বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

তবে বাণিজ্যমন্ত্রীর এ বক্তব্যের বিষয়ে রোববার বিকেলেই মুঠোফোনে আইনমন্ত্রী আনিসুল হককে জানানোর পর পাল্টা প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘ডেসটিনি ও যুবকের গ্রাহকদের নিয়ে কোথায় কাজ করছে আইন মন্ত্রণালয়?’ বাণিজ্যমন্ত্রী এ কথা বলেছেন—এমন তথ্য জানালে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘আমি বাণিজ্যমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলব।’

রোববার অনুষ্ঠিত কর্মশালার বিষয় ছিল ‘প্রতিযোগিতা আইন বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাজারে সুষ্ঠু প্রতিযোগিতাপূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টিতে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের ভূমিকা’। এতে সভাপতিত্ব করেন কমিশনের চেয়ারপারসন মো. মফিজুল ইসলাম এবং বক্তব্য দেন সংস্থাটির তিন সদস্য জি এম সালেহ উদ্দিন, এ এফ এম মনজুর কাদির ও নাসরিন বেগম এবং আইনি পরামর্শক মাফরুহা মারফি।

এদিকে জানা গেছে, যুবকে প্রশাসক বসিয়ে ক্ষতিগ্রস্তদের পাওনা বুঝিয়ে দিতে সবশেষ গত বছরের ১৬ মার্চ অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল একটি নির্দেশনা দিয়েছিলেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এত দিন পড়ে থাকলেও বাণিজ্যমন্ত্রীর নির্দেশনা পেয়ে ডেসটিনি ও যুবকের ফাইল আবার সচল হয়েছে। বিষয়টি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বাণিজ্য সংগঠন অনুবিভাগের আওতাধীন। জানতে চাইলে বাণিজ্য সংগঠন পরিচালক (ডিটিও) সোলেমান খান প্রথম আলোকে বলেন, মন্ত্রীর কথার ওপরে তিনি কথা বলতে চাইছেন না।

যুবকের সম্পত্তি বেহাতও হয়েছে

যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তর (আরজেএসসি) ১৮৬০ সালের সোসাইটি রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্টের আওতায় ১৯৯৬ সালে নিবন্ধন নেয় যুবক। আর ২০০৬ সালে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তদন্ত করে এবং প্রতিবেদনে উঠে আসে যুবক অবৈধ ব্যাংকিংসহ নানা প্রতারণার সঙ্গে যুক্ত। ২০১০ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিনকে প্রধান করে কমিশন গঠন করে সরকার। এ কমিশনকে যুবক ৬৭৪ একর জমি থাকার হিসাব দেয়। এরপর ২০১১ সালে সাবেক যুগ্ম সচিব মো. রফিকুল ইসলামকে প্রধান করে গঠিত হয় দ্বিতীয় কমিশন। এ সময় যুবক ৫১৮ একর জমি থাকার হিসাব দেয়।

সবশেষ কমিশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুবকের ৩ লাখ ৩ হাজার ৭৩৯ ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকের দাবির পরিমাণ ২ হাজার ৫৮৮ কোটি ১১ লাখ টাকা। অথচ যুবকের সম্পত্তির বাজারমূল্য হবে ৩ হাজার কোটি টাকা। তবে এর অনেক সম্পত্তি বেদখলে চলে গেছে।

যুবকের ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহক ৩ লাখ ৩ হাজার ৭৩৯ জন। ডেসটিনির ক্রেতা, পরিবেশক ও বিনিয়োগকারীর সংখ্যা ৪৫ লাখ।

রাজধানীর পল্টনে ২১ শতাংশ, ধানমন্ডিতে ৩৩ দশমিক ৫ শতাংশ, তেজগাঁওয়ে ৪৯ শতাংশ, কাঁচপুরে ৮৭৮ শতাংশ, চট্টগ্রামের পতেঙ্গা বিমানবন্দরের পাশে ৪০ বিঘা, সাভার মডেল টাউনে প্লট এবং মাদারীপুর চক্ষু হাসপাতালের সামনে সম্পত্তি রয়েছে যুবকের। এ ছাড়া সারা দেশে রয়েছে যুবকের ১৮টি বাড়ি, ১৮টি প্রতিষ্ঠান এবং ৯১টি জায়গায় জমি।

বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থ মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে যুবকের গ্রাহকদের পক্ষে প্রায় ১০ বছর ধরে আবেদন করে যাচ্ছে ‘যুবকে ক্ষতিগ্রস্ত জনকল্যাণ সমিতি’। সমিতির সাধারণ সম্পাদক মাহমুদ হোসেন গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘বছর বছর ভোগান্তির শিকার হতে হতে গত বছর অর্থমন্ত্রী একটা নির্দেশনা দিলে আমরা আশায় বুক বাঁধি। কিন্তু কোভিড চলে আসায় তা আর এগোয়নি। বাণিজ্যমন্ত্রীর কথায় আবার আশ্বস্ত হচ্ছি। সরকার চাইলে এটা পারে। আইন না থাকলে সরকার আইন তৈরি করুক—এটা আমাদের দাবি।’

ডেসটিনির ভালো সম্পদ রয়েছে

বহুস্তর বিপণন (এমএলএম) পদ্ধতির ব্যবসায়ের মাধ্যমে ২০০০ সালে যাত্রা শুরু ডেসটিনি ২০১২ সাল পর্যন্ত ৪ হাজার ১১৮ কোটি টাকা তুলে নেয়। ডেসটিনির নিজের হিসাবে ক্রেতা, পরিবেশক ও বিনিয়োগকারীর সংখ্যা ৪৫ লাখ।

আদালতের নির্দেশে ২০১৩ সাল থেকেই ডেসটিনির স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণ ও তদারকির দায়িত্ব পুলিশের। রাজধানীতে থাকা ডেসটিনির সম্পদ ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) এবং রাজধানীর বাইরের সম্পদের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করছেন সংশ্লিষ্ট জেলার পুলিশ সুপার (এসপি)।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঢাকাসহ দেশের ২২টি জেলায় ডেসটিনির সম্পদ রয়েছে। এ সম্পদ দুই ভাগে বিভক্ত—প্রতিষ্ঠানের নামে ও পরিচালকদের নামে। রাজধানীতে ডেসটিনির এমডি রফিকুল আমীনেরই ২৮টি ফ্ল্যাট রয়েছে। পুরান ঢাকার ২৫ নম্বর কোর্ট হাউস স্ট্রিট ভবন ও ধানমন্ডির বাড়ি রফিকুল আমীনের স্ত্রী ফারাহ দীবার নামে। ঢাকার কল্যাণপুরের দারুস সালাম ও পুরানা পল্টন লাইনের স্থাপনাবিহীন বাড়ি এবং বাংলামোটরে নাসির ট্রেড সেন্টারের ১০ম তলায় রয়েছে ৫ হাজার বর্গফুটের ফ্লোর। ডেসটিনি ২০০০ লিমিটেডের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হোসাইনের নামে সিদ্ধেশ্বরী, খিলগাঁও, গেন্ডারিয়া, ক্যান্টনমেন্ট ও ভাটারায় প্লট-ফ্ল্যাট রয়েছে।

এ ছাড়া ডেসটিনির ২৪টি রাবার বাগান রয়েছে বান্দরবান, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে। খুলনায় সাত একর জমি, ছয় বিভাগীয় শহরে বিজনেস সেন্টার নির্মাণের জমি, কক্সবাজারে জমিসহ হোটেল ও গাজীপুরে ডেসটিনি অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ স্থাপনের জন্য জমি রয়েছে।

কোম্পানি আইন নিয়ে কাজ করা আইনজীবী তানজীব উল আলম প্রথম আলোকে বলেন, ‘বাণিজ্যমন্ত্রী যদি যুবক ও ডেসটিনির বঞ্চিত গ্রাহকদের পাওনা ফেরতের সম্ভাবনার কথা বলে থাকেন, আমার মতে তা সম্ভব। যুবকের ক্ষেত্রে কাজটা অনেকটা এগিয়ে আছে। যত দূর জানি, কমিশন করে একটা তালিকাও করা হয়েছে যুবকের গ্রাহকদের। ডেসটিনির ব্যাপারেও একই তালিকা করতে হবে। পাশাপাশি সম্পদের মূল্যায়নও করতে হবে।’

এত দিন কাজটি না হওয়ার কারণ কী—এমন প্রশ্নের জবাবে তানজীব উল আলম বলেন, ‘হয়নি মূলত সরকারের দক্ষতার অভাবের কারণে। দায়িত্বশীলদের কেউই বিষয়টির সমাধানের জন্য নিজেদের দায়িত্ব বলে এত দিন মনে করেননি।’

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন