default-image

গত বছরের ২ আগস্ট প্রথম আলো অনলাইনে ইনফির স্বামী মারা যাওয়ার পর ‘আইসিইউতে কথা বলার আকুতি, লিখতেও পারলেন না’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।

৩৪ বছর বয়সী ইনফির একমাত্র ছেলের বয়স এখন ১০ বছর। মেয়ের বয়স ২ মাস ২০ দিন। ইনফি বললেন, ‘স্বামী মারা যাওয়ার মাত্র এক মাস আগে অনাগত সন্তানের খবরটি চিকিৎসকের কাছ থেকে নিশ্চিত হয়েছিলাম। তাই ওকে নিয়ে খুব বেশি পরিকল্পনার সময় পাইনি। তবে স্বামী সব সময় চাইতেন আমাদের সন্তানটি যাতে মেয়ে হয়। স্বামীর ইচ্ছা অনুযায়ী আল্লাহ আমাদের মেয়ে দিয়েছেন। সবাই বলছেন, মেয়ে একদম তার বাবার চেহারা পেয়েছে।’

default-image

ছেলেমেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে তেমন কিছু বলে যেতে পারেননি শেখ সালাউদ্দিন। তবে নিজে চিকিৎসক হতে চেয়েছিলেন, হতে পারেননি বলে সব সময় চাইতেন ছেলে বা মেয়ে যদি হয়, একজনকে চিকিৎসক বানাবেন। ইনফি বললেন, স্বামীর এই ইচ্ছাটা পূরণের চেষ্টা করবেন।

রাজধানীর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে (আইসিইউ) মারা যান বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার বাসিন্দা সালাউদ্দিন। মারা যাওয়ার আগে ইশারায় স্বামী ইনফিকে কিছু বলতে চেয়েছিলেন, কিন্তু কথা বলতে পারতেন না। তাই কাগজে লিখে কিছু বলতে চান কি না, জানতে চাইলে ইশারায় হ্যাঁ বলেছিলেন। কাগজ-কলম দিলে কিছু লেখার চেষ্টাও করেছিলেন, হাত কাঁপার জন্য লেখা স্পষ্ট হয়নি। স্বামী মারা যাওয়ার পর ইনফি সেই লেখাই ফেসবুকের কভার ফটো করেছিলেন, এখন প্রোফাইল ছবিতে ঝুলছে সেই লেখা।

ইনফিকে এখনো পোড়াচ্ছে তাঁর স্বামীর দেরিতে করোনা শনাক্ত হওয়ার বিষয়টি। তিনি জানান, তাঁর স্বামীর ১০৫ ডিগ্রি জ্বরের পর এক চিকিৎসকের কাছে নেওয়া হলে তিনি ডেঙ্গুসহ নানা টেস্ট দেন। কিন্তু করোনার টেস্ট দেননি। পরে শ্বাসকষ্টসহ অবস্থা খারাপ হলে স্বামীকে নিয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে দৌড়ান। চিকিৎসকের কাছে গিয়েও রোগ ধরা না পড়ার বিষয়টি এখনো ভুলতে পারেননি তিনি।

default-image

শেখ সালাউদ্দিনের যখন খুব খারাপ অবস্থা হতো, তখন আইসিইউতেই পিপিই পরে বা অন্য পোশাকে প্রার্থনায় বসতেন ইনফি ইয়াসমিন। ইনফির বোনের স্বামী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের তখনকার প্রকৌশলী (নেটওয়ার্ক মেইনটেন্যান্স) মো. সাইফ উদ্দিন সরকারের এক সহকর্মী মোজাম্মেল হোসেন পিপিই পরে আল্লাহর দরবারে ইনফির সেজদা করার ছবিটি তুলেছিলেন। সেজদার আরেকটি ছবি তুলেছিলেন সাইফ উদ্দিন। তখন ফেসবুকে এ ছবি আলোচনায় এসেছিল।

ইনফি ইয়াসমিনের বিয়ে হয় ২০০৬ সালে। বিয়ের পর স্নাতক পড়া অবস্থায় সরকারি চাকরি করতেন তিনি। গাজীপুরে যাতায়াতের কষ্টের কথা চিন্তা করে স্বামী সেই চাকরি আর করতে দেননি। তারপর ছেলের জন্মের পর পড়াশোনাও শেষ করা হয়নি। তবে অনলাইনে বিভিন্ন ব্যবসায় উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

ইনফি জানালেন, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় শাশুড়ি, ভাশুরসহ সবাই একসঙ্গে থাকেন। শেখ সালাউদ্দিন তাঁর বড় বোন কানিজ ফাতিমা এবং তাঁর স্বামী মো. আনোয়ার হোসেনের বায়িং হাউসের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে ইনফি বললেন, ‘আমার ননদ ও তাঁর স্বামী এখনো আমার স্বামী যে বেতন পেতেন, তা প্রতি মাসে আমাকে দিয়ে যাচ্ছেন। ননদ চাচ্ছেন আমার স্বামী যে দায়িত্ব পালন করতেন, আমিও একটু স্থির হয়ে যেন সেই দায়িত্ব পালন করি। আমি তাঁর কাছেই বায়িং হাউসের বিভিন্ন কাজ শিখছি।’

আর্থিক সমস্যা নেই জানিয়ে ইনফি বললেন, ‘স্বামীর অসুস্থতার সময়ের সব খরচ, অস্ত্রোপচারে মেয়ের জন্মের খরচসহ সব খরচ সামলাচ্ছেন ননদ ও তাঁর স্বামী। এই ননদ আমার কাছে মায়ের মতো। তিনিও আমাকে মেয়ের মতোই দেখেন। শাশুড়িসহ অন্য সদস্যরাও সব সময় আমার পাশে আছেন। তাই স্বামী মারা যাওয়ার পর অকূলপাথারে ভেসে যেতে হয়নি। আর্থিক দিক নিয়েও চিন্তা করতে হয়নি।’

ইনফি জানালেন, যৌথ পরিবারে থাকার ফলে সন্তান সামলানোর ক্ষেত্রে অন্যদের কাছ থেকে সাহায্য পাচ্ছেন। এক ভাশুরের স্ত্রী ছেলেকে স্কুলে দিয়ে আসেন। ননদের বাসা কাছে হওয়ায় মন খারাপ হলেই চলে যান তাঁর বাসায়। সবকিছুর জন্য তিনি কৃতজ্ঞতা জানালেন শ্বশুরবাড়ির সদস্যদের প্রতি।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন