বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত সম্মেলনের তৃতীয় দিন গতকাল বুধবার আলোচকদের বক্তব্যে উঠে আসে এসব কথা। তাঁদের দৃষ্টিতে, সংস্কৃতির সংকটের মূলে রয়েছে সমন্বয়হীনতা। দেশের রাজনৈতিক দলগুলো সবকিছুতে শুধু নিজেদের এজেন্ডাই বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে।
‘বাংলাদেশের পঞ্চাশ বছর: অতীতে দৃষ্টিপাত ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা’ শীর্ষক সিপিডির এই ভার্চ্যুয়াল সম্মেলনের তৃতীয় দিনের দ্বিতীয় অধিবেশন ছিল ‌‘সংস্কৃতি’ বিষয়ে। আয়োজনের চেয়ারপারসন ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ এশিয়া কর্মসূচির পরিচালক ইফতেখার দাদি।

দুই ঘণ্টার এ সম্মেলনে চারজন তাঁদের গবেষণাপত্র উপস্থাপন করেন। আলোচনার শুরুতে বক্তব্য দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‌‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব রিসার্চ ইনস্টিটিউট ফর পিস অ্যান্ড লিবার্টি’র পরিচালক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ফখরুল আলম।‌‘শাহবাগ, শাপলা চত্বর এবং বাংলাদেশের দ্বিধাগ্রস্ত, প্রতিবাদী মানসিকতা’ প্রসঙ্গে আলোচনায় তিনি বলেন, ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদের ফলে যে সংকট তৈরি হচ্ছে, এর উদাহরণ ২০১৩ সালে শাহবাগ আন্দোলন শুরুর পরই সে বছরের মে মাসে শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের নিজেদের অস্তিত্ব জানান দেওয়ার চেষ্টা। এর পর থেকে তা বাড়তে থাকে। শহীদ মিনার অবমাননা, ভাস্কর্যে হামলা, বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য অপসারণ তৎপরতার মতো ঘটনাগুলো ঘটে। জাতীয় পরিচয় নিয়ে মানুষের মনে তৈরি হওয়া দ্বন্দ্ব দূর করতে হলে ১৯৭২ সালে প্রণীত সংবিধানের জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতা অটুট রাখার বিকল্প হয় না বলে জানান অধ্যাপক ফখরুল আলম।

সম্মেলনের এ পর্বে সংস্কৃতির বিবর্তন নিয়ে আলোচনা করেন ইউ ল্যাব ইউনিভার্সিটির ইংলিশ অ্যান্ড হিউম্যানিটিজ (ইংরেজি ও মানবিক) বিভাগের অধ্যাপক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। তিনি বলেন, গত ৫০ বছরে বাংলাদেশের সংস্কৃতির নানা ধাপে পরিবর্তন হয়েছে। তবে সংস্কৃতি সব সময়ই বহুধাবিভক্ত। সংস্কৃতির কিছু পরিচয় থাকে। এ দেশের সংস্কৃতি ছিল অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমন্বয়ধর্মী। তাতে নান্দনিকতা ও নৈতিকতার সম্পর্ক ছিল।
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেন, বর্তমান সংস্কৃতির গতিপ্রকৃতি উদ্বেগ তৈরি করছে। কেননা, শিক্ষা ও সংস্কৃতির মধ্যে বিরোধ বাড়ছে। বিশেষ করে ভিজ্যুয়াল মাধ্যম চলে আসার পর সাংস্কৃতিক পরিবর্তন ঘটছে খুব দ্রুত। ধর্ষণ, মানব পাচার, তরুণদের বিভিন্ন নেতিবাচক ঘটনাগুলো দৃশ্যমান হচ্ছে বেশি। এর অন্যতম কারণ, রাজনৈতিক দলগুলো সবকিছুতে শুধু নিজেদের এজেন্ডাই বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে। যার কণ্ঠস্বর যত জোরে শোনা যায়, তার কথাই পৌঁছাচ্ছে মানুষের কাছে। তিনি বলেন, প্রযুক্তির জন্য সামাজিক অবক্ষয় হচ্ছে, এ ধারণাকে সরাসরি দোষারোপ করা যাবে না। বরং এর সঠিক ব্যবহারের জন্য বরং পাঠ্যপুস্তকেও অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেন তিনি।

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেন, ষাটের দশকেও মানুষের জাতীয় পরিচয় ও ধর্মীয় পরিচয়ের মধ্যে সংকট তৈরি হয়নি। বর্তমানের সমস্যার সমাধান কোনো কিছু বাদ দিয়ে নয়, বরং সঠিকভাবে গ্রহণ ও ব্যবহারের মধ্যেই সম্ভব বলে মনে করেন তিনি। শিক্ষাই একমাত্র সব বদলে দিতে পারে। আর শিক্ষার সঙ্গে সংস্কৃতির বিরোধ বজায় থাকলে জাতীয়তাবাদ নিয়ে মানুষের মনে যে দ্বন্দ্ব, এর সমাধান হবে না। ফলে শিক্ষা ও সংস্কৃতির মধ্যে সম্পর্ক তৈরি করতে হলে বুঝতে হবে প্রযুক্তিকে উৎপাদনশীলতায় ব্যবহারের নিয়ম।

বাংলাদেশের নগরায়ণে স্থাপত্যশৈলীর পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা করেন বেঙ্গল ইনস্টিটিউট অব আর্কিটেকচার, ল্যান্ডস্কেপ অ্যান্ড সেটেলমেন্টের মহাপরিচালক কাজি খালেদ আশরাফ। তিনি বলেন, ‘ঢাকা শহরের অপরিকল্পিত নগরায়ণ বদ্বীপ ব্যবস্থাপনার মধ্যকার পার্থক্য দিন দিন আরও বেশি স্পষ্ট হচ্ছে। নগরে মাটি, পানি ও জলবায়ুর প্রসঙ্গগুলো বিবেচনা না করেই স্থাপত্য তৈরি হচ্ছে। অথচ মধ্য আধুনিক সময়কালে বিশ্বের স্থাপত্য ইতিহাসে বাংলাদেশের স্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ জায়গা আছে। লুই আইকানের স্থাপত্যের উদাহরণ থেকে শুরু করে স্থপতি মুজহারুল ইসলামের তৈরি আবহাওয়া ও পরিবেশের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ স্থাপনাগুলোর কথা বলতে পারি আমরা। বাংলাদেশের নগরের বর্তমানের অপরিকল্পিত স্থাপনা প্রমাণ করছে, জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে আমাদের ভাবনা একেবারেই নেই।’

সম্মেলনে সমকালীন চিত্রকলা ও আলোকচিত্র নিয়ে আলোচনা করেন বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের আর্টস প্রোগ্রামের প্রধান কিউরেটর তানজিম ওহাব। আলোচকদের উপস্থাপনার পর শুরু হয় যুক্তি খণ্ডন ও প্রশ্নোত্তর পর্ব। এ পর্বে আলোচনা করেন যুক্তরাষ্ট্রের গ্র্যান্ড ভ্যালি স্টেট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক আজফার হোসেন। আলোচনা করেন যুক্তরাষ্ট্রের দ্য ক্যাথলিক ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক আদনান জেড মোরশেদ। সম্মেলনে সংস্কৃতি নিয়ে আলোচনা পর্বে উপস্থিত ছিলেন সিপিডির সভাপতি রেহমান সোবহান এবং বোর্ড অব ট্রাস্টিজের সদস্য রওনক জাহান। এ পর্বের সহযোগিতায় ছিল যুক্তরাষ্ট্রের কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন