চট্টগ্রাম মহানগরের সরকারি সংস্থাগুলোর কাজের মধ্যে কোনো সমন্বয় নেই। নগরের প্রধান দুই সংস্থা চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (সিসিসি) এবং চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) মধ্যে রেষারেষি প্রকট। দলীয় রাজনীতির কারণে নাগরিক পরিষেবাদানকারী সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতা আর দ্বন্দ্বের কোপে পড়ে নগরবাসী সেবা পাচ্ছে না। অথচ অধিবাসীরা কমবেশি সরকারি বিভিন্ন পরিষেবা সংস্থার পাওনা পরিশোধ করে।
‘নগর পরিস্থিতি: বাসযোগ্য চট্টগ্রামের জন্য শাসন ব্যবস্থা’ শীর্ষক গবেষণায় এই চিত্র উঠে এসেছে। গবেষণাটি পরিচালনা করেছে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি)।
মহানগরের বাসযোগ্যতার সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত নাগরিক পরিষেবা যেমন বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস, পরিবহন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনাসহ কয়েকটি বিষয়ের চিত্র তুলে ধরা হয় এই গবেষণায়। গত রোববার গবেষণাটি প্রকাশ করা হয়েছে। গবেষণাটি পরিচালিত হয় এ বছরের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত।
গবেষণার অংশ হিসেবে পরিচালিত সরাসরি জরিপে ১ হাজার ২০০ নগরবাসী অংশ নেয়। এ ছাড়া দলভিত্তিক আলোচনা হয়েছে একাধিক। এভাবে প্রাথমিক তথ্যের সঙ্গে মাধ্যমিক তথ্য (বই, গবেষণা ইত্যাদি) ব্যবহার করে গুণগত ও পরিমাণগত তথ্যের সমন্বয় ঘটানো হয়েছে এই গবেষণায়। স্যানিটেশন, গ্যাস, পানি, গণশৌচাগার, বিদ্যুতের মতো অপরিহার্য নাগরিক পরিষেবা খাতে দুই বছরে তেমন কোনো উন্নতি হয়নি বলে মনে করে বেশির ভাগ নগরবাসী।
সিসিসি ও সিডিএর মধ্যে চরম প্রতিযোগিতা চট্টগ্রামের উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে গবেষণায়। এতে বলা হয়, অর্থের জন্য সরকারের মুখাপেক্ষী সিসিসি। সরকারের বৈষ্যমের কারণে সিসিসির বরাদ্দ কমে যায়। যেমন ২০১২-১৩ অর্থবছরে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের নিজস্ব ও সরকারি বরাদ্দ মিলিয়ে উন্নয়ন বাজেট ছিল ৮১৮ কোটি টাকার। দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৪২০ কোটি টাকা। আর সিসিসির মোট উন্নয়ন বাজেট ছিল ৯৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে রাজস্বই ছিল ৪৬ কোটি টাকা, ৫৩ কোটি টাকা সরকারি অনুদান। এই অর্থবছরে সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রকল্পে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন পেয়েছে ৭২৬ কোটি টাকা। এ সময় সিসিসি এমন কোনো প্রকল্পই পায়নি।
তবে কেবল সরকারের বৈষম্যই নয়, সিসিসি নিজের অর্থের উৎস সক্ষমভাবে পরিচালনা করতে পারে না। গবেষণায় বলা হয়, সিসিসির প্রায় দেড় লাখ ট্যাক্স হোল্ডিংয়ের মধ্যে ১ হাজার ৬৫০টি বিভিন্ন সরকারি সংস্থার। এদের কাছে সিসিসির পাওনা ১৫২ কোটি টাকা।
সরকারি লোক নিয়ন্ত্রিত সিডিএ গত পাঁচ বছরে ৪ হাজার ৪০০ কোটি টাকার সরকারি বরাদ্দ পেয়েছে। অথচ সিসিসিকে নগরের বারইপাড়া থেকে বহদ্দারহাট থেকে খাল খননের জন্য ২৮৯ কোটি টাকা পেতে তিন বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক মইনুল ইসলাম গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, সিসিসির প্রতি সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি অসুস্থ। সিসিসির মেয়র দলীয় লোক না হওয়ায় সরকারি কোনো বরাদ্দই পায় না। অথচ সরকারের আশীর্বাদ থাকায় সিডিএ ব্যাপক বরাদ্দ পাচ্ছে। তিনি আরও বলেন, এখন এমন অবস্থা হয়েছে যে সিসিসির অনেক কাজ করছে সিডিএ।
তবে সিসিসির প্রতি সরকারের কোনো অসন্তোষ নেই—এমন মন্তব্য করেন সিডিএর চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম। গতকাল আওয়ামী লীগের এই নেতা প্রথম আলোকে বলেন, সরকারি বরাদ্দ পেতে যে কৌশল, উদ্যোগ নেওয়া দরকার, তা নেই সিসিসির। তিনি বলেন, সিসিসি পানি নিষ্কাশনের ক্ষেত্রে একটি প্রকল্প পাঠিয়েছিল (বহদ্দারহাট-বারইপাড়া)। সরকার এর বরাদ্দ দিয়েছে। ১০টি দিলে সব কটিরই বরাদ্দ পেত। প্রকল্পটির দীর্ঘসূত্রতার উল্লেখ করে ছালাম বলেন, ‘যথাযথ প্রক্রিয়ায় দিলে এমন হতো না।’
বিআইজিডির গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, ২০ বছর মেয়াদি (১৯৯৫-২০১৫) চট্টগ্রাম নগর মহাপরিকল্পনার মেয়াদ সিংহভাগ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন ছাড়াই শেষ হতে চলেছে। তবে এর দায় নিতে রাজি নন সিডিএর চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, এই পরিকল্পনার মধ্যে বিশেষত পানি নিষ্কাশনের প্রকল্প বাস্তবায়নের দায় ছিল সিসিসির। মোট ১৯টি প্রকল্পের মধ্যে এযাবৎ সিসিসি মাত্র একটি করতে পেরেছে।
একাধিকবার মুঠোফোনে ফোন করে এবং খুদে বার্তা পাঠিয়েও সিসিসির মেয়র মোহাম্মদ মন্জুর আলমের কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
নাজুক নাগরিক পরিষেবা বাসস্থান ও যোগাযোগ
নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য বাসস্থানের সমস্যা প্রকট চট্টগ্রামে। নগরের ৪৯ শতাংশ পরিবার মনে করে, ভাড়া বাড়ি অপর্যাপ্ত। ৬০ শতাংশ নিম্ন আয়ের মানুষের বাড়ি খারাপ বা বসবাসের অযোগ্য।
গবেষণায় দেখা যায়, নগরের ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ যানবাহন হলো সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও রিকশা। বিআরটিএ, সিসিসি ও চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) মধ্যে সমন্বয়ের অভাবে বিপুল পরিমাণ অনিবন্ধিত রিকশা নগরের যোগাযোগকে স্থবির করে ফেলেছে।
পানি ও পয়োনিষ্কাশন: গবেষণায় দেখা গেছে, চট্টগ্রাম মহানগরের ৮৪ শতাংশ পরিবার তাদের পানির বিল পরিশোধ করে। অথচ চট্টগ্রাম ওয়াসার কাছে পানিসংক্রান্ত কোনো অভিযোগ করলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সংস্থাটি ব্যাপক কালক্ষেপণ করে। জরিপে দেখা যায়, ৭৯ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, সমস্যার সমাধানে কয়েক দিন এমনকি মাস পেরিয়ে যায়। ১৮ শতাংশ বলেছেন, সমস্যার কোনো সমাধানই হয় না। মাত্র ৩ শতাংশ উত্তরদাতা দ্রুত সমাধান পান বলে জানান। নগরের মোট চাহিদার মাত্র ৪০ ভাগ পানি সরবরাহ করে ওয়াসা। এ ছাড়া চট্টগ্রামে স্যানিটেশনের ব্যবস্থাটি একেবারে উপেক্ষিত। নগরে এখন পর্যন্ত কোনো পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। চট্টগ্রামে বস্তিগুলোতে একটি পায়খানা ১৯ জন ব্যবহার করে।
চাহিদার তুলনায় পানির এই অপ্রতুলতার কথা স্বীকার করে চট্টগ্রাম ওয়াসার সচিব মো. শামসুদ্দোহা প্রথম আলোকে বলেন, ‘পানি সরবরাহের ক্ষমতা আমাদের নেই। তবে তিনটি প্রকল্প চলছে। এতে আগামী দুই বছরের মধ্যে ৭০ ভাগ চাহিদা মেটানো যাবে।’
নগরের পয়োনিষ্কাশনের অব্যবস্থাপনার বিষয়ে শামসুদ্দোহার মন্তব্য, ১৯৬৩ সাল থেকে কাজ করলেও এখন পর্যন্ত ওয়াসার পয়োনিষ্কাশনের কোনো সক্ষমতা নেই। এটি হতে সময় লাগবে।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: গবেষণায় দেখা যায়, নগরের ৩০ শতাংশ বর্জ্য সংগ্রহ করা হয় না। মাত্র ২ শতাংশ বর্জ্য রিসাক্লিং (আবার ব্যবহার উপযোগী) করা হয়। কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে সবচেয়ে বড় পরিবেশগত সমস্যা বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। বর্জ্য কমানো ও একে পুনর্ব্যবহারের ক্ষেত্রে কোনো ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি।
দূষণ: পানি, বায়ু ও শব্দদূষণের কারণে নগরবাসী নানা অসুখে আক্রান্ত হয়। শিল্পকারখানা এবং যান্ত্রিক পরিবহন নগরের বায়ুদূষণের প্রধান উৎস। পাঁচ ভাগের এক ভাগ নাগরিক মনে করে, শব্দদূষণ স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন