default-image

এক যুগের বেশি সময় আগে সিলেটে তৎকালীন ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর ওপর গ্রেনেড হামলা ও তিনজনকে হত্যার দায়ে হরকাতুল জিহাদ (হুজি) নেতা মুফতি আবদুল হান্নানসহ তিন জঙ্গিকে ফাঁসিকাষ্ঠে যেতে হচ্ছে। তিনজনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে সর্বোচ্চ আদালতের দেওয়া রায় পুনর্বিবেচনা (রিভিউ) চেয়ে দণ্ডিত ব্যক্তিদের করা আবেদন খারিজ করে দিয়েছেন আপিল বিভাগ।
গতকাল রোববার প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আপিল বিভাগ এ আদেশ দেন। এর মধ্য দিয়ে আইনি লড়াইয়ের পরিসমাপ্তি হলো। মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত অপর দুজন হলেন শরীফ শাহেদুল আলম ওরফে বিপুল ও দেলোয়ার ওরফে রিপন। হান্নান কাশিমপুর কারাগারে আছেন।
এর ফলে এই তিন জঙ্গির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরে আইনগত কোনো বাধা নেই বলে জানিয়েছেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। আইনজীবীরা বলেছেন, নিয়ম অনুসারে আসামিরা রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চাওয়ার সুযোগ পাবেন। যদি আসামিরা প্রাণভিক্ষার আবেদন না করেন বা আবেদন করার পর তা নাকচ হলে কারাবিধি অনুযায়ী আসামিদের দণ্ড কার্যকর করা হবে।
মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে হাইকোর্টের দেওয়া রায়ের পর দণ্ডিত ব্যক্তিরা আপিল বিভাগে আবেদন করেন, যা গত বছরের ৭ ডিসেম্বর খারিজ হয়। এই রায় পুনর্বিবেচনা চেয়ে তিন জঙ্গি আপিল বিভাগে গত ফেব্রুয়ারিতে পৃথক দুটি পুনর্বিবেচনার আবেদন করেন, যা গতকাল শুনানির জন্য ওঠে। আদালতে আসামিপক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী নিখিল কুমার সাহা। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। শুনানি শেষে আদালত পুনর্বিবেচনার আবেদন খারিজ করেন। আদালত বলেছেন, আবেদনকারীপক্ষ রায়ের কোনো ত্রুটি দেখাতে পারেনি। ১০ বছর ধরে আসামিরা কনডেম সেলে আছেন, এটি সাজা কমানোর জন্য যুক্তি হতে পারে না। রিভিউ আবেদন খারিজ করা হলো।
পরে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, আপিল নিষ্পত্তি হওয়ার পরই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার প্রক্রিয়া শুরু হয়। তবে রিভিউ আবেদন করায় তা স্থগিত ছিল। রিভিউ আবেদন খারিজ হওয়ায় এখন কারা কর্তৃপক্ষের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে আইনগত কোনো বাধা নেই। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এখন রায়ের বিষয়টি আসামিদের অবহিত করা হবে। রায় অবগত করার পর কারা কর্তৃপক্ষ তাঁদের জিজ্ঞেস করবে, রাষ্ট্রপতির কাছে আসামিরা প্রাণভিক্ষা চাইবেন কি না। যদি প্রাণভিক্ষা চান, সে দরখাস্ত রাষ্ট্রপতির কাছে যাবে। যদি না চান, তাহলে কারা কর্তৃপক্ষ পরবর্তী প্রক্রিয়ায় এগিয়ে যাবে। তবে কারাবিধি অনুযায়ী ৭ দিনের আগে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা যাবে না এবং ২১ দিনের মধ্যে কার্যকর করতে হবে। কাজেই কারাবিধি মেনে সব আইনি প্রক্রিয়ার পর তাঁদের ব্যাপারে কারা কর্তৃপক্ষ ও রাষ্ট্র সিদ্ধান্ত নেবে। যদি প্রাণভিক্ষা না চান, তাহলে দুই-এক দিনের মধ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হতে পারে। কেননা, প্রক্রিয়া আগে থেকে শুরু হয়েছিল।
মুফতি হান্নানসহ আসামিপক্ষের কৌঁসুলি নিখিল কুমার সাহা প্রথম আলোকে বলেন, রাষ্ট্রপতির কাছে তাঁরা ক্ষমা চাইবেন কি না, এ বিষয়ে তাঁরাই সিদ্ধান্ত নেবেন।
২০০৪ সালের ২১ মে সিলেটে হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজারের ফটকের কাছে গ্রেনেড হামলায় ঢাকায় নিযুক্ত তৎকালীন ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীসহ ৭০ জন আহত হন, নিহত হন পুলিশের দুই কর্মকর্তাসহ তিনজন। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত আনোয়ার চৌধুরীর পৈতৃক বাড়ি সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার প্রভাকরপুর গ্রামে।
ওই ঘটনায় করা মামলায় ২০০৮ সালের ২৩ ডিসেম্বর সিলেটের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল জঙ্গিনেতা মুফতি হান্নান, জঙ্গি শরিফ শাহেদুল ও দেলোয়ারকে মৃত্যুদণ্ড এবং মহিবুল্লাহ ওরফে মফিজুর রহমান ও আবু জান্দালকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ দেন। গত বছরের ১১ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্ট রায়ে তিনজনের মৃত্যুদণ্ড ও দুজনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল রাখেন। এই রায়ের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকা আসামিদের করা আপিল ৭ ডিসেম্বর খারিজ হয়। আপিল না করায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত দুজনের দণ্ড বহাল থাকে।
আপিল খারিজ করে সর্বোচ্চ আদালতের পূর্ণাঙ্গ রায় গত ১৭ জানুয়ারি প্রকাশ পায়। আদালত সূত্র বলেছে, রায় প্রকাশের পর তা বিচারিক আদালতে পৌঁছায়। আদালত মৃত্যুপরোয়ানা জারি করে তা কারাগারে পাঠান। কারাগারে মৃত্যুপরোয়ানা আসামিদের পড়ে শোনানো হয়। এরপর তাঁরা রিভিউ আবেদন করেন।
২০০৪ সালের ২১ আগস্ট রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে গ্রেনেড হামলা, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টাসহ ১৩টি নাশকতামূলক ঘটনায় শতাধিক ব্যক্তিকে হত্যার পেছনের মূল হোতা হিসেবে মুফতি হান্নানের নাম উঠে আসে। মুফতি হান্নানের বাড়ি গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায়। ২০০০ সালের ২০ জুলাই কোটালীপাড়ায় শেখ হাসিনার সভামঞ্চের কাছে ৭৬ কেজি ওজনের বোমা পুঁতে রাখার ঘটনায় করা মামলারও আসামি মুফতি হান্নান।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন