বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

চট্টগ্রাম নগরে উন্মুক্ত নালা-খালে পড়ে তিন মাসে চারজনের মৃত্যু হয়েছে। এ দায় কার?

মুহাম্মদ রাশিদুল হাসান: অন্যান্য যেকোনো শহরের তুলনায় চট্টগ্রাম শহরের নালার প্রশস্ততা ও গভীরতা ভিন্ন। কেননা এই শহরটি গড়ে উঠেছে পাহাড়-নদী ও সমুদ্রের সম্মিলনে। ফলে প্রশস্ততা ও গভীরতা অনেক বেশি। এখানে নালা ও ফুটপাত পাশাপাশি থাকে। তাই যখন নালা ও ফুটপাতগুলোর নকশা করা হয়েছিল, তখনই জননিরাপত্তার বিষয়টি মাথায় রাখা উচিত ছিল। যদি ওই সময়েই নিরাপত্তাবেষ্টনী দেওয়া হতো, তাহলে আজ এভাবে দুর্ঘটনা ঘটত না। তাই এই ঘটনার দায়-দায়িত্ব অবশ্যই নালা নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানের। সেটি সিডিএ, সিটি করপোরেশন কিংবা ওয়াসা হোক। আর গাফিলতির কথা যদি বলি, তাহলে এর দায় অবশ্যই সিটি করপোরেশন ও সিডিএর।

উন্নয়নকাজে নিরাপত্তা ও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা। কিন্তু এসব ব্যবস্থা নিচ্ছে না ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো। তদারকি কীভাবে করতে হবে?

মুহাম্মদ রাশিদুল হাসান: যেকোনো নির্মাণকাজের ক্ষেত্রে মানুষের নিরাপত্তার বিষয়টি প্রাধান্য পায়। তা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে করা চুক্তিতে বিস্তারিত থাকে। আবার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নির্মাণকাজ চলাকালে তা ঠিকমতো পালন করছে কি না, তা তদারকির দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের। কিন্তু এখানে প্রতিষ্ঠানগুলো সে তদারকি ঠিকভাবে করে না। ফলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানও এর সুযোগ নেয়। তবে শুধু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ওপর দায় চাপালে হবে না। তাদের যে রকম নকশা দেওয়া হয়, তারা সেভাবে কাজ করে। আবার নগরের অনেক জায়গায় নালা নির্মাণের কাজ শেষ হয়েছে, যেখানে কোনো নিরাপত্তাবেষ্টনী নেই। তাহলে এগুলো নিরাপদ করার দায়িত্ব নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানকে নিতে হবে।

নির্মাণকাজ চলাকালে নিরাপত্তার ঘাটতি থাকলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা নিতে পারে সংশ্লিষ্ট সংস্থা?

মুহাম্মদ রাশিদুল হাসান: ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত না করলে অবশ্যই জরিমানা করার ক্ষমতা আছে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের। এমনকি কাজও বাতিল করতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানেরই তদারকির অভাব রয়েছে। নির্মাণকাজ চলাকালে এই বিষয়ে যথাযথভাবে তদারকি করতে হবে। তা ছাড়া অনিয়ম দেখলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত ছিল, যা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য উদাহরণ হিসেবে থেকে যেত। তখন ভবিষ্যতে সংশ্লিষ্ট সবাই জবাবদিহির মুখোমুখি হতো।

নালা-খালে পড়ে মানুষ মৃত্যুর ঘটনায় সিটি করপোরেশন-সিডিএ পাল্টাপাল্টি দোষারোপ করছে। কীভাবে দেখছেন বিষয়টি?

মুহাম্মদ রাশিদুল হাসান: যেসব বড় শহরে উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও সিটি করপোরেশন আছে, সেখানে এই সংস্কৃতি আছে। আমরা সব সময় দেখে আসছি, নগর ব্যবস্থাপনায় দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা থাকে দুই প্রতিষ্ঠানের। যখনই দুর্ঘটনা ঘটে, সেটি অগ্নিকাণ্ড, সড়ক দুর্ঘটনা কিংবা নালা-খালে পড়ে মানুষের মৃত্যুর ঘটনা হোক—এমন ঘটনা ঘটলেই সিটি করপোরেশন ও সিডিএ দায়-দায়িত্ব বারবার একে অপরের দিকে ঠেলে দিতে চায়। এটি খুবই দুঃখজনক। এ জন্য আমরা বলছি, একটি বড় শহরে যেসব সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে, তাদের মধ্যে অবশ্যই সমন্বয় ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। এই শহরে কার কী কাজের দায়িত্ব এবং সে দায়িত্ব নিয়ে কোনো আইনগত ধোঁয়াশা যদি না থাকত, তবে আজ সুস্পষ্টভাবে বলা যেত এসব ঘটনার জন্য দায়ী কে। কিন্তু আইনে ফাঁকফোকর আছে, ধোঁয়াশা আছে। সেটিই দুই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দায় এড়ানোর মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। তাই আইনগুলোকে সুনির্দিষ্ট করতে হবে। কার কী দায়িত্ব থাকবে, তা সুনিশ্চিত করতে হবে। এ ব্যাপারে সরকারকে ভূমিকা রাখতে হবে।

এসব মৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত করে না সিটি করপোরেশন-সিডিএ। সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোও কোনো পদক্ষেপ নেয় না কেন?

মুহাম্মদ রাশিদুল হাসান: এদিকে না যাওয়ার পেছনে কারণ আছে। কেননা যে প্রতিষ্ঠান তদন্ত কমিটি গঠন করবে, তখন মনে হবে দায়-দায়িত্ব তার। তাই জেলা প্রশাসকের তত্ত্বাবধানে নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করা যেতে পারে। অথবা বিচারপতির নেতৃত্বে এই দুর্ঘটনার দায়-দায়িত্ব কার, সে বিষয়ে তদন্তে কমিটি গঠন করা যায়। এতে আমরা একটি নিরপেক্ষ প্রতিবেদন আশা করতে পারি। আর একটি বিষয়, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য ক্ষতিপূরণের একটা ব্যবস্থা করা দরকার। যদিও মৃত্যুর ক্ষতিপূরণ অর্থ দিয়ে মূল্যায়ন করা যাবে না।

আগের ঘটনাগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হলে বিশ্ববিদ্যালয়ছাত্রীর মৃত্যু কি এড়ানো যেত?

মুহাম্মদ রাশিদুল হাসান: যদি ছোট ছোট দুর্ঘটনার পর সেবা সংস্থা সিটি করপোরেশন, সিডিএ ও ওয়াসার কাজের বিষয়ে জবাবদিহি ও সুশাসন নিশ্চিত করা যেত, তাহলে এসব মৃত্যুর ঘটনা ঘটত না। আজকে হয়তো একজন করে মানুষ মারা যাচ্ছেন বা আহত হচ্ছেন। সামনে এমনও দিন আসতে পারে, এর চেয়েও বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। এই একেকটি ঘটনা আগামী দিনে বড় ধরনের দুর্ঘটনার সংকেত দিচ্ছে। তাই নগরবাসীকে রক্ষায় এখনই উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে হবে।

এই ধরনের দুর্ঘটনা বারবার ঘটা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য কী করতে হবে?

মুহাম্মদ রাশিদুল হাসান: একটি বিষয় হচ্ছে, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীনে সিটি করপোরেশন ও ওয়াসা। আর গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীনে হচ্ছে সিডিএ। তাই এ ক্ষেত্রে সরকারের আন্তমন্ত্রণালয়ের সভার মাধ্যমে সুস্পষ্ট করতে হবে, নগরের খাল, নালা-নর্দমার ব্যবস্থাপনা কার হাতে থাকবে। এটি যদি করা হয় তাহলে দুর্ঘটনার দায়-দায়িত্ব কার তা স্পষ্ট করা যাবে এবং জবাবদিহির আওতায় আনা যাবে।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন