default-image

রাত নয়টার পর মহাসড়কে যাত্রীবাহী বাস চলবে না। এখন থেকে মহাসড়কে চলাচলকারী যাত্রীবাহী বাসগুলোকে গন্তব্যে পৌঁছাতে হবে রাত নয়টার মধ্যেই। তবে পণ্যবাহী যান আগের মতোই চলাচল করবে। 
গতকাল সোমবার বিকেলে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের সঙ্গে পরিবহনের মালিক ও শ্রমিকনেতাদের এক বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত প্রায় দুই ঘণ্টাব্যাপী এ বৈঠকে সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার ছিল না। অবশ্য একাধিক পরিবহনমালিক জানিয়েছেন, বৈঠকে অংশ নিয়ে তাঁরা রাতে দূরপাল্লার পথে যাত্রীবাহী বাস চালানোর পক্ষেই মত দিয়েছিলেন। কিন্তু স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনড় অবস্থানের কারণে তাঁরা রাতে বাস না চালানোর সরকারি সিদ্ধান্ত মেনে নেন।
বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ও পরিবহনমালিকদের পক্ষে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্লাহ সাংবাদিকদের কাছে সিদ্ধান্তের কথা জানান। এর ফলে রাতে দূরের পথে মানুষের যাতায়াত কার্যত বন্ধ হয়ে গেল। অবরোধ-হরতালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাহারায় চলা যানবাহনে পেট্রলবোমা হামলার ঘটনা ঘটে। এর আগে সরকারের অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতসহ দায়িত্বশীল মন্ত্রী ও প্রশাসনের কর্তারা তাঁদের বক্তব্যে ঢাকার বাইরের অবস্থা খারাপ বলে মন্তব্য করেন। রাতে যাত্রীবাহী পরিবহন বন্ধের মাধ্যমে এই ধারণা আরও পোক্ত হবে বলে পরিবহন নেতারা মনে করেন।
এর আগে গত শনিবার রাজারবাগ পুলিশ লাইনে পরিবহনমালিকদের সঙ্গে বৈঠক করে পুলিশের মহাপরিদর্শক শহীদুল হক রাত নয়টার পর মহাসড়কে যাত্রীবাহী বাস বন্ধ রাখার প্রস্তাব করেন। কিন্তু মালিকেরা তা না মেনে পরে সিদ্ধান্ত জানানোর কথা বলেন। এরই ধারাবাহিকতায় গতকাল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বৈঠক ডাকা হয়। একাধিক বাসমালিক জানান, শনিবার সন্ধ্যার পরই বিভিন্ন স্থানে দূরপাল্লার পথের বাসের কাউন্টারগুলোতে পুলিশ গিয়ে রাতে বাস না চালানোর নির্দেশ দিয়ে আসে। এর পরও মালিকেরা বাস চালিয়েছেন।
গতকালের বৈঠকে উপস্থিত একাধিক বাসমালিক জানান, বৈঠকের শুরুতেই স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী রাত নয়টার পর বাস চলাচল বন্ধ রাখার বিষয়ে মালিকদের মতামত জানতে চান। এরপর একে একে মালিকেরা বাস চালানোর পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন।
বৈঠক সূত্র জানায়, মালিকেরা বলেছেন, হরতাল-অবরোধসহ স্বাভাবিক সময়ে দিনের তুলনায় রাতে যাত্রী বেশি হয়। কারণ সবাই দিনের কাজ শেষ করে রাতটা পথে ব্যয় করতে চান। অনেকে ঢাকার বাইরে থেকে ঢাকায় এসে দিনে দরকারি কাজ শেষ করে চলে যান। একইভাবে ঢাকা থেকে বাইরের জেলাগুলোতে কাজ শেষে ঢাকায় ফিরে আসেন। দিনে যাত্রা করতে চাইলে রাত কাটাতে হয় হোটেলে, খেতে হয়। এতে খরচ বেড়ে যায়। এমনিতেই হরতাল-অবরোধে বসে থাকার কারণে মালিকেরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। শুধু দিনে চালালে খরচের টাকাই তোলা যাবে না। আবার সরকারের নানা পদক্ষেপের ফলে মালিকেরা বাস চালানো শুরু করেছেন। যাত্রীরাও কিছুটা আশ্বস্ত হতে শুরু করেছেন। এ অবস্থায় রাতে বাস বন্ধ করে দিলে মালিক-যাত্রী সবার মধ্যেই নেতিবাচক ধারণা জন্মাতে পারে।
সব কথা শুনে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, পুলিশের পাহারায় বাসে হামলা-প্রাণহানি হলে আরও খারাপ বার্তা যায়। রাতে বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তটি সাময়িক। সরকার তিন-চার দিন পর এই সিদ্ধান্ত আবার পর্যালোচনা করবে। গাইবান্ধা, বগুড়া, রংপুরের মিঠাপুকুর, জয়পুরহাট, বরিশালের কিছু অংশ, কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম, চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডসহ কিছু স্পর্শকাতর এলাকা চিহ্নিত করে সরকার সেগুলো নিয়ে কাজ করছে। শিগগিরই এসব স্থান স্বাভাবিক হয়ে যাবে। তখন মালিকেরা ২৪ ঘণ্টাই বাস চালাতে পারবেন। এই ব্যবস্থা সাময়িক।
সংবাদ ব্রিফিংয়ে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেন, বৈঠকে পরিবহনমালিকেরা সারা দেশের সব জায়গায় গাড়ি চালাতে বলেছেন। তাঁরা কিছু কিছু জায়গায় সমস্যা আছে বলে উল্লেখ করেছেন, সেগুলোতে কড়া নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হবে। যাত্রীবাহী বাস রাত নয়টার মধ্যে গন্তব্যে যাবে—সরকারের অবস্থান এই জায়গায়। প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, ২৪ ঘণ্টা যানবাহন চলাচল করবে। তবে তার আগে যেসব জায়গায় সমস্যা আছে, সেগুলোতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে।
কবে নাগাদ ২৪ ঘণ্টায় যাত্রীবাহী বাস চলাচল করবে জানতে চাইলে প্রতিমন্ত্রী নির্দিষ্ট কোনো সময় উল্লেখ না করে বলেন, শিগগির আগের অবস্থা ফিরিয়ে আনা হবে।
সড়কে প্রশাসনের পাশাপাশি ১৪ দলের নেতা-কর্মীদের অবস্থান রয়েছে উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, স্বাভাবিকভাবেই রাত নয়টার পর রাজনৈতিক নেতা-কর্মীরা থাকেন না। সে জন্য রাস্তা খালি হয় এবং দু-এক জায়গায় নাশকতার ঘটনা ঘটে। তবে পুলিশ, র্যাব, বিজিবি সজাগ রয়েছে এবং গত দু-এক দিনের তুলনায় মহাসড়কের অবস্থা এখন ভালো।
মালিক প্রতিনিধি খন্দকার এনায়েত উল্লাহ বলেন, ‘এখন শুধু যাত্রীবাহী বাস নয়টার মধ্যে গন্তব্যে পৌঁছাবে, এ সিদ্ধান্ত আমরা নিয়েছি। তবে আমরা আশা করি, দুই-চার দিনের মধ্যেই পূর্বের অবস্থায় ফিরে যাব। পণ্যবাহী যান আগের মতো থাকবে।’ তিনি দাবি করেন, যোগাযোগব্যবস্থা আগের চেয়ে অনেক সচল হয়েছে। চট্টগ্রাম ও উত্তরবঙ্গের কিছু জায়গায় আরও নিরাপত্তার প্রয়োজন আছে।
এনায়েত উল্লাহ জানান, হরতাল-অবরোধে পোড়ানো ও ভাঙচুর হওয়া যানবাহনের ক্ষতিপূরণ হিসেবে সাত কোটি টাকার ৬৭৪টি দরখাস্ত প্রধানমন্ত্রীর কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। আগামী সপ্তাহে ক্ষতিপূরণ পাওয়ার আশা করছেন তাঁরা।
বৈঠকে স্বরাষ্ট্রসচিব মোজাম্মেল হক খান, পুলিশের প্রতিনিধি ও মালিক-শ্রমিক নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন