বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

মৃত্যুর তথ্যে গরমিল

সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচিতে প্রতি তিন মাস পর রোগীর তথ্য সংগ্রহ ও পর্যালোচনা করা হয়। বছরে চারবার পর্যালোচনার পর বার্ষিক প্রতিবেদন চূড়ান্ত করা হয়। সেই প্রতিবেদন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ বিভিন্ন দাতা সংস্থাকে পাঠানো হয়।

মাঠপর্যায় থেকে এপ্রিল, মে ও জুনে বরিশাল, চট্টগ্রাম, ঢাকা, খুলনা, রাজশাহী, সিলেট—এই ছয় বিভাগে ২৬ জনের মৃত্যুর তথ্য পাঠানো হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে ১৩ জন পুরুষ ও ১৩ জন নারী।

জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির কাছে এই সংখ্যা বেশি মনে হওয়ায় তারা বিষয়টি খতিয়ে দেখার উদ্যোগ নেয়। কর্মসূচির নজরদারি ও মূল্যায়ন বিভাগ প্রত্যেক মৃত ব্যক্তির তথ্য জানার চেষ্টা করে।

নরসিংদীর একজন মৃতের কাগজে মৃত্যুর তারিখ লেখা ছিল ২৭ জুন। নজরদারি ও মূল্যায়ন বিভাগের কাছে মৃত ব্যক্তির ছেলে ও স্ত্রী বলেছেন, মৃত্যু হয়েছিল ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে। একই জেলায় ২৫ জুন মারা যাওয়া ব্যক্তির পরিবারের সমস্যদের কাছে খোঁজ নিয়ে কর্মকর্তারা জানতে পারেন, তাঁর মৃত্যু হয়েছিল গত বছরের সেপ্টেম্বরের ২৮ তারিখের আগে। এ রকম উদাহরণ আরও আছে। সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনায় নজরদারি ও মূল্যায়ন বিভাগের কর্মকর্তারা বলেছেন, রোগীর তথ্য ঠিকভাবে রাখা হচ্ছে না।

জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এনজিওর মাঠকর্মীরা সন্দেহভাজন ব্যক্তির থুথু সংগ্রহ করেন এবং ল্যাবরেটরিতে তা পরীক্ষা করেন। বছরে ২০-২৫ লাখের বেশি নমুনা পরীক্ষা করা হয়। তাঁদের মধ্যে দুই থেকে আড়াই লাখ ব্যক্তির যক্ষ্মা শনাক্ত হয়। শনাক্ত হওয়া ব্যক্তির বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করেন মাঠকর্মীরা। শনাক্ত হওয়া ব্যক্তিকে যক্ষ্মার ওষুধ দেওয়া এবং রোগী ঠিকমতো ওষুধ সেবন করছেন কি না, তা তদারক করেন মাঠকর্মী।

সমস্যাটি পুরোনো

লক্ষ্মীপুরের কমলনগর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা আবু তাহের প্রথম আলোকে বলেন, এ বছরের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে কিছু নমুনা পরীক্ষার ফলাফলে অস্বাভাবিকতা চোখে পড়ে। সরকারি ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষার ফলাফলের চেয়ে এনজিওগুলোর ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষার ফলাফলে বেশি রোগী শনাক্ত হতে দেখা যায়। তখন বিষয়টি সিভিল সার্জন ও বিভাগীয় পরিচালককে জানানো হয়। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সংশ্লিষ্ট এনজিওর সঙ্গে কথা বলেন।

এই সমস্যা আগেও দেখা গেছে। ২০১৫ সালে শুরুর দিকে দ্য ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব টিউবারকিউলোসিস অ্যান্ড লাং ডিজিজে প্রকাশিত এক প্রবন্ধে রোগী সম্পর্কে মিথ্যা তথ্য দেওয়ার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছিল। গবেষকেরা ওষুধ প্রতিরোধী যক্ষ্মার রোগী নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে ১ হাজার ৪৮০ জন রোগীকে তালিকাভুক্ত করেন। তাঁদের মধ্যে ১২ জন রোগীর তথ্য ছিল মিথ্যা বা প্রতারণামূলক।

তখন গবেষকেরা জিন বিশ্লেষণ থেকে দেখতে পেয়েছিলেন, একই ব্যক্তির থেকে সংগ্রহ করা নমুনা একাধিক ব্যক্তির নমুনা হিসেবে ল্যাবরেটরিতে ব্যবহার করা হয়েছে। গবেষণা প্রবন্ধে বলা হয়েছিল, এই চর্চা জাতীয় কর্মসূচিকে দুর্নীতিগ্রস্ত করে ফেলতে পারে।

শনাক্তের বাধ্যবাধকতা

সংশ্লিষ্ট দুজন বিশেষজ্ঞ প্রথম আলোকে বলেন, বেশি সংখ্যায় রোগী দেখানোর সমস্যাটি পুরোনো। জাতীয় কর্মসূচির কৌশলপত্রে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের মধ্যে যক্ষ্মায় মৃত্যু ৭৫ শতাংশ (২০১৫ সালের তুলনায়) কমাতে হবে, একই সময়ে যক্ষ্মা সংক্রমণ ৫০ শতাংশ কমাতে হবে। সংখ্যাভিত্তিক লক্ষ্যপূরণের চাপটি মাঠকর্মীদের ওপর গিয়ে পড়ে।

এনজিওগুলো মাঠকর্মীদের জন্যও লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করে দিয়েছে। কর্ম এলাকায় প্রতি মাসে নতুন রোগী শনাক্ত করার বাধ্যবাধকতা থাকে। সেই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে গিয়ে অনেকে রোগীর সংখ্যা বাড়ানোর চেষ্টা করেন বলে একাধিক সরকারি কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেছেন।

ব্র্যাকের স্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান আকরামুল ইসলাম বলেন, মাঠকর্মীকে একটি এলাকার দায়িত্ব দেওয়া হয়, কিন্তু তাঁকে নির্দিষ্টসংখ্যক রোগী শনাক্তের কোনো লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয় না। তিনি বলেন, ‘ল্যাবরেটরিতে নমুনা পরীক্ষার ফলাফলে তারতম্য হওয়ার সুযোগ আছে। কারণ, কোনো প্রযুক্তি বা যন্ত্র শতভাগ ঠিক ফলাফল দেয় না।’

ঝুঁকি ও করণীয়

বিশিষ্ট বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আলী হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, যক্ষ্মা রোগীর তথ্য যথাযথ থাকা দরকার। যক্ষ্মায় আক্রান্ত হননি এমন মানুষকে তালিকাভুক্ত করে ওষুধ খাওয়ালে তা বিপজ্জনক। সুতরাং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের উচিত দ্রুত এই ধরনের কর্মকাণ্ড বন্ধের উদ্যোগ নেওয়া।

জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির তদারকি ও মূল্যায়ন বিভাগ তাদের সুপারিশে বলেছে, রোগ শনাক্তকরণ ব্যবস্থার উন্নতি করতে হবে এবং রোগীর বিস্তারিত তথ্যসহ জাতীয় কর্মসূচির তথ্য-উপাত্তের মান বাড়তে হবে।

জানতে চাইলে কর্মসূচির বিষয়ভিত্তিক পরিচালক অধ্যাপক মো. শামিউল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘যখনই আমরা তথ্য-উপাত্তে গরমিল বা অসামঞ্জস্য দেখতে পাই, তখনই তার কারণ অনুসন্ধান করি এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেই। আমরা প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের ব্যাপারেও জোর দিয়েছি।’

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন