default-image

প্রথম আলো: আপনারা মধ্যবর্তী নির্বাচনের দাবি করেছেন। এই দাবির যৌক্তিকতা কী? নির্বাচনের ফল মেনেই তো সংসদে গেছেন।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর: আমরা মধ্যবর্তী নয়, নতুন নির্বাচনের দাবি করছি। কেননা ২০১৮ সালে তো সেই অর্থে নির্বাচনই হয়নি। আমরা বলেছি, নির্বাচন হতে হবে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে। আর বর্তমান নির্বাচন কমিশন বাতিল করে নতুন কমিশন গঠন করতে হবে। ইতিমধ্যে প্রমাণিত হয়েছে, এই কমিশন কোনো সুষ্ঠু নির্বাচন করতে পারেনি, পারবে না।

সরকার যদি তত্ত্বাবধায়ক সরকার কিংবা নতুন নির্বাচন কমিশন গঠনের দাবি না মানে, আপনারা কী করবেন?

মির্জা ফখরুল ইসলাম: আমরা সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা করব। সময়ের পরিপ্রেক্ষিতটা দেখতে হবে। বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় এককভাবে আন্দোলন করে দাবি আদায় করা যাবে না। এ কারণেই আমরা জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার কথা বলেছি। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিতে অতীতেও আমরা তা করেছি। ভবিষ্যতে আরও বৃহত্তর জোট করব। সেই লক্ষ্যে আমরা কাজ করছি। অনেকের সঙ্গে কথাবার্তা হয়েছে। বিভিন্ন দলের মধ্যে মত-পথের পার্থক্য ও পছন্দ-অপছন্দ থাকা সত্ত্বেও সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রশ্নে সবাই একমত। আমরা সমস্যাগুলো কাটানোর চেষ্টা করছি।

আপনারা বহুদিন ধরেই আন্দোলন করার কথা বলছেন। কিন্তু আপনাদের মাঠে দেখা যাচ্ছে না। সরকারি দলের নেতারা বলেছেন, আন্দোলন করার শক্তি আপনাদের নেই।

মির্জা ফখরুল ইসলাম: যাঁরা ক্ষমতায় আছেন, তাঁরা গণতান্ত্রিক আচার-মূল্যবোধ কিছুই মানছেন না। অথচ এটাই ছিল আমাদের স্বাধীনতার মূলমন্ত্র। দেশ শাসনে এখন রাজনৈতিক দল ও রাজনীতি প্রাধান্য পাচ্ছে না। প্রাধান্য পাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। রাজনৈতিক শক্তির চেয়ে অরাজনৈতিক সিভিল-মিলিটারি শক্তি বেশি ক্ষমতাবান হয়ে উঠেছে। এক–এগারোর লক্ষ্য ছিল মাইনাস টু। এখন মাইনাস ওয়ান হয়েছে। এক–এগারো থেকেই বিএনপিকে নিঃশেষ করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এখন কোভিড-১৯-এর কারণে সভা-সমাবেশ বন্ধ আছে। কিন্তু আগে থেকে স্বাভাবিক সাংগঠনিক কার্যক্রমও করতে দেওয়া হয়নি। আমাদের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে এক লাখের অধিক মামলা আছে। আসামির সংখ্যা ৩৫ লাখের বেশি। এর মধ্যে অনেক গায়েবি মামলা আছে। বিএনপি বিপ্লবী বা গোপন দল নয়। প্রকাশ্য রাজনীতিই আমাদের করতে হবে। আমরা এখন দল গুছিয়ে অন্যদের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন করার চেষ্টা করছি।

বিজ্ঞাপন

দাবি মানার জন্য সরকারকে কোনো সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন কি?

মির্জা ফখরুল ইসলাম: আমরা কোনো সময়সীমা বেঁধে দিইনি। দলের চেয়ারপারসন অসুস্থ। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বিদেশে। এ অবস্থায় এককভাবে আন্দোলন করা কঠিন। তবে আমরা বিশ্বাস করি, ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন করতে পারলে দাবি আদায় করা সম্ভব হবে। দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন সুষ্ঠু হয় না। সে কারণেই আমরা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কথা বলেছি। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আওয়ামী লীগই আন্দোলন করেছে। তখন জামায়াতে ইসলামী তাদের বন্ধু ছিল। জাতীয় পার্টিও বন্ধু ছিল। কিন্তু ২০১০-১১ সালের দিকে যখন তারা নির্বাচনে খারাপ করছিল, তখনই তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থাটি বাতিল করে দেয়। পঞ্চদশ সংশোধনী নিয়ে যখন সংসদীয় কমিটিতে আলাপ-আলোচনা চলছিল, তখনো তারা এটি রাখার পক্ষে মত দিয়েছিল। পরে সেই অবস্থান থেকে সরে আসে।

আওয়ামী লীগ নেতারা বলছেন, দেশে কোনো রাজনৈতিক সংকট নেই। সংকট আছে বিএনপিতে।

মির্জা ফখরুল ইসলাম: সুষ্ঠু নির্বাচন না হওয়া কি বিএনপির সংকট? তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করার মধ্য দিয়েই বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটের শুরু। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের মতো এ দেশেও দ্বিদলীয় ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল। আওয়ামী লীগের পর বিএনপি এবং বিএনপির পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসত।

কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাটি তো ২০০৭ সালে বিএনপি একতরফা নির্বাচন করতে গিয়ে নষ্ট করে দিল।

মির্জা ফখরুল ইসলাম: আমি মনে করি, তত্ত্বাবধায়ক সরকার যেভাবে চলার কথা, সেভাবে চলতে দেওয়া উচিত ছিল। তখন আমরা সরকারে ছিলাম না, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছিল। তারা সঠিকভাবে পরিচালনা করতে পারেনি। আবার ওই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র ছিল। সে সময়ে দুর্নীতি, মৌলবাদ ও জঙ্গিবাদ নিয়ে বিএনপির বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ প্রচারণা ছিল। বাংলা ভাইয়েরা ওই সময়ে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল এ কথা যেমন ঠিক, আবার বিএনপি সরকারই গ্রেপ্তার করে তাদের বিচার করেছিল। একটা পর্যায়ে বলা হয়েছিল, নির্বাচন বন্ধ না করলে জাতিসংঘ শান্তি মিশন বন্ধ করে দেবে বলে চিঠি পাঠিয়েছে। পরে দেখা গেল সে রকম কোনো চিঠি তারা দেয়নি।

২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা সম্পর্কে কী বলবেন?

মির্জা ফখরুল ইসলাম: ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা চরম নিন্দনীয় ঘটনা। দুর্ভাগ্যজনক যে সে সময়ের গোয়েন্দারা ব্যর্থ হয়েছেন। গোয়েন্দা ব্যর্থতার অর্থ এই নয় যে বিএনপি এই হামলার সঙ্গে জড়িত।

সরকারের অত্যাচার-নির্যাতন সত্ত্বেও বিএনপির তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা দলীয় নীতিতে অটল ছিলেন। কিন্তু নেতৃত্ব তাঁদের দিকনির্দেশনা দিতে ব্যর্থ হয়েছে।

মির্জা ফখরুল ইসলাম: তৃণমূলের নেতা-কর্মীরাই আমাদের শক্তি। সরকারের নির্যাতন সত্ত্বেও তাঁরা অবিচল আছেন। সরকার তাঁদের নিশ্চিহ্ন করতে চেয়েছে। আর কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব আন্দোলন করতে পারেনি বা কর্মীদের সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে পারেনি, এটাও ঠিক নয়। ২০১৩-১৪ সালে আমরা জোরালো আন্দোলন করেছি। ঢাকায় কিছুটা সমস্যা ছিল। সারা দেশে জোরদার আন্দোলন ছিল। ২০১৪ সালের নির্বাচনের পরপরই কর্মসূচি প্রত্যাহার করা না হলে হয়তো ভিন্ন ফল আসত। তারও কারণ ছিল। ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে জাতিসংঘ প্রতিনিধি ফার্নান্দেজ তারানকো ঢাকায় এসে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতাদের সঙ্গে বসেছিলেন। সে সময় আওয়ামী লীগের নেতারা আমাদের কাছে ওয়াদা করেছিলেন তিন মাস পর আরেকটি নির্বাচন হবে। সংবিধান অনুযায়ী তাঁদের নির্বাচনটি করতে হচ্ছে। এ ব্যাপারে তাঁরা ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের উদাহরণ দিয়েছিলেন। কিন্তু আওয়ামী লীগ কথা রাখেনি।

সম্প্রতি বিএনপির তিন প্রভাবশালী নেতা একটি বেসরকারি টেলিভিশনে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের প্রতি সরাসরি অনাস্থা জানিয়েছেন। তাঁরা বলেছেন, খালেদা জিয়া দলের নেতৃত্বে না থাকলে তাঁরাও থাকবেন না। তাহলে কি খালেদা জিয়া না থাকলে বিএনপিও থাকবে না?

মির্জা ফখরুল ইসলাম: হয়তো হতাশা থেকে তাঁরা এসব কথা বলছেন। তাঁরা বয়সে প্রবীণ। কেউ কেউ স্থায়ী কমিটির সদস্য হতে চান। ঘটনার পরপরই শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন দলকে চিঠি দিয়ে দুঃখ প্রকাশ করেছেন। আর হাফিজউদ্দিন আহমদের বক্তব্যে অনাস্থা প্রকাশের কিছু নেই।

বিজ্ঞাপন

দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম স্থায়ী কমিটি। কিন্তু তাঁরা কোনো নীতি নির্ধারণ করছেন, এমন প্রমাণ পাওয়া যায় না। বিভিন্ন ইস্যুতে স্থায়ী কমিটির সদস্যদের মধ্যে মতভেদ স্পষ্ট।

মির্জা ফখরুল ইসলাম: একটি গণতান্ত্রিক দলে বিভিন্ন মত থাকতেই পারে। আমাদের স্থায়ী কমিটির বৈঠক প্রতি শনিবার হয়। সেখানে ভার্চ্যুয়ালি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানও থাকেন। নির্বাচনের আগে আমরা সব সিদ্ধান্ত নিয়েছি সর্বসম্মতভাবে। একমাত্র গয়েশ্বর চন্দ্র রায় নির্বাচনের বিষয়ে দ্বিমত করেছিলেন। একটি গণতান্ত্রিক দলের নির্বাচনে যাওয়া ছাড়া তো বিকল্প পথ নেই।

আপনারা বলেছিলেন খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে আন্দোলনের অংশ হিসেবে নির্বাচনে যাচ্ছেন। কিন্তু আপনারা তাঁকে মুক্ত করতে পারলেন না। নির্বাহী আদেশে তিনি মুক্ত হলেন। এতে কি দল ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি?

মির্জা ফখরুল ইসলাম: সরকারের দমন নীতির কারণেই আন্দোলন সফল হয়নি। বিএনপি তাঁর নিঃশর্ত মুক্তি চাইছিল। সাধ্যমতো আন্দোলন করেছে। নির্বাহী আদেশে তাঁর মুক্তির আবেদন আমরা করিনি। আবেদন করা হয়েছে পরিবারের সদস্যদের পক্ষ থেকে। তাঁরা মনে করেছেন, তাঁর যে শারীরিক অবস্থা, তাতে বাইরে থাকা প্রয়োজন। এতে দল ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। সরকার বলেছে, খালেদা জিয়া মুক্ত হলেও তিনি চিকিৎসার জন্য বাইরে যেতে পারবেন না। দেশেও বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে পারবেন না। কোভিডের কারণে তিনি ঘরের বাইরেও যেতে পারছেন না। তারপরও আমরা মনে করি, খালেদা জিয়া সুস্থ হয়ে মাঠে নামতে পারলে পরিস্থিতি পাল্টে যাবে। উনসত্তরে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আন্দোলন থেকেই গণ-অভ্যুত্থান হলো। আজও যে সে রকম কিছু হবে না, কে বলতে পারে।

সরকারি দলের নেতারা বলছেন, তাঁরা শক্তিশালী বিরোধী দল চান। আপনার প্রতিক্রিয়া কী?

মির্জা ফখরুল ইসলাম: তাঁদের কাজে তো সেটি প্রমাণিত হয় না। হাইকোর্টের সামনে ককটেল ফাটল, আমাকে ১ নম্বর আসামি করা হলো। আমাদের কেন্দ্রীয় সব নেতার বিরুদ্ধে মামলা আছে। আমার বিরুদ্ধে ৮৬টি মামলা। এর মধ্যে ৩৫টি হাইকোর্টে স্থগিত। বাকিগুলোতে নিম্ন আদালতে হাজিরা দিতে হয়। এটি কি শক্তিশালী বিরোধী দল চাওয়ার নমুনা? খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধেও ৩৬টি মামলা। এর মধ্যে তিনি অবরুদ্ধ থাকা অবস্থায় ছয় স্থানে বোমা হামলার মামলাও আছে।

আপনারা মুখে আন্দোলনের কথা বলছেন। কিন্তু বিএনপির নেতাদের মাঠে দেখা যাচ্ছে না।

মির্জা ফখরুল ইসলাম: আমরা প্রচণ্ড স্বেচ্ছাচারী সরকারের অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে কথা বলি। কিন্তু আমাদের কথাগুলো গণমাধ্যমে সেভাবে আসে না। কোনো কোনো গণমাধ্যম বিএনপির চরিত্র হনন করে চলেছে। পুরোনো দিনের কথা নিয়ে আসে। আজকের সংকট হলো দেশে গণতন্ত্র নেই, জনগণের ভোটাধিকার নেই। এ কথাগুলো তো সবার বলা উচিত। সমস্যাটি বিএনপির নয়, সমগ্র দেশের। আমি মনে করি, রাজনৈতিক সরকার দেশ চালাচ্ছে না। অন্য কোনো শক্তি চালাচ্ছে।

ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সমাবেশে আপনি রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় সাংবাদিকদের ভূমিকার প্রশংসা করেছেন। কিন্তু ক্ষমতায় গেলে যে তা ভুলে যাবেন না, তার প্রমাণ কী? আপনাদের আমলেও সাংবাদিকেরা নিগ্রহ ও হত্যার শিকার হয়েছিলেন।

মির্জা ফখরুল ইসলাম: আমরা গণমাধ্যমের স্বাধীনতা হরণ করেছি, এটি ঠিক নয়। বাকশাল করে সংবাদপত্র বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। জিয়াউর রহমান বহুদলীয় গণতন্ত্র দিলেন। সব বন্ধ সংবাদপত্র খুলে দিলেন। ১৯৯১ সালে আমরা ক্ষমতায় আসার পর আন্তর্জাতিক সংবাদ প্রতিষ্ঠান বিবিসি ও সিএনএন এখানে প্রচারিত হলো। অনেক পত্রিকা প্রকাশিত হয়েছে, কোনোটি বন্ধ করিনি। দুর্ভাগ্য, যখনই আওয়ামী লীগ এসেছে, পত্রিকা বন্ধ করেছে।

কিন্তু ২০০১-২০০৬ মেয়াদে তো বন্ধ হয়েছে। মামলা দিয়ে একুশে টিভি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।

মির্জা ফখরুল ইসলাম: একেবারে হয়নি তা বলব না। এখনকার তুলনায় খুবই কম। বর্তমানে অনেক টেলিভিশনের মালিকানা পরিবর্তন হয়েছে। সরকার আমার দেশ পত্রিকা বন্ধ করে দিয়েছে।

আপনাকে ধন্যবাদ।

মির্জা ফখরুল ইসলাম: আপনাকেও ধন্যবাদ।

মন্তব্য পড়ুন 0