অব্যাহতভাবে আদান-প্রদান করতে হবে। কী কী বিষয় যুক্ত হলে রোগ মারাত্মক আকার ধারণ করে, তা নিয়মিত বিশ্লেষণ ও মূল্যায়ন করতে হবে।

মুগদা মেডিকেলে মৃত্যুর পর্যালোচনা বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন অনুষদের সাবেক ডিন অধ্যাপক এ বি এম আবদুল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ কাজ হয়েছে। আরও একাধিক হাসপাতালে এই ধরনের পর্যালোচনা হওয়া দরকার। এ থেকে শিক্ষা নিলে মৃত্যু কমানো সম্ভব হবে। তিনি বলেন, অন্য রোগ থাকা মানুষ করোনায় আক্রান্ত হলেই বিশেষ সতর্ক হতে হবে। দ্বিতীয়ত অক্সিজেন পরিস্থিতি সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করতে হবে। অক্সিজেন মাপার যন্ত্র সবার নেই, সবার পক্ষে কেনা সম্ভব নয়। এ বিষয়ে বিকল্প ভাবতে হবে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0