আহত রাঙা হালতিকে সেবা দিয়ে সুস্থ করে তোলা হয়
আহত রাঙা হালতিকে সেবা দিয়ে সুস্থ করে তোলা হয়ছবি: তানভীর খান

বাগেরহাটের ফকিরহাট উপজেলায় আমার গ্রাম। সেখানে এ পর্যন্ত ১২ জন করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। কিন্তু পাখিরা তো আর করোনা বোঝে না। তাই দিনেকানা পাখিরা ডিম-ছানা তুলেছে ও তুলছে। শ্যামা, নাচুনে, রাঙা হালতি ও হালতিরা বাসা বেঁধে ডিম-ছানা তুলেছে—কেউবা তোলার অপেক্ষায় আছে। আমার নিরিবিলি বাড়িটার পেছনেই গ্রামীণ বন। বাড়ির পেছন থেকে মাত্র ৪০ ফুট দূরে পাশাপাশি দুটি বাঁশঝাড়। সেই ছেলেবেলা থেকে দেখে আসছি কমপক্ষে তিন জোড়া দিনেকানা পাখি মাটিতে ডিম পেড়ে ছানা তুলে আসছে। গত এপ্রিলে বাড়ি গিয়ে হালতিদের প্রাণজুড়ানো সুরেলা সংগীত শুনে এসেছিলাম। আতঙ্কের ভেতরেও বাংলাদেশ ওয়াইল্ড লাইফ ক্লাবের গ্রামপ্রধান শিপলু খান তাঁর সঙ্গীদের নিয়ে বিশেষ কয়েকটি পাখির বাসা-ডিম ও ছানার সংখ্যার সব তথ্য সংগ্রহ করে আমাকে পাঠিয়েছেন।

প্রতিবছর জুলাই-আগস্টে গ্রামে যাই। একসঙ্গে হালতি, রাঙা হালতি, নাগরবাটোই ও দিনেকানার বাসা দেখতে পাই। বোনাস হিসেবে কখনো কখনো পেয়ে যাই ছোট সরালি হাঁসের বাসা। পাখিগুলোর বাসা বাঁধার মৌসুম একই। কিন্তু করোনার কারণে এবার আর আমার যাওয়া হলো না। তবে মুঠোফোনে শুনেছি রাতভর হালতির ডাক ও গান।

বিজ্ঞাপন
default-image

ভিডিও কলে দেখেছি ওদের, বাসা-ডিম-ছানা। মাটির ওপরে বা কেটে নেওয়া গাছের গুঁড়ির ওপরে অনেকটা নৌকার ছইয়ের মতো বা তাঁবুর মতো বাসা করে (অন্যান্য গোপন জায়গায়ও বাসা করে) ডিম পাড়ার আগ পর্যন্ত সন্ধ্যা-রাত ও বিকেলে কী সুন্দর সুরেলা কণ্ঠে যে একটানা মিষ্টি গান গেয়ে চলে! অনেক সময় মনে হয় পাখিটির বুকে অনেক দুঃখ! ডাকতে ডাকতে ক্লান্ত হয়ে গেলে মনে হয় ওটা ঘুমজড়ানো কণ্ঠেই গাইছে। এরা আমাদের দেশে আসে ফেব্রুয়ারিতে, থাকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। বাল্য-কৈশোর থেকে চিনি এদের—দেখেছি বাসা-ডিম-ছানা। গভীর গ্রামীণ বনতল পছন্দ এদের। মাটিতেই চরে, মাটি থেকেই খাবার সংগ্রহ করে।

একটা কথা বলতেই হয়, হালতির বাসা-ডিম-ছানার সন্ধান আজ অবধি দেশের অন্য কোথাও পাওয়া যায়নি—আমার গ্রাম সাতশৈয়া ছাড়া।

বাসায় ডিমে তা দিতে বসে থাকা হালতির মুখ-ঠোঁট বাইরে কিছুটা বেরিয়ে থাকে। এই অবস্থায় ফুটখানেক দূর থেকে ফ্ল্যাশ লাইটেও ছবি তোলা যায়, ওড়ে না পাখিটি। একটা কথা বলতেই হয়, হালতির বাসা-ডিম-ছানার সন্ধান আজ অবধি দেশের অন্য কোথাও পাওয়া যায়নি—আমার গ্রাম সাতশৈয়া ছাড়া। এখানে প্রতি মৌসুমে গড়ে ১৩টি বাসা পাওয়া যায়। এ বছরে আজ পর্যন্ত পাওয়া গেছে ১৭টি বাসা। পাওয়া যাবে আরও। আমার বাগানে দুটি বাসা পাওয়া যায়, আরও একটি বাসায় ডিমে তা দিচ্ছে অন্য এক জোড়া পাখি।

রংচঙা খুব সুন্দর পাখি হালতি। এদের সবচেয়ে দর্শনীয় অংশ হচ্ছে তলপেট ও লেজের তলা—দেখে মনে হয় এইমাত্র ঘন করে আলতা দিয়েছে পাখিটা। কালো চোখ ও ঘাড়-গলা। দর্শনীয় লালছে-বাদামি মাথার তালু। পিঠ-ডানা জলপাই সবুজ। ডানার উপরিভাগে চওড়া করে নীল রং ও ডানার নিচের প্রান্ত নীলচে-সাদা। বুকে একটিপ কালচে রং। লেজের প্রান্তের উপরিভাগটাও নীল। এদের লেজ নেই-ই বলা যায়। ঘন-ধূসর পা এদের, ঠোঁট কালো। উড়লে এদের সৌন্দর্য যেন বহুগুণে বেড়ে যায়।

গ্রীষ্মের পরিযায়ী পাখি হালতির মূল খাবার নানা জাতের পোকামাকড়। কেঁচো গেলে নুডলসের মতো। এটির ইংরেজি নাম Western Hooded Pitta। বৈজ্ঞানিক নাম Pitta sordida। দৈর্ঘ্য ১৯ সেন্টিমিটার। ওজন ৬৫ গ্রাম। ডিম পাড়ে চার–ছয়টি।

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন