কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলায় একজন প্রয়াত রাজাকারের নামে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। তবে তিনি রাজাকার ছিলেন না বলে প্রত্যয়নপত্র দিয়েছেন উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের ভারপ্রাপ্ত কমান্ডার। কুমারখালী শহরে গতকাল রোববার এক সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ করা হয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের ভারপ্রাপ্ত কমান্ডার মোকাদ্দেস হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার বাড়ি প্রত্যন্ত গ্রামে। ফলে প্রয়াত মনতাজ আলী রাজাকার ছিলেন কি না, তা আমার জানা নেই। পৌর মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার সামছুল আলমের প্রত্যয়নের সূত্র ধরেই মনতাজ রাজাকার নন উল্লেখ করে প্রত্যয়নপত্র দিয়েছি। এখন উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড তদন্ত করলে যদি প্রমাণিত হয় তিনি রাজাকার ছিলেন, তবে সেই চিঠিতেও সই করব।’

সামছুল আলমের মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন দেওয়া হলেও নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়।

গতকাল দুপুরে কুমারখালী শহরের সোনাবন্ধু মার্কেট চত্বরে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ সমিতি। এতে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সমিতির সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা এ টি এম আবুল মনছুর (মজনু)।

লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, গত ২০ ফেব্রুয়ারি উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয় কুমারখালীর হাজী মনতাজ আলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কোনো রাজাকার বা বিতর্কিত ব্যক্তির নামে কি না, তা যাচাই করতে কুমারখালী মুক্তিযোদ্ধা সংসদের ভারপ্রাপ্ত কমান্ডার মোকাদ্দেসকে চিঠি দেয়। তিনি সংসদের প্যাডে ২২ ফেব্রুয়ারি চিঠির জবাব দেন। এতে উল্লেখ করা হয়, বিদ্যালয়টি কোনো যুদ্ধাপরাধীর নামে নামকরণ করা হয়নি। মনতাজ আলী একজন যুদ্ধাপরাধী, কথাটি সঠিক নয়। বিষয়টি ভিত্তিহীন, বানোয়াট ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। এতে আরও বলা হয়, কুমারখালীতে কোনো সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কোনো রাজাকার বা বিতর্কিত ব্যক্তির নামে নেই।

সংবাদ সম্মেলনে মুক্তিযোদ্ধা আবুল মনছুর বলেন, সর্বজনচিহ্নিত রাজাকার মনতাজ আলীকে এই প্রত্যয়ন দেওয়ার বিষয়টি দেশ তথা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের জন্য কলঙ্কজনক।

লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, মনতাজ আলী একাত্তর সালে কুমারখালী শহরের বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে প্রকাশ্যে লুটপাট চালান। সেই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ব্যক্তিদের অনেকেই জীবিত আছেন। এ ছাড়া শহর ও শহরতলির বহু বসতবাড়িতে অগ্নিসংযোগ, ১৫ থেকে ১৬ জন নারী-শিশুকে হত্যা, পাবনার সুজানগরের সাতবাড়িয়া এলাকার প্রায় দুই হাজার ভারতগামী শরণার্থীর কাছ থেকে মালামাল লুটপাটে নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।

আবুল মনছুর উল্লেখ করেন, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি ২০১০ সালে কুমারখালীর ৩১৫ জন রাজাকারের নামের তালিকা প্রকাশ করে। এ তালিকা উদ্বোধন করেন নির্মূল কমিটির কার্যকরী সভাপতি শাহরিয়ার কবির নিজে। তালিকাটি শহরের প্রবেশপথে স্থাপন করে রাখা হয়েছে। ওই তালিকার তিন নম্বরেই রয়েছে রাজাকার মনতাজ আলীর নাম। এমন একজনের পক্ষাবলম্বনকারী মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন আবুল মনছুর। পাশাপাশি হাজী মনতাজ আলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তনেরও দাবি করেন তিনি।

সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন কুমারখালী নাগরিক পরিষদের সভাপতি আকরাম হোসেন, স্বাধীন বাংলা ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক মুক্তিযোদ্ধা রেজাউল করিম হান্নান, মুক্তিযোদ্ধা সোলাইমান হোসেন ও চাঁদ আলী, মুক্তিযোদ্ধার সন্তান আইনজীবী সেলিম আলতাফ, উপজেলা আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক সুভাষ দত্ত, পৌরসভার কাউন্সিলর মাহাবুব আলম প্রমুখ।

উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের ডেপুটি কমান্ডার সিরাজুল ইসলাম অভিযোগ করে প্রথম আলোকে বলেন, ভারপ্রাপ্ত কমান্ডার মোকাদ্দেস হোসেন সংসদে আলোচনা না করেই গোপনে একজন রাজাকারের পক্ষে প্রত্যয়ন দিয়েছেন। এ ব্যাপারে তিনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) লিখিতভাবে জানাবেন।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন