বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

ষাটের দশকের উত্তাল ও অবিশ্বাস্য দিনগুলোতে এক বিরাট পরিবর্তনের সম্ভাবনায় যখন কাঁপছিল সারা দেশ, সে সময় ছাত্র আন্দোলনের পাশাপাশি কবিতা, আবৃত্তি, সংগীত, নাচ, নাটক, চিত্রকলা ও অন্যান্য বিষয়ে ধারাবাহিকভাবে বড় ভূমিকা পালন করেছিল বামপন্থী রাজনৈতিক শক্তি, বিশেষত তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃতি সংসদ। সে সময়ের সেরা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলো যেমন তারা করেছে, সেই সঙ্গে প্রকাশ করেছে একুশের সংকলনও। সেগুলো আজ সাক্ষী একটি প্রজন্মের শ্রেষ্ঠ মানুষগুলোর যাত্রা ও উত্থানের; তাদের সমস্ত স্বপ্ন, আকাঙ্ক্ষা এবং আন্দোলন–বিদ্রোহের।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে সেসব সংকলন একত্র করে এক মলাটে প্রকাশ করেছে প্রথমা প্রকাশন। মতিউর রহমান সম্পাদিত বইটির নাম বিদ্রোহী বর্ণমালা। এ বই ইতিহাসের এক মূল্যবান দলিল।

সে সময় এগিয়ে এসেছিলেন দেশের সব মত–পথের খ্যাতিমান ও প্রতিশ্রুতিশীল কবি-লেখক–শিল্পীরা। নামে–বেনামে তাঁরা লিখে গেছেন শ্রেষ্ঠ সব লেখা; চিত্রশিল্পীরা এঁকেছেন ছবি।

কবি ও লেখকদের মধ্যে ছিলেন জসীমউদ্‌দীন, সুফিয়া কামাল, রণেশ দাশগুপ্ত, শহীদুল্লা কায়সার, শামসুর রাহমান, জহির রায়হান, আনিসুজ্জামান, আলাউদ্দীন আল আজাদ, শহীদ সাবের, বদরুদ্দীন উমর, ফয়েজ আহমেদ, সৈয়দ শামসুল হক, আল মাহমুদ, রেজাউর রহমান, মালেকা বেগম, মাহমুদ আল জামান, মফিদুল হক প্রমুখ। ছবি এঁকেছেন জয়নুল আবেদিন, কামরুল হাসান, আমিনুল ইসলাম, মোহাম্মদ কিবরিয়া, কাইয়ুম চৌধুরী, দেবদাস চক্রবর্তী, রশীদ চৌধুরী, মুর্তজা বশীর, ইমদাদ হোসেন, আবদুল মুকতাদির, প্রাণেশ কুমার মণ্ডল, হাশেম খান, রফিকুন্নবী প্রমুখ। দেশের কোনো শ্রেষ্ঠ লেখক–কবি–শিল্পীর লেখা বা ছবি প্রকাশিত হয়নি সংকলনগুলোতে? তখনকার যে নবীন কবি ও লেখকেরা লিখেছিলেন, যাঁরা ছবি এঁকেছিলেন, তাঁদের অনেকেই এখন স্বনামে খ্যাত।

দুই

‘মনে পড়ে, ২০ ফেব্রুয়ারি দুপুর থেকে সারা দিন সারা রাত আমি প্রেসে ছিলাম। পুরো প্রেসের সব কর্মী এবং ৮-১০টা মেশিন সে রাতে শুধু আমাদের কাজ করেছিল।...সে এক বিশাল কর্মযজ্ঞ!’

১৯৭০ সালের একুশে ফেব্রুয়ারিসহ বিশেষ উপলক্ষগুলোতে চলেছে এই কর্মযজ্ঞ। পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংস্কৃতি সংসদের উদ্যোগে বের হচ্ছিল ছোট–বড় আকর্ষণীয় ও বিচিত্র সব সংকলন। একুশের প্রভাতে সেগুলো বিলি ও বিক্রি হতো শহীদ মিনার ও বাংলা একাডেমিতে। সংকলনগুলোর নামও ছিল আকর্ষণীয়। পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন বের করেছিল প্রতিধ্বনি (১৯৬৪), বিক্ষোভ (১৯৬৫), ঝড়ের খেয়া (১৯৬৬), সূর্য জ্বালা (১৯৬৭), অরণি (১৯৬৮) ও নিনাদ (১৯৬৯); এ ছাড়া ১৯৬৯ সালে একুশে ফেব্রুয়ারি অবলম্বনে শিল্পীদের আঁকা ড্রয়িং নিয়ে তারা প্রকাশ করেছিল একুশে স্মরণে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংস্কৃতি সংসদ প্রকাশ করেছিল দিনের রৌদ্রে আবৃত বেদনা (১৯৬৮) ও বজ্রে বাজে বাঁশী (১৯৬৯)। ’৭০ সালে সেরা কবিদের কবিতার পাশে একজন সেরা শিল্পীর আঁকা ড্রয়িং নিয়ে তারা প্রকাশ করে একুশে স্মরণে নামের আরেকটি সংকলন।

সে সময় সংকলনগুলোর পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন আসাদুজ্জামান নূর, আবুল হাসনাত, মফিদুল হক, মুনীরুজ্জামান, হিলালউদ্দিন, মাহ্‌ফুজ আনাম এবং মতিউর রহমান প্রমুখ। দিনরাত প্রাণান্ত পরিশ্রম করেছেন একেকজন। লেখা বা আঁকাতেই নয়, ধারাবাহিক বৈচিত্র্যের ছাপ ধরে রেখেছে সংকলনের ইনারে ব্যবহৃত নিউজপেপার, তুলট কাগজ, কার্ট্রিজ পেপার অথবা মোটা বোর্ড পেপার বা আর্ট কার্ডের প্রচ্ছদগুলো তথা সংকলনগুলোর অভিনব বাঁধাই। এই বৈচিত্র্য ও নিরীক্ষা তাদের নিবেদন সম্পর্কে কিছুটা ইশারাভাস দেবে। একটি দেশের তরুণ প্রজন্মের রুচি, চিন্তাভাবনা কীভাবে পরিবর্তিত হচ্ছিল, রাষ্ট্রের প্রতি তাদের মনোভাব কী ছিল, দেশের মানুষ সম্পর্কে তাদের ভাবনা—পাওয়া যাবে সবকিছুর আঁচ।

কত স্মৃতি একেকটি সংকলন প্রকাশের পেছনে! কতভাবে, কত জায়গা থেকে যে তাঁরা লেখা, ছবি ও অলংকরণ সংগ্রহ করেছেন! ঝঞ্ঝাময় আন্দোলনের সেই দিনগুলোতে লেখক–শিল্পীদের বাড়িতে বারবার গিয়ে লেখা বা ছবি সংগ্রহ করে নিয়ে আসা কি খুব সহজ কাজ ছিল? কত দিন যে কারফিউর ফাঁকে বাসায় বাসায় যেতে হয়েছে। একবার তো বেশ ভোরে মতিউর রহমান ও আসাদুজ্জামান নূর (অভিনেতা ও রাজনীতিবিদ, তখন সংস্কৃতি সংসদের সভাপতি) প্রচ্ছদের জন্য শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরীর বাসায় গিয়ে উঠেছিলেন।

তিন

প্রকাশিত সংকলনগুলোর প্রতিটির সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে যুক্ত ছিলেন বিদ্রোহী বর্ণমালার সম্পাদক মতিউর রহমান। ৫০টি বছর ধরে সংকলনগুলো সযত্নে গুছিয়ে রেখেছেন তিনি। সেই যে ১৯৬২ সালের এক সকালে প্রভাতফেরির মিছিলে হাঁটতে হাঁটতে আজিমপুর কবরস্থানের গেটের কাছাকাছি পৌঁছাতেই পলাশ ফোটার দিন নামের ছোট একটি সংকলন হাতে পেয়েছিলেন, সেখান থেকেই কি তাঁর ‘অন্তর্গত রক্তের ভিতরে’ প্রোথিত হয়েছিল সমস্ত আগ্রহ–উদ্দীপনা?

এত দিনে কিছু সংকলনের প্রচ্ছদ বা ভেতরের অলংকরণগুলো হয়তো কিছুটা মলিন হয়ে গিয়েছিল, কিছু পাতা হয়েছিল বিবর্ণ। এখনই বই হিসেবে প্রকাশের উদ্যোগ না নিলে ইতিহাসের অমূল্য সম্পদ এই সংকলনগুলোর সংরক্ষণ ঝুঁকির মধ্যে পড়ত। মতিউর রহমানকে ধন্যবাদ বাংলাদেশের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ও অত্যুজ্জ্বল সময়টিকে এত দিন সংরক্ষণ করার জন্য। বইয়ের শুরুতে তাঁর লেখা দীর্ঘ ভূমিকাটিও বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।

প্রথমা প্রকাশনের অতি যত্নে বইটি প্রকাশের উদ্যোগটিও অত্যন্ত ধন্যবাদার্হ। সেই সঙ্গে ৪৪০ পৃষ্ঠার একটি বইয়ের মুদ্রিত মূল্য মাত্র ৫০০ টাকা নির্ধারণের জন্য তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন