নেপিডোতে মিয়ানমারের সশস্ত্র বাহিনী দিবসের কুচকাওয়াজ
নেপিডোতে মিয়ানমারের সশস্ত্র বাহিনী দিবসের কুচকাওয়াজছবি: রয়টার্স

মিয়ানমারে সামরিক জান্তাবিরোধী আন্দোলনে যে দিন সবচেয়ে বেশি বিক্ষোভকারীর মৃত্যু ঘটেছে, সেই দিন নেপিডোতে দেশটির সশস্ত্র বাহিনী দিবসের কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রতিরক্ষা অ্যাটাশের অংশগ্রহণ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এ ঘটনায় শুধু মিয়ানমারের গণতন্ত্রকামীরা ক্ষুব্ধ ও হতাশ হয়েছেন তা-ই নয়, বিশ্বের অন্যান্য দেশের মানবাধিকারকর্মী এবং গণতন্ত্রপন্থীরাও বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাংলাদেশসহ আটটি দেশের অংশগ্রহণের ঘটনায় সমালোচনা চলছে।

গত শনিবার ২৭ মার্চ ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানি দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর প্রতিরোধের ৭৬তম বার্ষিকী। এ দিন কোনো ধরনের বিক্ষোভ-প্রতিবাদ না করার জন্য দেশটির সামরিক সরকার নির্দেশনা জারি করেছিল। কিন্তু সেদিন মিয়ানমারজুড়েই ব্যাপক বিক্ষোভ হয় এবং সেনাবাহিনী ও পুলিশ নির্বিচার গুলিবর্ষণ করে। এ দিনে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১১৪।

দিনটিতে কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানে মিয়ানমারে কর্মরত সব দেশের মিশনের প্রতিনিধিরা আমন্ত্রিত হলেও মাত্র আটটি দেশের প্রতিনিধিরা এতে অংশ নেন। এই আটটি দেশ হলো চীন, রাশিয়া, ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ভিয়েতনাম, লাওস ও থাইল্যান্ড। অন্য সব দেশের কূটনীতিকেরা সেনাবাহিনীর ওই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকেন। বিবিসি, আল-জাজিরাসহ বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনগুলোতে সামরিক জান্তার প্রতি এই উদারতা দেখানোর বিষয়টি তুলে ধরে দেশগুলোর নাম প্রকাশ করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

এর আগে গত সপ্তাহে জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদে শ্রীলঙ্কায় তামিল বিদ্রোহ দমনের সময়ে সংঘটিত যুদ্ধাপরাধের বিচারপ্রক্রিয়ার বিষয়ে একটি প্রস্তাবের বিরোধিতা করে বাংলাদেশ শ্রীলঙ্কার পক্ষে ভোট দিয়েছিল। ৪৭ সদস্যের পরিষদে ভোটাভুটিতে বাংলাদেশ ছাড়াও পাকিস্তান, চীন, রাশিয়াসহ মোট ১১টি দেশ শ্রীলঙ্কার পক্ষে ভোট দেয়। তবে প্রস্তাবটি সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে পাস হয়েছিল।

মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে আন্তর্জাতিক পরিসরে মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের পক্ষে সংহতি প্রকাশের বদলে মিয়ানমারের সশস্ত্র বাহিনী দিবসের কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানে গিয়ে বাংলাদেশের কূটনীতি আবারও সমালোচনার মুখে পড়ল।

মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর নৃশংসতার প্রথম শিকার সে দেশের নাগরিকেরা হলেও দ্বিতীয় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশ হচ্ছে বাংলাদেশ। ২০১৭ সালের আগস্ট থেকে বাংলাদেশ মানবিক কারণে প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছে। এই পটভূমিতে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর প্রতি সহানুভূতি বা সৌজন্য প্রকাশের বিষয়টি মোটেও স্বাভাবিক কিছু নয়।

মিয়ানমারে আটক অং সান সু চির দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি, এনএলডির এমপিদের প্রতিনিধিত্বকারী কমিটি রিপ্রেজেনটেটিভ পিদাংশু হ্লাত্তোর ( সিআরপিএইচ) একজন মুখপাত্র এক বিবৃতিতে বলেছেন, ‘যখন নিরীহ লোকজনকে হত্যা করা হচ্ছে, তখন (সেনাপ্রধান) মিন অং হ্লাইং এবং তাঁর সহযোগীদের পাশে কয়েকজন কূটনীতিককে দেখে মিয়ানমারের জনগণ কতটা দুঃখ পেয়েছে, তা বর্ণনা করতে আমি অক্ষম।’ বিবৃতিতে তিনি আরও বলেন, যেসব বিদেশি কূটনীতিক সশস্ত্র বাহিনী দিবসের আয়োজনে অংশ নিয়েছেন, তাঁরা নিজেদের দেশের মানুষ, তাঁদের সরকার এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য লজ্জা।

জাতিসংঘের সাবেক সহকারী মহাসচিব কুল চন্দ্র গৌতম টুইটারে লিখেছেন, ‘সশস্ত্র বাহিনী দিবসের অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে দেশটির অভ্যুত্থানকে বৈধতা দেওয়া রাশিয়া, চীন, ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, ভিয়েতনাম, লাওস ও থাইল্যান্ডের কূটনীতিকদের ধিক্কার জানাই।’

মিয়ানমারের গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলনকারীদের জোট সিভিএমের টুইটেও এ ঘটনার নিন্দা জানানো হয়েছে। জাস্টিস ফর উইমেনের প্রতিষ্ঠাতা ওয়াই ওয়াই নুন আটটি দেশের নামসংবলিত খবরের ছবি টুইট করে লিখেছেন, ‘এসব দেশ আমাদের হত্যাকাণ্ডের সহযোগী।’ রোহিঙ্গাদের পক্ষ থেকেও অনেকে টুইটে একই ধরনের হতাশা প্রকাশ করেছেন।

মিয়ানমারের সশস্ত্র বাহিনী দিবসের কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের প্রতিনিধির যোগ দেওয়ার বিষয়ে ঢাকায় যোগাযোগ করে সরকারের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন