বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
প্রতারণা চক্রের ‘মূল হোতা’ একজন বিদেশি। শতাধিক ব্যক্তিকে ফাঁদে ফেলে বড় অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন তাঁরা।

ডিবি সম্প্রতি চক্রের সদস্য সজীব, শরিফ ও মর্জিনা আক্তারকে গ্রেপ্তার করে। ডিবি বলেছে, শহীদুল রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় রাজমিস্ত্রির কাজ করতেন। সজীব ডিম বিক্রি করতেন মোহাম্মদপুর টাউন হলে ও শরিফ রাজধানীতে অটোরিকশা চালাতেন। ৫-৭ বছর আগে তাঁরা প্রতারণা চক্রে জড়িয়ে মূল পেশা ছেড়ে দেন। তবে পরিচিতজনদের বলতেন, তাঁরা আগের পেশায় আছেন। ডিবির কর্মকর্তারা বলেন, চক্রের অন্যতম হোতা শহীদুল পলাতক। আর এই চক্রের মূল হোতা একজন বিদেশি। তাঁকে শনাক্ত করে তাঁকে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।

default-image

ডিবি জানায়, প্রতারণার অভিযোগে ডিবি পুলিশ গত ৩ সেপ্টেম্বর আদাবর থানার নবোদয় হাউজিং এলাকা থেকে সজীবকে গ্রেপ্তার করে। তাঁর তথ্যের ভিত্তিতে মর্জিনা আক্তারকে (রনি) পল্লবীর কালশীর ভাড়া বাসা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানা এলাকা থেকে মো. শরিফ হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়। মর্জিনা একসময় সৌদি আরবে পরিচ্ছন্নতাকর্মীর কাজ করতেন। কয়েক বছর আগে দেশে ফিরে এই চক্রে যুক্ত হন।

মামলার তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা বলেছেন, তাঁরা প্রতারণা করে লোকজনের কাছ থেকে বিপুল টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। পরে সজীবের নামে ২২টি, শরিফের নামে ৯টি, মর্জিনার নামে ২টি ও পলাতক শহীদুল ইসলামের নামে ৫টি ব্যাংক হিসাব থাকার তথ্য জানা যায়। এতে দেখা যায়, শহীদুল এসব ব্যাংক হিসাবে ছয় মাসে ৫ কোটি ২৭ লাখ ৭২ হাজার টাকা, সজীব ৩ কোটি ২০ লাখ ৪৩ হাজার, শরিফ ২৩ লাখ ৮ হাজার টাকা, মর্জিনা ১০ লাখ টাকা লেনদেন করেছেন। চলতি বছর এসব লেনদেন হয়।

ডিবির সহকারী কমিশনার মোহাম্মদ খলিলুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, চক্রের সদস্যরা শতাধিক ব্যক্তিকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলে বড় অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।

যেভাবে প্রতারণা

গত ১০ এপ্রিল মেরি চন ইম্যান নামের একটি ফেসবুক আইডি থেকে একজন সরকারি কর্মকর্তাকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠানো হয়। মেরি চন ইম্যান নামের ফেসবুক আইডিধারী নিজেকে যুক্তরাজ্যের ব্যাংক কর্মকর্তা বলে পরিচয় দেন। ওই সরকারি কর্মকর্তা ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট গ্রহণ করার পর তাঁদের মধ্যে মেসেঞ্জারে যোগাযোগ হয়। মেরি চন নামধারী ব্যক্তি নিজেকে ফিলিপাইনের নাগরিক ও তাঁর আন্তর্জাতিক ব্যবসা আছে বলে জানান। বন্ধুত্ব গড়ে ওঠার একপর্যায়ে মেরি চন ওই সরকারি কর্মকর্তাকে বলেন, বাংলাদেশে শহীদুল, সজীব, শরিফ নামে তাঁর ব্যবসায়িক অংশীদার আছেন। একপর্যায়ে মেরি চন বলেন, যুক্তরাজ্যের নাগরিক ও লিবিয়াপ্রবাসী বেনজ্যাক ডেনিসের লন্ডনের একটি ব্যাংকে ২৪ কোটি টাকার স্থায়ী আমানত আছে। কিন্তু তিনি ও তাঁর স্ত্রী মারা গেছেন। তাঁদের উত্তরাধিকার না থাকায় ওই টাকা বাজেয়াপ্ত হয়ে যাবে। তিনি (সরকারি কর্মকর্তা) রাজি থাকলে ওই টাকার অংশবিশেষ পেতে পারেন। সে জন্য তাঁকে বেনজ্যাকের ব্যবসায়িক অংশীদার হতে হবে। এ জন্য কিছু কাগজপত্র ও মেরি চনকে ২ লাখ ৭৩ হাজার ৯০০ টাকা পাঠাতে হবে। ‘লোভে পড়ে’ ওই সরকারি কর্মকর্তা ঢাকার একটি বেসরকারি ব্যাংক হিসাবে ওই টাকা জমা দেন। পরে ওই সরকারি কর্মকর্তাকে বলা হয়, টাকা পেতে হলে আরও ৮ লাখ টাকা দিতে হবে। এতে ওই সরকারি কর্মকর্তার সন্দেহ হয়। একপর্যায়ে তিনি বুঝতে পারেন প্রতারণার শিকার হয়েছেন। এ ঘটনায় গত ২৯ আগস্ট শহীদুল ইসলামসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে তেজগাঁও থানায় প্রতারণার মামলা করেন ওই সরকারি কর্মকর্তা।

প্রতারণার শিকার ওই সরকারি কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, মেরি চন ইম্যান পরিচয় দেওয়া ব্যক্তি তাঁকে বলেছিলেন, ২৪ কোটি টাকার ৪০ শতাংশ তিনি পাবেন। তিনি বলেন, ‘লোভে পড়েছি, ভুল করেছি।’

এই প্রতারক চক্রের সদস্যরা মানুষকে উপহার দেওয়ার কথা বলেও প্রতারণা করেছে। ডিবির কর্মকর্তারা বলেন, চক্রের সদস্য সজীব লালমাটিয়ার এক নারীর সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপে কথা বলে তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলেন। একপর্যায়ে সজীব ওই নারীকে বলেন, তাঁর (সজীব) ছেলে-মেয়ে তাঁর জন্য (নারী) কিছু উপহার পাঠিয়েছেন। এর কয়েক দিন পর এক নারী নিজেকে কাস্টমস কর্মকর্তা পরিচয়ে তাঁকে ফোন করে বলেন, তাঁর জন্য দামি উপহার এসেছে। ধানমন্ডির সাতমসজিদ রোডের একটি ব্যাংক হিসাবে পৃথকভাবে ৪০ হাজার ও ১ লাখ ৫৫ হাজার টাকা জমা দিলে তাঁর বাসায় ওই উপহার পৌঁছে যাবে। ওই নারী গত ৩ জুন ওই টাকা জমা দেন। এরপর সজীব তাঁকে ফোন করে বলেন, উপহার পেতে তাঁকে আরও দেড় লাখ টাকা জমা দিতে হবে। কিন্তু এতে তিনি রাজি হননি। পরে সজীবের ফোন নম্বর বন্ধ পান ওই নারী। এ ব্যাপারে ভুক্তভোগী নারী মোহাম্মদপুর থানায় মামলা করেন।

গত শুক্রবার প্রতারণার শিকার নারী প্রথম আলোকে বলেন, ‘কাস্টমস কর্মকর্তা পরিচয় দেওয়া নারী বারবার বলছিলেন “আপনার উপহারটি পড়ে আছে, নিয়ে যান।” এ কারণে ব্যাংকে টাকা জমা দিয়েছিলাম। পরে বুঝতে পেরেছি প্রতারিত হয়েছি।’

প্রতারকদের ব্যাংক হিসাবে কোটি টাকার লেনদেন প্রসঙ্গে মামলার তদন্ত তদারক কর্মকর্তা ডিবির গুলশান বিভাগের উপকমিশনার মশিউর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক অগ্রণী ভূমিকা পালন করলে সেখান থেকে তাৎক্ষণিক তথ্য নিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তদন্তে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখতে পারে। তাহলে প্রতারকেরা একের পর এক ব্যাংক হিসাব খুলতে পারত না এবং মানুষকে ঠকিয়ে ব্যাংক হিসাবে টাকা নিতে পারত না। তিনি বলেন, এ ধরনের ব্যাংক হিসাব খোলার সঙ্গে জড়িত ব্যাংক কর্মীদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।

ব্যাংক হিসাবে প্রতারকদের টাকা লেনদেন প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম গত শনিবার প্রথম আলোকে বলেন, শর্ত পূরণ করে কেউ চাইলে একাধিক ব্যাংক হিসাব খুলতে পারবেন। তবে তাতে সন্দেহজনক লেনদেন দেখা গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ ব্যাংককে জানাবে।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন