বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

বিআইডব্লিউটিসির কর্মকর্তা, যাত্রী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এ ক্ষেত্রে চারটি কারণকে দায়ী করছেন। প্রথমত, রকেট ছাড়া হয় সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায়। বেসরকারি লঞ্চ ছাড়ে রাত নয়টা পর্যন্ত। যাত্রীরা কাজ শেষ করে রাতে বেসরকারি লঞ্চে ওঠাকেই বেশি সুবিধাজনক মনে করেন। দ্বিতীয়ত, সদরঘাটে একই পথে বেসরকারি লঞ্চ থামানো থাকে যাত্রীর জন্য সুবিধাজনক জায়গায়। রকেট থামানো থাকে দূরে। তৃতীয়ত, রকেটে যেতে সময় বেশি লাগে এবং যাত্রীসেবার মান নিয়ে সন্তুষ্ট নন গ্রাহকেরা। চতুর্থ কারণ অনিয়ম। অভিযোগ আছে, রকেটে টিকিটের বাইরে যাত্রী নেওয়া হয়। এই যাত্রীদের ভাড়া সরকারের কোষাগারে যায় না। নৌযান চালানোর জন্য তেল কেনায় চুরির অভিযোগও রয়েছে। বিআইডব্লিউটিসি সূত্রে জানা গেছে, একসময় রকেট স্টিমার সদরঘাটের সর্বশেষ ১৩ নম্বর পন্টুনে রাখা হতো। কিন্তু বেসরকারি লঞ্চমালিকদের আপত্তিতে রকেট স্টিমারকে লালকুঠি ঘাটে সরিয়ে দেওয়া হয়, যেখানে যাত্রী কম যায়। বিআইডব্লিউটিসির পরিচালক (বাণিজ্য) এস এম আশিকুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা লোকসান কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছি। তবে রকেট সদরঘাটে না রেখে লালকুঠি ঘাটে রাখার কারণে যাত্রী কম পাওয়া যায়।’

পথ শুধুই একটি

ঢাকার সঙ্গে দক্ষিণ এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন পথে বেসরকারি নৌযান যাত্রী পরিবহন করে। তবে বিআইডব্লিউটিসির রকেট স্টিমার যায় কেবল ঢাকা থেকে খুলনা পর্যন্ত। যদিও নাব্যতা-সংকটের কারণে রকেট খুলনা পর্যন্ত যেতে পারে না। যায় বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ পর্যন্ত। ২০১৯ সালের ২০ এপ্রিলের পর আর খুলনা যায়নি রকেট। এখন ঢাকা-মোরেলগঞ্জ পথে সপ্তাহের সোম, বুধ ও বৃহস্পতিবার সদরঘাট থেকে একটি করে রকেট স্টিমার ছেড়ে যায়।

বিআইডব্লিউটিসি এখন রকেট স্টিমার সেবার আওতায় তিনটি প্যাডল স্টিমার চালায়—পিএস মাসুদ, এমভি ল্যাপচা ও এমভি টার্ন। নৌযান তিনটি ৭০ থেকে ৯০ বছরের পুরোনো। পিএস মাসুদ এখন রক্ষণাবেক্ষণে রয়েছে। প্যাডল স্টিমার ছাড়া দুটি মোটর নৌযান রয়েছে—এমভি বাঙ্গালী ও এমভি মধুমতি। এ দুটির বয়স ছয় ও সাত বছর।

রকেট স্টিমার ঢাকা থেকে মোরেলগঞ্জ যেতে চাঁদপুর, বরিশাল, ঝালকাঠি, কাউখালী, হুলারহাট, চরখালী, বড় মাছুয়া ও সন্ন্যাসী নামের ঘাটে থামে। ঢাকা থেকে মোরেলগঞ্জ পর্যন্ত সুলভ শ্রেণির যাত্রীপ্রতি ভাড়া ২৮০ টাকা।

বিআইডব্লিউটিসির চেয়ারম্যান সৈয়দ মো. তাজুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘যেসব জায়গায় অন্য কোনো বেসরকারি নৌপরিবহন নেই, সেই সব জায়গার যাত্রীদের জন্য আমরা রকেট স্টিমারের সেবা অব্যাহত রেখেছি।’ তিনি বলেন, বিআইডব্লিউটিসি সেবামূলক সংস্থা। তাই লাভ না হলেও তাঁরা সেবা দিতে বাধ্য।

default-image

বেসরকারিতে যাত্রী ভরা, সরকারি খালি

সদরঘাটে ১৭ জুন সন্ধ্যা ছয়টার দিকে গিয়ে দেখা যায়, বিআইডব্লিউটিসির নৌযান এমভি মধুমতির সুলভ শ্রেণিতে (ডেক) টিকিট কাটা যাত্রী ছিলেন ৮১ জন। এর বাইরে ৫২টি কেবিনের মাত্র ১১টি বিক্রি হয়েছিল। চেয়ার টিকিটের ৪২টির মধ্যে বিক্রি হয়েছিল দুটি।

মধুমতির যাত্রী ধারণক্ষমতা ৭৫০ জন। সে তুলনায় যাত্রী ছিলেন একেবারেই কম। বিপরীতে বেসরকারি লঞ্চগুলো ছিল যাত্রীতে ভরা। একই দিন ঢাকা থেকে ঝালকাঠির উদ্দেশে রাত আটটায় ছেড়ে যাওয়া সুন্দরবন-১২ নামের একটি বেসরকারি লঞ্চের ১৩০টি কেবিনের সব কটিই বিক্রি হয়েছিল। একই চিত্র ছিল বরিশালের উদ্দেশে যাওয়া অ্যাডভেঞ্চার-৯, চাঁদপুরগামী রফরফসহ অন্যান্য লঞ্চেও। করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সরকারের দেওয়া বিধিনিষেধ শিথিল করার প্রথম দিন গতকাল বৃহস্পতিবারও ছিল প্রায় একই চিত্র।

মধুমতির চালক (ক্যাপ্টেন) আবদুল হাই প্রথম আলোর কাছে দাবি করেন, ঘাট যেমন দূরে, তেমনি মধুমতি অন্য লঞ্চের আগে ছেড়ে যাওয়ায় যাত্রী কম হয়। তবে চাঁদপুর যাওয়ার পর সেখান থেকে যাত্রী ওঠে।

যাত্রী ও টিকিটসংখ্যায় গরমিল

বিআইডব্লিউটিসির স্টিমারে যাত্রী ওঠার আগে টিকিট কাটতে হয়। তবে অনেক যাত্রীকে বিনা টিকিটে স্টিমারে উঠতে দেখা গেছে। ১৭ জুন এই প্রতিবেদক মধুমতিতে ওঠার সময় কেউ টিকিট চাননি। ঠিক সাড়ে ছয়টায় যখন লঞ্চটি ছেড়ে যায়, তার কিছুক্ষণ আগে মধুমতির নিচতলার ডেকে গুনে দেখা যায় যাত্রীসংখ্যা ৯৭ জন। এ ছাড়া দোতলায় চেয়ারে ছিলেন ১১ জন যাত্রী।

অবশ্য টিকিট কাউন্টারে দায়িত্বরত পরিদর্শক বিল্লাল হোসেন বলেন, এদিন ৮১টি ডেকের টিকিট বিক্রি হয়েছে। চেয়ারের টিকিট বিক্রি হয়েছে দুটি।

টিকিটবিহীন যাত্রীদের বিষয়ে জানতে চাইলে মুঠোফোনে মধুমতির টার্মিনাল তত্ত্বাবধায়ক মোহাম্মদ শাহাজাদা বলেন, ‘অনেক সময় অনেক গরিব মানুষ স্টিমারে ওঠে। কিছু যাত্রীকে আমরা ছেড়ে দিই। ছোট শিশুদের কাছ থেকে আমরা ভাড়া নিই না।’

অবশ্য মধুমতিতে যাতায়াত করা যাত্রীরা দাবি করছেন, টিকিট না কেটে ভাড়া কম দিয়ে যাওয়া যায়। অনেক সময় নির্ধারিত ভাড়ার কম দিয়ে কেবিনও নেওয়া যায়। এ টাকা মূলত কর্মীরা ভাগবাঁটোয়ারা করে নেন।

ফেরিভাড়া বাড়িয়েও মুনাফা কমছে

বিআইডব্লিউটিসির আয়ের উৎস যাত্রী পরিবহন, পণ্য পরিবহন ও ফেরিসেবা। যাত্রী পরিবহনে অব্যাহত লোকসান দিয়ে যাওয়ার পেছনে তাদের যুক্তি হলো, নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য তারা এ সেবা চালু রেখেছে।

ঢাকা থেকে মোরেলগঞ্জে যেতে সড়কপথে সাত ঘণ্টার মতো লাগে। আর রকেটে যেতে লাগে ১৮ ঘণ্টার মতো। এদিকে পদ্মা সেতুর কাজ শেষের পথে। সেতুটি চালু হলে ঢাকা থেকে মোরেলগঞ্জে আরও কম সময়ে যাওয়া যাবে। তখন রকেট সেবার জনপ্রিয়তা একেবারেই কমে যাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিআইডব্লিউটিসি ২০১৮-১৯ অর্থবছরে স্টিমারে দুই লাখের কম যাত্রী পরিবহন করেছে। করোনাকালে স্বাভাবিকভাবেই তা আরও কমেছে।

default-image

বিআইডব্লিউটিসি রকেট চালিয়ে যে লোকসান দেয়, তা পুষিয়ে নেয় ফেরিভাড়া থেকে। যদিও ফেরিভাড়া বাড়িয়েও তাদের মুনাফা কমছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, নিয়মিত বিরতিতে বিভিন্ন পথে ফেরিভাড়া বাড়ানো হয়েছে, যা যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের ব্যয় বাড়িয়েছে। আবার উচ্চ হারে ভাড়াও নির্ধারণ করা হয়েছে। যেমন গত ফেব্রুয়ারি মাসে আরিচা-কাজীরহাট রুটে ফেরিভাড়া নির্ধারণ করা বাসের ক্ষেত্রে ২ হাজার ৬০ টাকা। এতে ৩৬ সিটের একটি বাসে যাত্রীপ্রতি ফেরিভাড়া দাঁড়ায় ৫৭ টাকা।

ভাড়া বাড়িয়েও যে বিআইডব্লিউটিসির মুনাফা কমছে, তা দেখা যায় সংস্থাটির ২০১৯-২০ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদনে। এ অর্থবছরে সংস্থাটির মুনাফা দাঁড়িয়েছে প্রায় ১০ কোটি টাকা, যা ৫ বছর আগে ছিল ৪৭ কোটি টাকা। করোনাকালের বাইরে সাম্প্রতিক অন্য অর্থবছরগুলোতেও মুনাফা পড়তির দিকে ছিল।

রকেট সেবায় লোকসানের ক্ষেত্রে বিআইডব্লিউটিসির একটি যুক্তি ছিল যে তাদের রকেটগুলো পুরোনো। এর রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় অনেক বেশি। তবে ২০১৪ ও ২০১৫ সালে সাড়ে ৫৩ কোটি টাকা ব্যয়ে দুটি জাহাজ নামানো হয়। এর পর থেকে লোকসান আরও বেড়েছে।

সাধারণ মানুষ যাতে সাশ্রয়ী মূল্যে সেবা পায় এবং বেসরকারি খাত যাতে ইচ্ছেমতো সেবার মূল্য নির্ধারণ করতে না পারে, সে জন্য সরকারের এসব সেবা দরকার আছে বলে মনে করেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে অব্যবস্থাপনা, অদক্ষতা, অনিয়ম ও যোগসাজশে সরকারি সেবা বেসরকারি খাতের ওপর কোনো চাপ তৈরি করে না। মানুষও খুব একটা সুফল পায় না। এতে সব দিক দিয়ে করদাতার লোকসান হয়।’

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন