বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

দেশের শীর্ষ মোবাইল অপারেটর গ্রামীণফোন বলছে, ঢাকায় অন্তত ১১৬টি এলাকায় এখনই টাওয়ার বসানো দরকার। মোবাইল অপারেটর রবি জানিয়েছে, ঢাকা ও চট্টগ্রামে তাদের ২৭০টি টাওয়ার বসানো খুবই জরুরি। আর বাংলালিংক জানিয়েছে, তাদের দরকার ১৩০টি টাওয়ার।

গ্রামীণফোনের ভারপ্রাপ্ত চিফ করপোরেট অ্যাফেয়ার্স অফিসার হোসেন সাদাত প্রথম আলোকে বলেন, নগর-পরিকল্পনা ও সম্প্রসারণের বিভিন্ন মাপকাঠিতে ঢাকায় মোবাইল নেটওয়ার্ক পরিচালনা ও নিরবচ্ছিন্ন সেবা দেওয়া প্রতিনিয়ত কঠিন হয়ে উঠছে। পুরোনো ভবন ভেঙে নতুন সুউচ্চ ভবন গড়ে উঠছে। কৌশলগত স্থানে টাওয়ার তৈরির অনুমতি না পাওয়ায় অনেক ‘পকেট’ সৃষ্টি হচ্ছে, যা সেবাকে বাধাগ্রস্ত করছে। তিনি বলেন, ‘মোবাইল সেবার মান উন্নয়নে যথাস্থানে টাওয়ার নির্মাণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়ে একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালার জন্য আমরা যথাযথ কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি প্রত্যাশা করছি।’

কোথায় কোথায় সংকট

অপারেটরগুলোর তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর যেসব এলাকায় নেটওয়ার্ক দুর্বল, তার মধ্যে রয়েছে আগারগাঁওয়ের প্রশাসনিক এলাকা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, কয়েকটি বেসরকারি আবাসন প্রকল্প এলাকা, গুলশান, বনানী ও বারিধারার কয়েকটি এলাকা, ডিওএইচএস এলাকা এবং ধানমন্ডি, মহাখালী ও মিরপুরের কয়েকটি এলাকা। মোটামুটি ঢাকার প্রায় সব এলাকায়ই কিছু কিছু জায়গা বা ভবন রয়েছে, যেখানে নেটওয়ার্ক দুর্বল।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্যার এ এফ রহমান হলের ছাত্র নুরুল আফসার প্রথম আলোকে বলেন, হলটিতে কক্ষের ভেতরে ঢুকলেই গ্রামীণফোনের ইন্টারনেট পাওয়া যায় না। রবির গ্রাহকের ফোনে মাঝেমধ্যে কলও ঢোকে না। তিনি বলেন, ‘চার বছর ধরে আমি হলে আছি। পুরোটা সময়ই এমন অবস্থা দেখছি।’

অপারেটরগুলো বলছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় যত টাওয়ার দরকার, রয়েছে তার কম। এ কারণে সব জায়গায় সমান মানের সেবা দেওয়া যায় না। নানান উৎসবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় মানুষের ভিড় বাড়ে। তখন সেবার মান আরও নিম্নমুখী হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য (প্রশাসন) মুহাম্মদ সামাদ প্রথম আলোকে বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে টাওয়ার বসানোর বিষয়ে কোনো মোবাইল অপারেটরের পক্ষ থেকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে বলে মনে পড়ছে না। তবে এ ধরনের আবেদন এলে সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করা উচিত।

কী সমস্যা

অপারেটরগুলো বলছে, কিছু এলাকায় সংশ্লিষ্ট বাড়ির মালিক সমিতি টাওয়ার বসাতে দেয় না। কিছু এলাকায় সরকারি কার্যালয় বেশি, সেখানে টাওয়ার বসানোর অনুমতি পাওয়া যায় না। বেসরকারি আবাসন প্রকল্পে কর্তৃপক্ষ টাওয়ার বসানোর অনুমতি দেয় না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে টাওয়ার বসাতে চাঁদা চাওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

টাওয়ার বসানোর ক্ষেত্রে অপারেটররা এলাকাভেদে ৬ থেকে ২৫ হাজার টাকা করে মাসিক ভাড়া দেয়। অপারেটরগুলোর দাবি, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ভবনমালিকেরা বিকিরণের (রেডিয়েশন) ভয়ে টাওয়ার বসাতে দেন না।

অবশ্য বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) ও মোবাইল অপারেটরগুলো সব সময় বলে আসছে, টাওয়ারে বিকিরণের মাত্রা কখনোই সহনীয় সীমার ওপরে ওঠে না। বিটিআরসি ২০২০ সালের শুরুর দিকে ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, সুন্দরবন, ফেনী, রাজশাহী, সিলেট, রংপুর প্রভৃতি এলাকায় ৭০টি বিটিএসে জরিপ চালিয়ে দেখেছে, কোথাও বিকিরণ মাত্রা ছাড়ায়নি।

হাইকোর্ট ২০১৯ সালের ২৫ এপ্রিল মোবাইল টাওয়ারের নিঃসৃত বিকিরণ জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের ক্ষতি করছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে সমীক্ষা করতে বলেছিলেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিটিআরসি জরিপ করে জানায়, ইন্টারন্যাশনাল কমিশন অন নন-আয়োনাইজিং রেডিয়েশন প্রোটেকশনের (আইসিএনআইআরপি) পক্ষ থেকে ইলেকট্রিক অ্যান্ড ম্যাগনেটিক ফিল্ডস (ইএমএফ) রেডিয়েশনে যে মাত্রায় ক্ষতিকর প্রভাব পাওয়া গেছে, তার ৫০ ভাগের ১ ভাগকে নিরাপদ সীমা হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। বাংলাদেশে নিরাপদ সীমারও অনেক কম মাত্রায় বিকিরণ পাওয়া যায়।

সব মিলিয়ে দেশে এখন ২৫ হাজারের বেশি টাওয়ার রয়েছে। ২০১৮ সালে বিটিআরসি ইডটকো বাংলাদেশ লিমিডেট, সামিট পাওয়ার লিমিটেড, কীর্তনখোলা টাওয়ার বাংলাদেশ লিমিটেড এবং এবি হাইটেক কনসোর্টিয়াম লিমিটেডকে টাওয়ার বসানোর লাইসেন্স দেয়। মোবাইল অপারেটরগুলো এখন আর নিজেরা সরাসরি টাওয়ার বসাতে পারে না। টাওয়ার কোম্পানির মাধ্যমে তাদের টাওয়ার বসাতে হয়।

টাওয়ার খাতের শীর্ষস্থানীয় কোম্পানি ইডটকো বাংলাদেশের কান্ট্রি ম্যানেজিং ডিরেক্টর রিকি স্টেইনের মতে, বিকিরণের ঝুঁকি সম্পর্কে মানুষের মধ্যে ভুল ধারণা রয়েছে। টাওয়ার বসানোর জন্য জমির বৈধ মালিকদের চিহ্নিত করাও কঠিন। তিনি প্রথম আলোকে আরও বলেন, টাওয়ার বসানোর প্রক্রিয়াটি আরও জটিল হয়ে ওঠে, যখন নির্ধারিত জমি সরকার বা অন্য প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মালিকানাধীন হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে জমি নির্ধারণ ও ইজারাসংক্রান্ত আলোচনার জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করতে দুই বছরের বেশি সময় লেগে যায়।

টাওয়ার বসানোর প্রক্রিয়াটি আরও জটিল হয়ে ওঠে যখন নির্ধারিত জমি সরকার বা অন্য প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মালিকানাধীন হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে জমি নির্ধারণ ও ইজারাসংক্রান্ত আলোচনার জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করতে দুই বছরের বেশি সময় লেগে যায়।
রিকি স্টেইন, কান্ট্রি ম্যানেজিং ডিরেক্টর, ইডটকো বাংলাদেশ

সমস্যা আরও

মোবাইল সেবার মানের ক্ষেত্রে আরও একটি সমস্যা রয়েছে। সেটি হলো, বিভিন্ন এলাকায় অবৈধভাবে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান জ্যামার, নেটওয়ার্ক বুস্টার ও রিপিটার নামের যন্ত্র বসিয়ে রেখেছে। এতে বেতারতরঙ্গ ব্যবস্থাপনা বাধাগ্রস্ত হয়। জ্যামারের কারণে সংশ্লিষ্ট এলাকায় কেউ মোবাইল সেবা ব্যবহার করতে পারেন না। বুস্টার ও রিপিটার ব্যবহার করে কেউ কেউ নিজেদের ভবনে নেটওয়ার্কের মান উন্নত করছেন, অন্য জায়গায় ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।

বিটিআরসি গত ১৯ এপ্রিল মানুষকে খুদে বার্তা পাঠিয়ে অবৈধভাবে স্থাপিত জ্যামার, নেটওয়ার্ক বুস্টার ও রিপিটার নিজ দায়িত্বে সরিয়ে নেওয়ার অনুরোধ করেছে। পুরান ঢাকার নবাবপুরের এক দোকানমালিকের মুঠোফোনেও বার্তাটি গেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই দোকানমালিক প্রথম আলোকে বলেন, খুদে বার্তা পাওয়ার পর তিনি সংশ্লিষ্ট মোবাইল অপারেটরের গ্রাহক সেবাকেন্দ্রে যোগাযোগ করে নেটওয়ার্কের ব্যবস্থা করার অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু গ্রাহক সেবাকেন্দ্র থেকে তাঁকে বলা হয়েছে, শিগগিরই এ বিষয়ে সমাধানের আশা নেই। এরপর তিনি আর রিপিটার সরিয়ে নেননি।

এই ব্যবসায়ী প্রথম আলোকে বলেন, রিপিটার সরিয়ে নিলে তাঁর দোকানে নেটওয়ার্ক থাকবে না। ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আর ব্যাংক থেকে বড় অঙ্কের চেকের বিপরীতে টাকা পরিশোধের ক্ষেত্রে ফোন করে নিশ্চয়তা চাওয়া হয়। নেটওয়ার্ক না থাকলে ফোনই আসবে না।

সেবার মান নিয়ে প্রশ্ন

দেশের মোবাইল অপারেটরদের সেবার মান নিয়ে প্রশ্ন আছে। কল না ঢোকা, কল ড্রপ, ইন্টারনেটের ধীর গতি—এসব সমস্যা নিয়ে জাতীয় সংসদেও আলোচনা হয়েছে। টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার ও বিটিআরসির চেয়ারম্যান শ্যাম সুন্দর সিকদারও বিভিন্ন সময় সেবার মান নিয়ে উষ্মা প্রকাশ করেছেন।

সেবার মান উন্নয়নের জন্য অপারেটরগুলো ২০২১ সালে ও গত মার্চে ১৩ হাজার ৬০০ কোটি টাকার তরঙ্গ কেনে। এই তরঙ্গ ব্যবহার করে সেবার মান উন্নত করতে এখন বাড়তি টাওয়ার দরকার। অপারেটরগুলো চায় বিটিআরসি সরকারি ভবন, বেসরকারি স্থাপনায় টাওয়ার বসানোর সুযোগ দিতে উদ্যোগ নিক।

জানতে চাইলে বিটিআরসির ভাইস চেয়ারম্যান সুব্রত রায় মৈত্র প্রথম আলোকে বলেন, টাওয়ার বসানোর জায়গা পাওয়া যায় না, এটা ঢালাওভাবে বলা ঠিক নয়। টাওয়ার বসানো দরকার। অপারেটরগুলো সুনির্দিষ্টভাবে এ বিষয়ে বিটিআরসিকে জানালে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

‘রাজধানীতে নেটওয়ার্ক পাব না, এটা কোনো কথা!’

দেশে গত মার্চ শেষে মোবাইল অপারেটরগুলোর সক্রিয় সিম (গ্রাহক শনাক্তকরণ নম্বর) সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৮ কোটি ২৯ লাখে। সংখ্যাটি প্রতিনিয়তই বাড়ছে। এর মধ্যে ১২ কোটি ৫৫ লাখ সিমে ইন্টারনেট ব্যবহার করা হয়। মুঠোফোন এখন শুধু কথা বলা নয়, সব ক্ষেত্রেই জরুরি সেবা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

শেওড়াপাড়ার সৈয়দা শামীমা আক্তার প্রথম আলোকে বলেন, ‘রাজধানীতে বাস করেও আমরা মোবাইলে নেটওয়ার্ক পাব না, এটা কোনো কথা!’

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন