রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল (সাবেক রূপসী বাংলা) ট্রাফিক সংকেত (সিগন্যাল) থেকে মিন্টো রোড ছাড়িয়ে অন্তত দেড় শ গাড়ির সারি। কাকরাইল ও বেইলী রোড প্রান্ত থেকে আসা এসব গাড়িকে স্থবির হয়ে থাকতে হলো লম্বা সময়। শাহবাগ-বাংলামোটরে বিপরীতমুখী গাড়িগুলো চলছে তো চলছেই। গতকাল মঙ্গলবার বিকেল প্রায় চারটায় এই ছিল শাহবাগে হরতালের চিত্র।
একটি কাভার্ড ভ্যানের চালক আরেক চালককে জোরের সঙ্গে বললেন, ‘এটা কিরম হরতাল? হরতাল না অইলেও ত এই টাইমে এরোম জাম অয় না।’ বিরক্ত অপর চালকও সায় দিলেন। ভর্ৎসনার স্বরে বললেন, ‘এইভাবে আর কদ্দিন?’
কর্তব্যরত ট্রাফিক সার্জেন্ট, পুলিশ সিগন্যালের ওপর পুরোপুরি ভরসা না করে হাত উঁচিয়ে গাড়ি নিয়ন্ত্রণ করছিলেন। প্রায় ২৫ মিনিট পর ইন্টারকন্টিনেন্টালের দিক থেকে বাংলামোটরের দিকে আসার সিগন্যাল চালু হলো। গাড়িগুলো ধীর গতিতে চলতে চলতে খানিক পরেই থেমে গেল ফেয়ারলি হাউসের কাছে। বাংলামোটর থেকে সোনারগাঁও মোড়, ফার্মগেট, বিজয় সরণি চৌরাস্তার মোড় পুরোটাই যানবাহনে ভরা।
গত ৬ জানুয়ারি থেকে টানা অবরোধ ছাড়াও গতকাল পর্যন্ত পাঁচ দফায় হরতাল দেওয়া হয়েছে। সরজমিন ঘুরে এবং পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শুরুর দিকের হরতালগুলোয় রাজধানীতে যানবাহন চলাচল তুলনামূলক কম ছিল। তবে এ মাসের তিন দফা হরতালে যাত্রীবাহী বাস, কাভার্ড ভ্যান, ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা বেড়ে যায়। বিশেষ করে ৩ ফেব্রুয়ারি থেকে টানা ৩৬ ঘণ্টার হরতালে এবং ৮ থেকে ১০ ফেব্রুয়ারি ৭২ ঘণ্টার হরতালে প্রায় স্বাভাবিক সময়ের মতো যানবাহন রাস্তায় নামে।
গত সোমবার ও মঙ্গলবার রাজধানীর বিভিন্ন স্থান ঘুরে তুলনামূলক বেশি যানবাহন দেখা যায় মতিঝিল, গুলিস্তান, পুরানা পল্টন, তোপখানা রোড, শাহবাগ, এলিফ্যান্ট রোড, মগবাজার মোড়, বাংলামোটর, কারওয়ান বাজার, ফার্মগেট, বিজয় সরণি, আগারগাঁও, শ্যামলী, মিরপুর এলাকায়।
সোমবার বেলা ১১টার দিকে মতিঝিল শাপলা চত্বরে রীতিমতো যানজট ছিল। তবে সেখানে রিকশার ভিড় ছিল বেশি। ভিআইপি সড়ক-গুলোতে রিকশা চলাচল নিষিদ্ধ হলেও সোনারগাঁও হোটেল এলাকা, বিজয় সরণিসহ কিছু এলাকায় তা চলছিল।
বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে গতকাল সকালে হরতাল-অবরোধের নামে মানুষ মারা ও সম্পদ ধ্বংস করার প্রতিবাদে মানববন্ধন করে সরকার-সমর্থক বিভিন্ন সংগঠন। এ জন্য রাজউক এভিনিউ থেকে গুলিস্তান, জিপিও এবং আশপাশের এলাকায় যানজট হয়। তবে বেলা তিনটার দিকেও গুলিস্তান পাতাল মার্কেটের কাছে যানবাহনের ভিড় দেখা যায়।
হরতালে যানজট নিয়ে কথা হয় গত সোমবার দুপুরে ঢাকায় আসা ফেনীর রফিকুল ইসলামের সঙ্গে। বাবার চিকিৎসা উপলক্ষে ঢাকায় এসেছেন। বললেন, বাবা-মা ও বোনকে নিয়ে ওই দিন বেলা আড়াইটার দিকে তিনি বাস থেকে সায়েদাবাদে নামেন। আপাতত গন্তব্য মিরপুর শ্যাওড়াপাড়া। তাঁর ধারণা ছিল, হরতাল বলে রাস্তা ফাঁকা থাকবে। কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছাতে সময় লাগে প্রায় আড়াই ঘণ্টা।
গত দুই দিন সকাল থেকে রাত নয়টা পর্যন্ত যানবাহনের সবচেয়ে বেশি আধিক্য ছিল বিজয় সরণি মোড়, শেরেবাংলা নগর, বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র, আগারগাঁও আইডিবি ভবন এলাকায়।
এসব এলাকায় স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় বাড়তি সময়জুড়ে ট্রাফিক সিগন্যালের চারপাশে প্রচুর গাড়ি থেমে থাকতে দেখা যায়। গতকাল শেষ হওয়া বাণিজ্য মেলার জন্যও যানজট হয় বলে গাড়ির মালিক ও চালকেরা মনে করছেন। চন্দ্রিমা উদ্যানের কাছে গতকাল বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে গাড়িতে বসে ছিলেন শান্তিনগরের বাসিন্দা আবদুন নূর ও তাঁর পরিবার। গাড়ি আর কতক্ষণ থেমে থাকবে—এ নিয়ে বাবাকে বারবার প্রশ্ন করছিল ১২ বছরের বালক খুরশিদ। আবদুন নূর এ প্রতিবেদককে বলেন, হরতাল-অবরোধের জন্য এত দিন মেলায় আসা হয়নি। মেলা শেষ হয়ে যাচ্ছে এবং প্রচুর গাড়ি চলাচল করছে বলে তিনি গাড়ি বের করেছেন। কিন্তু এসে মনে হচ্ছে আরও আগেও আসা যেত।
পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের (পশ্চিম) উপকমিশনার ইমতিয়াজ আহমেদ গতকাল সন্ধ্যায় প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা লক্ষ করছি, প্রচুর গাড়ি চলাচল করছে। সে জন্য স্বাভাবিক সময়ের মতোই ট্রাফিক বিভাগকে কর্মব্যস্ত থাকতে হচ্ছে।’ তিনি বলেন, সম্ভবত মালিকেরা যানবাহন রাস্তায় নামানোর বিষয়টি নিরাপদ বলে মনে করছেন।

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন