১৭ ডিসেম্বর ২০১৪, প্রথম আলোর আয়োজনে ‘রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে নারীর অংশগ্রহণ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত আলোচকদের বক্তব্য সংক্ষিপ্ত আকারে এই ক্রোড়পত্রে প্রকাশিত হলো

default-image

আলোচনা

আব্দুল কাইয়ুম: বাংলাদেশের নারীরা উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছেন। দেশের প্রধানমন্ত্রী, প্রধান বিরোধী দলের নেতা ও জাতীয় সংসদের স্পিকার নারী। জাতীয় সংসদে নারীদের জন্য ৫০টি আসন আছে। এসব অর্জন আমাদের আশাবাদী করে। কিন্তু এখনো রাজনৈতিক দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারীদের তেমন অংশগ্রহণ নেই। ইউনিয়ন থেকে জেলা পর্যায় পর্যন্ত প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যনির্বাহী কমিটিগুলোতে ১ থেকে ২ শতাংশ নারী আছেন।

 নির্বাচন কমিশনের গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী, ২০২০ সালের মধ্যে দলের সব কমিটিতে কমপক্ষে ৩৩ শতাংশ নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। আওয়ামী লীগ-বিএনপির গঠনতন্ত্রেও এ লক্ষ্য পূরণের কথা বলা হয়েছে। এসব বিষয়ে আজকের আলোচনা। এখন আলোচনা করবেন কে টি ক্রোক।

কে টি ক্রোক: আমরা ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল থেকে ‘নারীর জয়ে সবার জয়’ ক্যাম্পেইন পরিচালনা করি। আমাদের ক্যাম্পেইনের মূল উদ্দেশ্য এ দেশের রাজনৈতিক দল ও নারীদের সহায়তা দেওয়া। শুরু থেকে এ পর্যন্ত আমরা সারা দেশে প্রায় ১০ হাজার সম্ভাবনাময়ী যোগ্য নারী নেতৃত্বের সঙ্গে কাজ করেছি। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, যে সমাজে নারী ও পুরুষ উভয়েই যখন নিজেদের জীবন গঠন ও সমাজে অবদান রাখার বিষয়ে স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ পান, তখন সেই সমাজের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়। এ জন্য গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নাগরিকদের জীবনমান উন্নয়নের জন্য নারী-পুরুষ উভয়ের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সুযোগ থাকা অত্যন্ত জরুরি। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারীদের প্রয়োজনীয় উপস্থিতি নেই। দলগুলোর তৃণমূলের কার্যনির্বাহী কমিটিগুলোতে মাত্র ১ থেকে ২ শতাংশ নারী আছেন। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ২০০৯–এর (সংশোধিত) ৯০বি নম্বর ধারা অনুযায়ী, ২০২০ সালের মধ্যে কেন্দ্রীয় কমিটিসহ রাজনৈতিক দলগুলোর সব কমিটিতে নারীদের জন্য কমপক্ষে ৩৩ শতাংশ আসন নিশ্চিত করতে হবে। এর ফলে বাংলাদেশে নারীর রাজনৈতিক নেতৃত্বকে আরও সামনে এগিয়ে নেওয়ার একটি সুবর্ণ সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

২০১৪ সালের চলমান কাউন্সিল–প্রক্রিয়া প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ বাস্তবায়নের একটি অনন্য সুযোগ। আমরা কিছু কিছু কাউন্সিল থেকে খুবই উৎসাহব্যঞ্জক ফল জানতে পারছি। ৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের রাজশাহী জেলা কমিটিতে ২০ শতাংশ নারী নির্বাচিত হয়েছেন। এ কমিটিতে আগে মাত্র ২ শতাংশ নারী সদস্য ছিলেন। অন্যদিকে গত ১৬ নভেম্বর বিএনপির ১৫১ জন সদস্যবিশিষ্ট সৈয়দপুর জেলা কমিটিতে ৩০ জন অর্থাৎ ২০ শতাংশ নারী নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ১০ জন কার্যনির্বাহী পদ পেয়েছেন। ২০ জন সাধারণ সদস্য পদে নির্বাচিত হয়েছেন। এই একই কমিটিতে আগে মাত্র ২ শতাংশ নারী সদস্য ছিলেন। আজ পর্যন্ত ‘নারীর জয়ে সবার জয়’ ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে চার হাজারের বেশি নারী বিভিন্ন রাজ​ৈনতিক দলের তৃণমূল কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন।

এসব উদ্যোগ প্রমাণ করে যে রাজনৈতিক দলগুলোর তৃণমূল কমিটিগুলোতে এখনই কমপক্ষে ২০ শতাংশ নারী অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব। বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলার নেতাদের সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের কথা হয়েছে। নারীর রাজনৈতিক নেতৃত্ব বৃদ্ধির ক্ষেত্রে তঁাদের আগ্রহ ও উদ্যোগ আমাকে আশাবাদী করেছে। ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনালের নিজস্ব গবেষণা থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ৭৩ শতাংশ বাংলাদেশি নাগরিক রাজনীতিতে নারীর ভূমিকার আরও সম্প্রসারণ দেখতে চান। চলমান কাউন্সিল–প্রক্রিয়া প্রমাণ করবে রাজনৈতিক দলগুলো আরপিও আইন বাস্তবায়নে এবং নারীর রাজনৈতিক নেতৃত্ব বৃদ্ধিতে কতটা আন্তরিক।

এ টি এম শামসুল হুদা: ২০০৮ সালে আমরা সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা করেছিলাম। সে আলোচনায় সবাই একমত হয়েছিলাম যে রাজনৈতিক দলের কমিটিগুলোতে কমপক্ষে ৩৩ শতাংশ নারী থাকবেন। প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো তাদের গঠনতন্ত্রে এটা অন্তর্ভুক্ত করেছিল। অর্থাৎ এ ক্ষেত্রে তাদের একটা অঙ্গীকার ছিল। কিন্তু ২০০৮ সাল থেকে আজ পর্যন্ত রাজনৈতিক দলগুলোয় ৩৩ শতাংশ নারীর অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে কোনো অগ্রগতি হয়নি। দলগুলো দলের হিসাব দেয়নি। অনেকে বলেন, এদের রেজিস্ট্রেশন বাতিল করেন না কেন? এটা বলা সহজ। কিন্তু বাস্তবে করা যায় না। এ দেশে আওয়ামী লীগ, বিএনপি বাদ দিয়ে কোনো রাজনীতি হবে? তাই অনেক কিছু আমরা করতে পারি না।

একইভাবে রাজনৈতিক দলগুলোয় ৩৩ শতাংশ নারীর অংশগ্রহণের বিষয়টিও হলো না। আমরাই প্রথম রাজনৈতিক দলের কমিটিতে ৩৩ শতাংশ নারীর অংশগ্রহণকে আরপিওতে (গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ) অন্তর্ভুক্ত করি। আমাদের সময়ই প্রথম রাজনৈতিক দলগুলোর রেজিস্ট্রেশন হয়। আমরা উপজেলা আইন সংশোধন করেছিলাম। উদ্দেশ্য ছিল জাতীয় নির্বাচন ও উপজেলা নির্বাচন একসঙ্গে করা। এই সংশোধনের সময় আমরা একটি বিশেষ কাজ করলাম। সেটা হলো একজন মহিলা ভাইস চেয়ারম্যানের পদ সৃষ্টি করলাম।

মহিলা ভাইস চেয়ারম্যানরা সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হবেন। আবার নারীরা পেছনের সারিতে বসে বাড়িতে চলে গেলেন, তা হলে হবে না। নারীদের ক্ষমতা দিতে হবে। তঁারা যেন অনুভব করেন সিদ্ধান্ত গ্রহণ–প্রক্রিয়ায় তঁাদের ক্ষমতা আছে। ক্ষমতার জায়গাগুলোতে তঁাদের আনতে হবে। ২০০৮ সালে আমরা নিচের স্তরে মনোনয়ন দেওয়ার বিষয়টি আরপিওতে এনেছিলাম। এ ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ কিছুটা কাজ করলেও অন্যরা করেনি। পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগও এখান থেকে সরে এসেছে। ফলে যঁারা দীর্ঘকাল আন্দোলন-সংগ্রাম করেছেন, জেল খেটেছেন, ছোট পদ থকে ধীরে ধীরে ওপরে উঠেছেন, তঁারা নমিনেশন পান না। হঠাৎ ভুঁইফোড় একজন, যঁার পেশিশক্তি আছে, অঢেল অর্থ আছে, তঁারা নমিনেশন পান। এ জন্য রাজনৈতিক দলের ত্যাগী নেতা-কর্মীসহ নারীরাও ভীষণভাবে হতাশ হন। ভলো মানুষেরা ভাবতে থাকেন এখানে এসে কোনো লাভ নেই। রাজনৈতিক দলগুলোকে এ আচরণ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। নারীদের অন্তর্ভুক্তিসহ সুযোগ-সুবিধা ও ক্ষমতা দিতে হবে।

নূরজাহান বেগম মুক্তা: রাষ্ট্রের সব গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকে শুরু করে সব ক্ষেত্রে নারীর সগর্ব পদচারণ। নারীরা আজ কোথায় নে​ই? বিমান চালনা থেকে শুরু করে আর্মি, পুলিশ, বিডিঅার—সব ক্ষেত্রে নারীদের সফল উপস্থিতি। শিক্ষায় তারা পুরুষের চেয়ে এগিয়ে। আমাদের এখন সম্মেলন চলছে। কমিটি হচ্ছে। কোনো কোনো জায়গায় ১৮ শতাংশ পর্যন্ত নারী কমিটিতে আছেন। নির্বাচন কমিশনের আরপিও অনুসারে, ২০২০ সালের মধ্যে ৩৩ শতাংশ নারী কমিটিতে নিতে পারব বলে মনে করি। জাতীয় বা স্থানীয় নির্বাচনে তঁারা যখন দেখেন নির্বাচনে তঁাদের প্রতিনিধি খুবই কম বা একেবারে নেই, তখন স্বাভাবিকভাবেই তাঁরা হতাশ হন। অথচ তিনি জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। এভাবে নারী আশাহত হচ্ছেন। আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনাসহ দলের অন্যান্য কেন্দ্রীয় নেতারা সব সময় চান দলের কমিটিগুলোতে বেশি করে নারীর অংশগ্রহণ থাকুক। কিন্তু তৃণমূল পর্যায়ে এটি দেখা যায় না। নারীরা কমিটিতে আসতে চান না, তাঁরা অদক্ষ, সময় দিতে পারেন না—এসব সস্তা অজুহাত দেখিয়ে নারীদের দূরে রাখা হয়। আমাদের জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন পর্যায়ে এভাবে নারীদের কমিটিতে রাখা হচ্ছে না। আবার নারীদের কমিটিতে আনলেই হবে না। তাঁদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে, দক্ষতা অর্জনে, কাজকর্মে সহযোগিতা করতে হবে। উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যানসহ অনেক ক্ষেত্রে নারীরা তাঁদের ক্ষমতা চর্চা করতে পারছেন না। নারী স্বাধীনভাবে কাজ করতে না পারলে তাঁর নেতৃত্ব বিকশিত হবে না। ভোটে নির্বাচিত নারীদের অবস্থাও যে খুব ভালো, তা কিন্তু নয়। প্রার্থী নির্বাচনে তৃণমূল পর্যায়ে ভোট হয়। সে ভোটে কোনো নারী হয়তো সবচেয়ে বেশি ভোট পেয়েছেন। কিন্তু তৃণমূল থেকে তাঁকে চার-পাঁচ নম্বরে রাখা হয়। আমাদের তৃণমূল নেতৃত্বের মানসিকতা ও আচার-আচরণের আমূল পরিবর্তন দরকার। ৩৩ শতাংশ নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য প্রতিটি জেলা, উপজেলায় তদারককেন্দ্র থাকতে হবে।

কেন্দ্রীয়ভাবে রাজনীতিতে মনিটরিং সেল থাকতে হবে। সারা দেশে যখন কমিটি হবে, তখন কেন্দ্র জেলা, জেলা উপজেলা, উপজেলা ইউনিয়নগুলোকে তদারক করবে যে ৩৩ শতাংশ নারী কমিটিতে আছেন কি না। এভাবে এগোতে পারলে ২০২০ সালের মধ্যেই রাজনীতিতে ৩৩ শতাংশ নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে।

 শিরীন সুলতানা: অনেকে বলেন, দেশের প্রধানমন্ত্রী নারী। তাই আপনাদের আর কী সমস্যা? কিন্তু প্রধানমন্ত্রী নারীদের প্রতিনিধিত্ব করেন না। তিনি দেশের মানুষের প্রতিনিধিত্ব করেন। ১১ ডিসেম্বর আমাদের জেলা প্রতিনিধি, মহাসচিবসহ সবাই ৩৩ শতাংশের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছি। আমাদের দলের কমিটিগুলোতে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেছি। ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল এ ক্ষেত্রে আমাদের সহযোগিতা করেছে। একজন নারীর যত যোগ্যতা থাকুক, অভিজ্ঞতা থাকুক, ভালো কর্মী হোক—এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজ তাঁকে মূল্যায়ন করছে না। রাষ্ট্রে, সমাজে, পরিবারে—সব ক্ষেত্রে এ বৈষম্য থাকছে। পুরুষদের মানসিকতার পরিবর্তন না হলে নারীরা বাধাগ্রস্ত হতে থাকবেন। প্রথমে রাজনৈতিক দলের মধ্যে এটি চর্চা করতে হবে। শামসুল হুদা সাহেবদের কমিশনকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। তারা দেখেছে দেশের অর্ধেক নারী। তারাই বাংলাদেশে প্রথম নারীদের গুরুত্ব অনুভব করেছে। তাই তারা আরপিওতে ৩৩ শতাংশ নারী রাজনীতিতে অংশগ্রহণের মতো একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অন্তর্ভুক্ত করেছে। নূরজাহান মুক্তা মনিটরিংয়ের মতো একটি খুব প্রয়োজনীয় বিষয়ের কথা বলেছেন।

 শামসুল হুদার নির্বাচন কমিশন যদি মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা করত, সেটি হতো একটি কার্যকর উদ্যোগ। রাজনৈতিক দলের পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনেরও কিছু উদ্যোগ নিতে হবে। তাহলে নারীরা বেশি সুবিধা পাবেন। নারীদের নমিনেশন দেওয়া হয় না। কারণ, তাঁদের পেশিশক্তি ও অর্থকড়ি নেই। এখন রাজনীতির মানদণ্ড হয়েছে পেশিশক্তি ও টাকাপয়সার মধ্যে। এ অবস্থা চলতে থাকলে নারীরা কখনোই সামনে আসতে পারবেন না। শেষে বলতে চাই, রাজনৈতিক দলগুলোর মানসিকতা, আচরণ ও সর্বোপরি দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন আনতে হবে।

তানিয়া হক: বাংলাদেশের রাজনীতি পুরুষ কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত। সব ক্ষেত্রে পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। নারী পরিণত হচ্ছেন দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে। কিন্তু এখন নারীর সম–অধিকার, সমমর্যাদা সময়ের দাবি। এ দাবি প্রতিষ্ঠার জন্য রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের কোনো বিকল্প নেই। আমরা গর্বিত যে বড় দুটি রাজনৈতিক দলের প্রধান ব্যক্তি নারী। একই সঙ্গে লজ্জিত যে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর অংশগ্রহণ কম। নারীর এই দুর্বল উপস্থিতির মধ্য দিয়ে যে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হয়, তা কতখানি গণতান্ত্রিক। দীর্ঘ পাঁচ বছর পর একবার ভোট প্রদানেও প্রশ্ন আছে। নারী কি স্বাধীনভাবে ভোট দেন, না বাড়ির পুরুষের মতামত অনুসারে ভোট দেন? সংসদে নারীদের সংরক্ষিত আসনের ব্যবস্থাটি সম্পূর্ণ ত্রুটিপূর্ণ। এটি নারীর প্রতীকী অবস্থান ছাড়া আর কিছু নয়। এ ক্ষেত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের বাইরের প্রতিনিধি আসার সুযোগ থাকে না। তাঁদের সংসদীয় কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয় না। তাঁদের কোনো নির্বাচনী এলাকা নেই। ভোটে নির্বাচিত না হওয়ায় নারীসহ অন্যদের স্বার্থসংরক্ষণে দায়বদ্ধতা থাকে না। সংরক্ষিত আসনের সাংসদদের মূল দায়িত্ব হলো সংসদে কোরাম পূরণ করা। বিল পাস করা। ভোটাভুটির সময় হাত তোলা। তাঁরা নারী হয়েও নারী ইস্যুতে কথা বলছেন না।

তাঁদের মনে কি প্রশ্ন জাগে না যে কেন ১৫ শতাংশ হারে নারী নির্যাতন বাড়ছে? কেন নারী গৃহে নির্যাতিত হচ্ছেন। কেন ধর্ষণের পর নারীকেই প্রমাণের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়? কেন পুরুষকে প্রমাণ করতে হয় না যে তিনি ধর্ষক নয়? আর কত দিন নারী, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র দ্বারা বৈষম্যের শিকার হবেন? কেন নারী সাংসদেরা সংসদে এসব প্রশ্ন তোলেন না? বর্তমানে ৭১ জন সচিবের মধ্যে মাত্র তিনজন নারী। কেন নারী লিঙ্গবৈষম্য মজুরির শিকার?

যোগ্যতার ভিত্তিতে সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমে নারীকে মূলধারায় আনতে হবে। তাহলেই আত্মবিশ্বাসী নারী দলের পক্ষে নয়, মানুষের কল্যাণে কথা বলবেন। সত্যি কথা বলতে, নারীর নয়, জনগণের নয়, দলের ক্ষমতায়ন ঘটছে। নারীর সমস্যা আরও টেকসই হচ্ছে। রাজনৈতিক দলগুলো নারীর দাবিকে মানুষের দাবিতে পরিণত করতে পারে।

দিলারা চৌধুরী: আমাদের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো প্রাণহীন। তারা টিকে থাকার জন্য বিভিন্ন রং-রূপ ধারণ করে। কিন্তু সত্যিকার অর্থে তারা কার্যকর না। অনেকেই দেশে জঙ্গি কার্যকলাপ চালানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল একটা জরিপ করেছে। জরিপে দেখা গেছে, ৭৩ শতাংশ মানুষ নারীকে রাজনীতিতে দেখতে চান। এ প্রগতিশীল চেতনা দেশে জঙ্গি কার্যকলাপ হতে দেবে না। অরেকটা বিষয় হলো নারীর উপস্থিতি যত বাড়বে, দেশে মৌলবাদী শক্তি তত দুর্বল হবে। এটাও আমাদের একটা সুযোগ। আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ সব রাজনৈতিক দলের উচিত বেশি করে নারীদের রাজনীতিতে আনা। রাজনৈতিক দলগুলো সেতু হিসেবে কাজ করে। নেতা-কর্মী তৈরি করে। বিশ্বের রাজনৈতিক দলগুলোর উদ্দেশে্য ২০১২ সালে জাতিসংঘে একটি রেজল্যুশন পাস করা হয়। এ রেজল্যুশনে রাজনৈতিক দলের মধ্যে নারীদের অন্তর্ভুক্ত ও তাঁদের কাজ করার ক্ষেত্রে যে বাধা সৃষ্টি হয়, তা দূর করার কথা বলা হয়।

রাজনৈতিক দলের মধ্যে যেসব নারী আছেন, তাঁরা পুরুষের চিন্তাচেতনার বাইরে যেতে পারেন না। আমার এক বন্ধু একটি বড় দলের দীর্ঘকালের ত্যাগী, সংগ্রামী, প্রতিষ্ঠিত রাজনীতিবিদ। তাঁকে বললাম, আপনারা ক্ষমতায় এসেছেন। নারীদের অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ আছে। কিছু কাজ করেন। তিনি বললেন, দিলারা, এটা ভোটের রাজনীতি, বুঝবেন না। নেত্রী যখন ভোটের রাজনীতি করেন, তখন তিনি যে পদেই থাকেন কেন, নারীদের কথা ভাবেন না।

 জাতীয় সংসদে বেশি নারী থাকলে সেটা হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক সংসদ। নারীর প্রতি বৈষম্য ও সহিংসতা অনেক কমে যাবে। নারীর উন্নয়ন হলে সমাজের ব্যাপক উন্নয়ন হবে। আমাদের বড় দলগুলো নিজেদের ইচ্ছায় নারীর উন্নয়ন করে না। এরা দাতা সংস্থা ও বিভিন্ন চাপে লোক দেখানোর মতো কিছুটা করে। পুরুষের ধারণা হলো, নারীরা দুর্বল, কম বোঝেন, মাথায় কোনো বুদ্ধি নেই। নারীকে নিয়ে কিছু নেতিবাচক প্রবাদও রয়েছে। নারীর রাজনীতিতে অংশগ্রহণের সবচেয়ে বড় বাধা পুরুষের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি। যত দিন পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হবে না, তত দিন নারীর উন্নয়ন হবে না। তাই পুরুষকে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন আনতে হবে।

 নূহ-উল-আলম লেনিন: ২০০৮ সালে নির্বাচন কমিশন গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ দেয়। নির্বাচন কমিশনের আদেশ বড় রাজনৈতিক দলগুলো মেনে নেয়। কিন্তু এ আদেশের মধ্যে একটা দুর্বলতা ছিল। তারা বড় রাজনৈতিক দলগুলোকে বলল, রাজনৈতিক দলের বিভিন্ন স্তরে ৩৩ শতাংশ নারীর অংশগ্রহণ থাকবে। নির্বাচন কমিশন বলেনি সংসদে ও সমাজের প্রতি ক্ষেত্রে ৩৩ শতাংশ নারীর অংশগ্রহণ থাকবে। ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু সংসদ। সংসদে সংসদে ৩৩ শতাংশ নারী অংশগ্রহণের বাধ্যবাধকতা থাকতে হবে। কেন এই বাধ্যবাধকতা নির্বাচন কমিশন দিল না? নরডিক দেশগুলোতে ৪১ শতাংশ নারীর অংশগ্রহণ আছে। বিশ্বের পার্লামেন্টগুলোয় গড়ে ২১ শতাংশ নারীর অংশগ্রহণ আছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোয় নারীর অংশগ্রহণ প্রায় ২১ শতাংশ। আওয়ামী লীগ এ ক্ষেত্রে আরও এগিয়ে আছে। আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়ামে ৩৩ শতাংশ নারী। জোহরা তাজউদ্দীন প্রয়াত হওয়ায় এখন ৩০ শতাংশ হয়েছে। অন্য কমিটিগুলোতে আমাদের এ প্রচেষ্টা আছে। সংসদ থেকে শুরু করে স্থানীয় পর্যায়ের সব স্তরে আমরা ৩৩ শতাংশ নারীর অংশগ্রহণ চাই। আমাদের এ চেষ্টা আছে। এ লক্ষ্য পূরণ করতে হলে রাজনৈতিক দলের মধ্যে যেসব নারী সদস্য আছেন, সবাইকে আওয়াজ তুলতে হবে। পুরুষ দয়া করে দেবেন, এ জন্য অপেক্ষা করলে হবে না। বিদেশি তহবিলের টাকায় কিছু এনজিও মাঠে বক্তৃতা দিলেও হবে না।

নারীদের নিজেদের দিক থেকে এ ক্ষেত্রে মাঠে নামতে হবে। নির্বাচন কমিশনকে বলতে হবে তারা সংসদসহ সব ক্ষেত্রে ৩৩ শতাংশ নারীর অংশগ্রহণ চায়। কেবল রাজনৈতিক দলে চাইলে ৩৩ শতাংশের কথা বললে পুরো বিষয়টি অসম্পূর্ণ থেকে যায়। কেন একমাত্র রাজনৈতিক দলে ৩৩ শতাংশ নারীর সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা থাকবে। পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র, অফিস, আদালত—এসব ক্ষেত্রে নারী কতটা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারছেন?

এসবের জন্য নারীকেই সংগ্রাম করতে হবে। বাংলাদেশের নারীর অগ্রগতি বিস্ময়কর। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে আমাদের অবস্থা ভালো। নারীর রাজনী‌িততে অংশগ্রহণের জন্য নারী-পুরুষ উভয়কেই কাজ করতে হবে। রবীন্দ্রনাথের ঘরে বাইরে-এর মতো ঘরে-বাইরে দুই জায়গাতেই কাজ করতে হবে। আমার একটা ব্যক্তিগত অভিমত হলো, যদি প্রতিটি দলের ২০-২৫ বা ৩৩ শতাংশ আসনে নারীদের মনোনয়ন দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হলে সংরক্ষিত আসনের প্রয়োজন হবে না। এ ক্ষেত্রে নারীরা সরাসরি নির্বাচিত হবেন এবং বর্তমান সংখ্যার চেয়ে বেশি হবে।

সেলিমা রহমান: দু​টি গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য শামসুল হক সাহেবের নির্বাচন কমিশনকে ধন্যবাদ জানাই। এক. গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ-২০০৮। দুই. উপজেলায় মহিলা ভাইস চেয়ারম্যানের পদ সৃষ্টি। এ দু​িট কাজের সুফল কমবেশি যা হোক বাংলাদেশ পাচ্ছে। তাদের গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের ফলে আমাদের কমিটিগুলোতে নারীরা আসছেন। নতুন কমিটিগুলোতে আগের তুলনায় নারীদের অংশগ্রহণ বেশি হচ্ছে। তবে জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন পর্যায়ে এটা ভালো হচ্ছে না। ভাইস চেয়ারম্যানের পদ সৃষ্টি হওয়ায় অনেক যোগ্য নারীকে আমরা দেখতে পেয়েছি। এ দু​িট ভালো কাজ শামসুল হক সাহেব করেছেন।

 এখন নারীরা রাজনৈতিক দলে তাঁদের যোগ্যতা দিয়ে আন্দেলন-সংগ্রাম করেই আছেন। কেউ তাঁদের জায়গা ছেড়ে দেননি। অনেক জায়গায় মহিলা সাংসদেরা পুরুষ সাংসদদের জন্য এলাকায় কাজ করতে পারেন না। রাজনীতিতে অর্থ ও পেশিশক্তির অনুপ্রবেশ ঘটেছে। প্রতিটি দল চায় যেকোনো মূল্যে ক্ষমতায় যেতে। রাজনৈতিক দলগুলো মনে করে, অর্থ ও পেশিশক্তি ক্ষমতা এনে দিতে পারবে।

 মনোনয়ন দেওয়ার সময় যাঁর অর্থ আছে, পেশিশক্তি আছে, তাঁকেই মনোনয়ন দেওয়া হয়। নারী যতই যোগ্য হন না কেন, তাঁকে মনোনয়ন দেওয়া হয় না। আবার মনোনয়ন পেয়ে যদি একবার কোনো নারী পাস করতে না পারেন, তাঁকে আর কখনো মনোনয়ন দেওয়া হয় না। মনে করা হয়, তিনি যেহেতু নারী, সেহেতু তিনি আর পাস করতে পারবেন না। অথচ একজন পুরুষ তিন-চারবার ব্যর্থ হলেও আবার তাঁকে মনোনয়ন দেওয়া হচ্ছে।

এখন নারীরা আগের অবস্থায় নেই। গ্রামের নারী মেম্বরদের অসাধারণ বক্তব্য শুনে আমি অবাক হয়েছি। তাঁরা এত খোঁজখবর রাখেন। এত ভালো বক্তব্য দেন। তাঁরা সবাই টেলিভিশন দেখেন। টক শো দেখেন। সবকিছু তাঁরা জানেন ও বোঝেন। বরিশালে আমার নিজের জেলায় দেখলাম, তাঁরা একজন নারীকেও কমিটিতে নেয়নি। তাদের বলেছি, এটা হবে না। নির্বাচন কমিশনের নিয়ম অনুসারে ৩৩ শতাংশ নারী নিতে হবে। ৩৩ শতাংশ না হোক একটা অংশ নারী সদস্য থাকবেন। স্থানীয় ও উপজেলা নির্বাচনে মহিলা সদস্য, মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান, মহিলা সাংসদ তাঁদের বরাদ্দ দিতে হবে। কাজ দিতে হবে।

এম ওসমান ফারুক: বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী নারী। তাঁরা দক্ষতার সঙ্গে রাষ্ট্র পরিচালনা করেছেন। তাঁদের উদাহরণ হিসেবে আনলে হবে না। কারণ, তাঁরা একটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে রাজনীতিতে এসেছেন। একমাত্র রাজনৈতিক সংস্কৃতি পরিবর্তন করলে হবে না। সামাজিক সংস্কৃতিও পরিবর্তন করতে হবে। আমি কোটাপদ্ধতি পছন্দ করি না। এটা একটি অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা হতে পারে। কিন্তু একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আমাদের সঠিক পথে যেতে হবে। কেবল রাজনীতিবিদদের কথা বলা হচ্ছে। প্রশাসনে নারীদের অবস্থান কী? কেবল একটি ক্ষেত্রে নারীদের ৩৩ শতাংশ থাকলে সার্বিক অবস্থার কোনো পরিবর্তন হবে না। দেশের সর্বক্ষেত্রে এ পরিবর্তনটি আসতে হবে। তৃণমূল পর্যায়ে সব রাজনৈতিক দলের কমবেশি সমস্যা রয়েছে। এ জন্য তৃণমূল পর্যায়ের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থা একটা কারণ। তবে ধীরে ধীরে এ অবস্থার পরিবর্তন হচ্ছে, হবে। তৃণমূল থেকে রাজনৈতিক দলের সব স্তরে ৩৩ শতাংশ নারীর অংশগ্রহণ আমরা চাই। এর জন্য বাধাবিপত্তি অনেক হবে। বাধার প্রধান কারণ হবে আমাদের মানসিকতা। অনেক ক্ষেত্রে নারীরা প্রতীকী হিসেবে কাজ করছেন। তৃণমূল পর্যায়ে রাজনৈতিক নেতার স্ত্রী, বোন—এঁরাই কিছু পদে আছেন।

দেশের বাস্তবতা বিবেচনা করতে হবে। এ দেশের একজন নারী বিশাল একটি পরিবার দেখাশোনা করেন। একটা সংসারের অনেক দায়িত্ব তাঁর ওপর। তাঁকে যে আপনি বলবেন মিটিংয়ে চলেন, আন্দোলনে আসেন, সভা-সমিতিতে আসেন, ঢাকা চলেন, এটা কিন্তু সম্ভব নয়। প্রথমে একটি পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে, যাতে তিনি রাজনীতিতে সময় দিতে পারেন। যেসব নারী মিটিং-মিছিলে আসেন, তাঁদের প্রতি ন্যূনতম সম্মানবোধ থাকে না। এখানে আমাদের আচার-আচরণের পরিবর্তনের বিষয় আছে। শুধু পুরুষতন্ত্র বলে গালিগালাজ করলে হবে না।

প্রথমেই আপনি একজনকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে পারেন না। নারী-পুরুষ সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। দুজনে মিলেই এ সমাজের উন্নয়ন করতে হবে। একজন আরেকজনের পরিপূরক হিসেবে কাজ করবেন। এখনো সংসদে সংরক্ষিত নারী আসন আছে। কিন্তু নিকট ভবিষ্যতে এখানে আমাদের নির্বাচিত নারী প্রতিনিধি আনতে হবে। এ লক্ষ্যেই সবাইকে কাজ করতে হবে। বর্তমানে দলে যাঁরা নারী আছেন, তাঁরা কি প্রতিনিধিত্বশীলভাবে এসেছেন, নাকি নারী কোটায় এসেছেন? এসবও দেখার প্রয়োজন আছে বলে মনে করি। তবে সবচেয়ে বড় কথা, নারীরা নিজেদের চেতনায় জেগে উঠেছেন। শত চেষ্টা করেও তাঁদের কেউ থামিয়ে রাখতে পারবেন না।

মোহাম্মদ নাসিম: ১৯৭২ সালে সংবিধানে প্রথম নারীর অধিকার নিশ্চিত করা হয়। সব ক্ষেত্রে নারীরা এগিয়ে যাচ্ছেন। তাঁদের আর কেউ পেছনে ফেলতে পারবেন না। যাঁরা এ চেষ্টা করবেন, তাঁরা পেছনে পড়ে যাবেন। নারীরা কাজের প্রতি খুবই নিষ্ঠাবান। বাংলাদেশে গার্মেন্টস যে এগিয়ে গেল, সেটা কাদের অবদান? আমাদের নারীদের অবদান। নারীরা সৎ। তাঁরা কর্মঠ। গ্রামের নারীরা ভোরবেলা মাঠে কাজ করতে চলে যান। নারীরা দেশের অনেক বড় শক্তি। কেন তাঁদের ক্ষমতায়ন হবে না? রাষ্ট্রের একটি বড় দায়িত্ব নারীর ক্ষমতায়নের সুযোগ সৃষ্টি করে দেওয়া। সে সুযোগটি বাংলাদেশের নারীদের আছে।

এ দেশের দুজন নারী ৩০ বছর ধরে দক্ষতার সঙ্গে দেশ পরিচালনা করছেন। রাষ্ট্র সুযোগ করে দেবে। নারীরা পদ অর্জন করে নেবেন। এ সুযোগটিই তো অনেক দেশে নেই। অনেকে বলছেন, মালালা নোবেল পাওয়ায় পাকিস্তানে ১৪০ জন শিশুকে হত্যা করা হলো। ভাবা যায়, এঁদের সঙ্গেই একসময় ছিলাম! আমাদের নেত্রী সব সময় নারীদের কথা ভাবেন। তাঁদের উন্নয়নের কথা বলেন। তবে এ কথা ঠিক যে আমাদের দলের মধ্যেও সমস্যা আছে। আমি নিজেও অনেক জায়গায় দেখেছি কমিটিতে নারী তেমন নেই। গুনতে থাকি কয়জন নারী। হতাশ হই।

রাজশাহীতে ২৫০ জন কাউন্সিলরের সঙ্গে বসলাম। বললাম, কতজন নারী আছেন? দেখা গেল তিনজন। এসব দেখে কষ্ট পাই। তৃণমূল কমিটিতে নারীদের শুরুতেই বাদ দেওয়া হয়। মিছিলের সময় সামনে, কমিটির সময় দূরে—এই হচ্ছে প্রবণতা। অনেক সময় খুব দুঃখ পাই। নারীদের মনোনয়নের ক্ষেত্রে বিবেচনা করা হয় সংসদে তারা প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে কতটা সোচ্চার, কত জোরে কথা বলেন ইত্যাদি। পুরুষদের ক্ষেত্রেও পেশিশক্তি, অর্থ বিবেচনা করা হয় না তা নয়। এ প্রবণতা অনেক আগে থেকেই শুরু হয়েছে। ফলে ত্যাগী, যোগ্য নারী-পুরুষ বাদ যাচ্ছেন। আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, নারীরা যাঁরা সংসদে আছেন, তাঁরা কেউ ভালো পার্লামেন্টারিয়ান হতে পারেনিন। নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ের ওপর কথা বলতে পারেন। নির্দিষ্ট এলাকার কিছু মানুষ ছাড়া তাঁদের পরিচিতি নেই। নারী সাংসদদের ভালো পার্লামেন্টারিয়ান হয়ে উদাহরণ তৈরি করতে হবে।

ইউনিয়নের নারী মেম্বর, উপজেলার নারী ভাইস চেয়ারম্যান, তাঁদের কোনো ক্ষমতা নেই—এসব বিষয় ভাবতে হবে। ইউনিয়ন পর্যায় থেকে প্রেসিডিয়াম কমিটি পর্যন্ত আরপিও বাস্তবায়ন করতে হবে। আমরা এ লক্ষ্যে কাজ করছি। নারী-পুরুষ সবাই একসঙ্গে কাজ করলে রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ ৩৩ শতাংশ করতে পারব।

আব্দুল কাইয়ুম: বাংলাদেশের নারীরা প্রমাণ করেছেন তাঁরা সব ক্ষেত্রে সফলতার সঙ্গে কাজ করতে পারেন। দেশের অর্ধেক নারী। তাঁদের পেছনে রেখে দেশ সামনে এগোতে পারবে না। বাংলাদেশ সহশ্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার অনেক বিষয় নির্দিষ্ট সময়ের আগেই অর্জন করেছে।

আমরা মনে করি, রাজনৈতিক দলগুলোর সহযোগিতা থাকলে ২০২০ সালের আগেই রাজনৈতিক নেতৃত্বে ৩৩ শতাংশ নারীর অংশগ্রহণ দেখতে পাব। তবে নারীদেরও এ ক্ষেত্রে দক্ষ ও যোগ্যতার সঙ্গে সামনে আসতে হবে। নারী-পুরুষ একসঙ্গে এ লক্ষ্যে কাজ করলে নিশ্চয়ই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারব। প্রথম আলোর পক্ষ থেকে সবাইকে কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ।

যাঁরা অংশ নিলেন

মোহাম্মদ নাসিম   : প্রেসিডিয়াম সদস্য, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, সাংসদ, মন্ত্রী, স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়

এম ওসমান ফারুক  : উপদেষ্টা, বিএনপি চেয়ারপারসন

এ টি এম শামসুল হুদা     : সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার

সেলিমা রহমান    : ভাইস চেয়ারম্যান, বিএনপি

দিলারা চৌধুরী     : অধ্যাপক, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়

হ-উল-আলম লেনিন   :        প্রেসিডিয়াম সদস্য, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ

নূরজাহান বেগম মুক্তা      :        সাংসদ, বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ ও অ্যাডভোকেট

শিরীন সুলতানা    : মহাসচিব, জাতীয়তাবাদী মহিলা দল

তানিয়া হক         : সভাপতি, ইউমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

কে টি ক্রোক       : ডেপুটি চিফ অব পার্টি, ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল

সঞ্চালক

আব্দুল কাইয়ুম        : সহযোগী সম্পাদক, প্রথম আলো

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন