default-image

ঢাকা শহরে পাকিস্তানি সেনাদের টহল আর বিভিন্ন সূত্র থেকে আসা সংবাদে রাজারবাগ পুলিশ লাইনসের বাঙালি পুলিশ সদস্যরা ধরেই নিয়েছিলেন, সেদিন কিছু একটা হতে যাচ্ছে। বেলা যত গড়াচ্ছিল, তাদের ওই ধারণা আরও তীব্রতর হচ্ছিল। রাত ১০টা-সাড়ে ১০টার দিকে পুলিশ লাইনসের ওয়্যারলেস বেজ স্টেশনের বেতারযন্ত্রে যখন ভেসে এল ‘চার্লি সেভেন ফর বেজ, অ্যাবাউট থার্টি ফাইভ টু থার্টি সেভেন ট্রাকস উইথ পাক আর্মি অ্যাপ্রোচিং টু আওয়ার ঢাকা সিটি ফ্রম ক্যান্টনমেন্ট, ওভার’। ততক্ষণে রাইফেল নিয়ে প্রায় সব পুলিশ সদস্যই প্রস্তুত।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের সেই রাতে মো. শাহজাহান মিয়া ছিলেন রাজারবাগ পুলিশ লাইনস ওয়্যারলেস বেজ স্টেশনের একজন ওয়্যারলেস অপারেটর। শহরের বিদ্যুৎ ও টেলিফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন। ওয়্যারলেসই হয়ে উঠেছিল তথ্য আদান–প্রদানের একমাত্র মাধ্যম। ৩৫ থেকে ৩৭ ট্রাক পাকিস্তানি সেনা ক্যান্টনমেন্ট থেকে বেরিয়ে আসার খবরটি ওয়্যারলেসে প্রথম তাঁর কাছেই আসে। আর রাজারবাগে হামলার খবরটি তিনিই ওয়্যারলেসে জানিয়ে দিয়েছিলেন সারা দেশে।

রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে বসে গত রোববার শাহজাহান মিয়া প্রথম আলোকে বলছিলেন, ৭ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে) বঙ্গবন্ধুর ভাষণের পরই পুলিশ সদস্যদের মধ্যে স্বাধীনতা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। দেশের কী হবে না হবে, তা নিয়েই সারাক্ষণ চলত সলাপরামর্শ।

রাজারবাগ ওয়্যারলেস বেজ স্টেশনে যাঁরা কাজ করতেন, তাঁরা থাকতেন মালিবাগের ২০৬ নিউ সার্কুলার রোডের একটি তিনতলা ভবনে। ২৫ মার্চ দিনের বেলায় পুলিশ লাইনসে হাজিরা দিয়ে শাহজাহান মিয়া বেরিয়ে গিয়েছিলেন শহরে। সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে আসার কিছুক্ষণ পর রাত আটটার দিকে ঢাকা নগরে আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি গাজী গোলাম মোস্তফার ছোট ছেলে তাঁকে এসে বলেন, ‘শাহজাহান ভাই, বঙ্গবন্ধুর বাসা থেকে এসেছি। ক্যান্টনমেন্টের সন্ধান নিয়েও এসেছি। সেখানেও সাজ সাজ রব। আজকে রাতেই ঢাকা শহরে হামলা হবে। আপনাকে জানানোর জন্য বঙ্গবন্ধু পাঠিয়েছেন।’

শাহজাহান মিয়া বলছিলেন, ‘তাৎক্ষণিকভাবে ইউনিফর্ম পরে ২০-২৫ জন সবাই দৌড়ে রাজারবাগে চলে আসি। তখন নাইট রোল কল চলছিল। আমরা কিছুটা উত্তেজিত হয়ে আছি। সিদ্ধান্ত নিই অস্ত্রাগার খুলে অস্ত্র নেওয়ার। অস্ত্রাগারের রিজার্ভ ইন্সপেক্টর মফিজ উদ্দিন তখন চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। আমরা তাঁর বাসা ঘেরাও করি; অস্ত্রাগারের চাবি চাই। কিন্তু উনি দেবেন না। একপর্যায়ে জোর করে চাবি নিয়ে অস্ত্রাগার খুলি। ৩০০-৩৫০ থ্রি নট থ্রি রাইফেল আর ২০টি করে গুলি নিজেদের মধ্যে বণ্টন করে নিই। রাজারবাগ পুলিশ লাইনস এবং এর আশপাশের রাস্তায় সবাই সশস্ত্র অবস্থান নেয়।’

ওয়্যারলেস বেজ স্টেশনে অবস্থান নেন শাহজাহান মিয়া। রাত ১০টা-সাড়ে ১০টার দিকে তেজগাঁও এলাকা থেকে একটা বার্তা আসে। সেখানকার টহল দলের কলসাইন ছিল ‘চার্লি সেভেন’। শাহজাহান মিয়া বলেন, ‘ওই এলাকা থেকে চার্লি সেভেন আমাকে কল করল, “চার্লি সেভেন ফর বেজ, ডু ইউ হিয়ার মি, ওভার।” উত্তরে বলি, “বেজ ফর চার্লি সেভেন। ইউ আর লাউড অ্যান্ড ক্লিয়ার। সেন্ড ইয়োর মেসেজ, ওভার।” তখন তিনি বলেন, “চার্লি সেভেন ফর বেজ, অ্যাবাউট থার্টি ফাইভ টু থার্টি সেভেন ট্রাকস উইথ পাক আর্মি অ্যাপ্রোচিং টু আওয়ার ঢাকা সিটি ফ্রম দ্য ক্যান্টনমেন্ট, ওভার।”’

শাহজাহান মিয়া যখন ওয়্যারলেস নিয়ে ব্যস্ত, তখন পুলিশ লাইনসে অস্থির পায়চারি করছিলেন তৎকালীন পুলিশ মহাপরিদর্শক তসলিম উদ্দীনের দেহরক্ষী মো. আবদুল আলী খান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, রাত ১০টা ১০ মিনিটে বিদ্যুৎ চলে যায়। তৃতীয় তলায় নিজের কক্ষ থেকে দেখেন, শহরের কোথাও বাতি নেই। দ্রুত নিচে নেমে দেখেন লোকজন পালাচ্ছে। পাকিস্তানি বাহিনী যে আসছে, সেটা তিনি তখনো জানতেন না।

পুলিশ লাইনসের ১ নম্বর গেট থেকে ২ নম্বর গেটের দিকে রওনা হন আবদুল আলী। পথে মোটরসাইকেল আরোহী এক বাঙালি পুলিশ বলেন, ‘আসার সময় দেখলাম, অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে পাকিস্তানি সেনাদের অনেকগুলো ট্রাক দাঁড়িয়ে আছে।’

আবদুল আলী খান বলেন, ‘আমি চোখ বন্ধ করে স্মরণ করলাম, ইয়া আল্লাহ, আমি কি যুদ্ধ করব, না পালাব—এই কথা ভাবার সঙ্গে সঙ্গে আমার ভেতরে একটা অদৃশ্য শক্তি আসল। মনে হলো নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার সঙ্গে আছেন। তখন আমি ছুটে গিয়ে পাগলাঘণ্টা বাজালাম। এক–দেড় মিনিট বাজাই। যেই ফোর্সরা সারা দিন ডিউটি করে সন্ধ্যার পর বিছানায় ঘুমোতে গিয়েছিল, তারা সবাই ছুটে চলে আসল।’

ওয়্যারলেস অপারেটর শাহজাহান মিয়া বলেন, পাগলাঘণ্টা বাজানোর পরপর সবাই ছুটে এসে ‘রাইফেল চাই, গুলি চাই’ বলে চিৎকার শুরু করেন। তখন দ্বিতীয় অস্ত্রাগার শাবল দিয়ে খুলে ফেলেন তাঁরা সবাই মিলে। ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর’, ‘তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা মেঘনা যমুনা’—এসব স্লোগান দিতে দিতে অস্ত্র নিয়ে সবাই বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে অবস্থান নেন।

শাহজাহান মিয়া বলেন, ‘রাত সাড়ে ১১টা হবে। পাকিস্তানি সেনাদের বহরটি হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের সামনে দিয়ে রমনা পার্ক, বেইলি রোড হয়ে যখন শান্তিনগরে প্রবেশ করে, তখন চামেলীবাগে ডন হাইস্কুলের সামনে দেওয়া ব্যারিকেডে গাড়ি থামাতে বাধ্য হয় পাকিস্তানি সেনারা। ব্যারিকেড অপসারণের জন্য ফোর্স নেমে আসে। তখনই আমাদের পুলিশ বাহিনীর যারা ডন স্কুলের ছাদে পজিশন নিয়েছিল, তারা প্রথম গুলি করে। দুজন পাকিস্তানি সেনা তাৎক্ষণিক মারা যায় এবং কয়েকজন আহত হয়। সেটাই ছিল স্বাধীনতার প্রথম বুলেট। অর্থাৎ ফার্স্ট বুলেট ফর দ্য ইনডিপেনডেন্ট। এরপর যেন যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। আমরা দেখে দেখে থ্রি নট থ্রি রাইফেল থেকে গুলি করি। আর ওরা মর্টার শেল, হেভি মেশিনগান থেকে গুলি করছে। আমাদের একটা গুলির সঙ্গে ওরা অসংখ্য গুলি ছোড়ে।’

পুলিশের উপমহাপরিদর্শক (প্রশাসন) হাবিবুর রহমানের সম্পাদনায় মুক্তিযুদ্ধের প্রথম প্রতিরোধ শীর্ষক বইয়ে বলা হয়েছে, রাত পৌনে ১২টা থেকে শুরু হওয়া এই যুদ্ধ থেমে থেমে রাত তিনটা থেকে সাড়ে তিনটা পর্যন্ত চলে। বন্দী হয় প্রায় দেড় শ বাঙালি পুলিশ। পুলিশ সদস্যদের একটা অংশ অস্ত্র, গোলাবারুদসহ রাজারবাগ ত্যাগ করে। যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলে।

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন