বিমানবন্দর, তবে কোনো কোলাহল নেই। চারদিকে খোলা বিলের মধ্যে গড়ে ওঠা ঘরবাড়িগুলোতে দৃষ্টি আটকে যায়। বিশেষ করে ক্ষয়ে যাওয়া কংক্রিট আর সিমেন্টের তৈরি রানওয়ে, সিগন্যাল ঘর, যুদ্ধবিমানের তেলের আধারের স্মৃতিচিহ্নগুলোকে ম্লান করে দিচ্ছে আশপাশে গড়ে ওঠা ঘরবাড়ি। রক্ষণাবেক্ষণ না করলে ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাটির শেষ চিহ্নটুকুও আর অবশিষ্ট থাকবে না।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জঙ্গি বিমানগুলোতে জ্বালানি তেল ভরার জন্য ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠী সেই সময়ের নোয়াখালী জেলার ফেনী ও চট্টগ্রাম জেলার চকরিয়া-হাটহাজারীতে দুটি বিমানবন্দর স্থাপন করেছিল। হাটহাজারীর বিমানবন্দরটির জন্য তখনকার সদর ইউনিয়ন পরিষদের আলমপুর গ্রাম ও তার আশপাশের ৩৭ একর জায়গা অধিগ্রহণ করে। বিমানবন্দরের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ভবন, সিগন্যাল হাউস, রানওয়ে, জ্বালানি তেলের জন্য রিজার্ভার নির্মাণ করা হয়েছিল। তখনকার দুর্বল যোগাযোগব্যবস্থার দিনে সেই ১৯৪৩ সালে চট্টগ্রাম শহর থেকে ২২ কিলোমিটার দূরে হাটহাজারীতে এ রকম একটি বিমানবন্দর নির্মিত হয়েছিল শুধু যুদ্ধের প্রয়োজনে।

উদ্দেশ্য যা–ই হোক, হাটহাজারীর এ অংশ বিশ্ব ইতিহাসেরই একটি অংশ। অথচ এখানকার তরুণেরা এটি সম্পর্কে কিছুই জানে না। এমনকি ঐতিহাসিক স্থাপনাটির আশপাশে যাঁরা এসে বসবাস শুরু করেছেন, তাঁরাও জানেন না এটা কী ছিল। তবে এলাকার পুরোনো বাসিন্দা, প্রবীণেরা বলতে পারেন বিলুপ্ত বিমানবন্দরের ইতিকথা। আলমপুর গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা জাকির হোসেন জানান, যুদ্ধবিমানগুলো তেল ফুরিয়ে গেলে এখানে তেল নিতে আসত। ব্রিটিশ সরকার এই বিমানবন্দরের জন্য অনেক ফসলি জমি অধিগ্রহণ করেছিল। এর বিনিময়ে তারা খাজনা দিত। ব্রিটিশ বিদায় নেওয়ার পর জমিগুলো পুরোনো মালিকেরা যাঁর যাঁর জায়গা নিজেরাই নিয়ে নেন। ১৯৪৫ সালের পর বিমানবন্দরটি অব্যবহৃত হয়ে পড়ে।

হাটহাজারীর ধুলাবালুর সঙ্গে মিশে যাচ্ছে ঐতিহাসিক নিদর্শনটি। সম্প্রতি হাটহাজারীতে গিয়ে দেখলাম, সে সময়ে নির্মিত স্থাপনাগুলো জরাজীর্ণ হয়ে পড়ে আছে। রানওয়ের কিছু অংশ দেখা যায়। তেলের রিজার্ভারের কিছু অংশবিশেষ আছে, দেখলে মনে হয় কালভার্ট। প্রশাসনিক ভবন ও সিগন্যাল ঘর আগাছায় পরিপূর্ণ। প্রশাসনিক ভবনের পাশে পাকা ঘর তুলেছেন ওখানকার বাসিন্দারা। তাতে আরও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পুরোনো স্থাপনাগুলো। এগুলোর দেয়ালে জমেছে শেওলা, খসে পড়েছে পলেস্তারা, ইট ভেঙে ভেঙে পড়ে স্তূপ হচ্ছে।

বিমানবন্দরের আশপাশে কারা থাকছেন, এই জমি কাদের—এসব নিয়ে ওখানে গেলেই কৌতূহল জাগে। জানতে চাইলাম স্থানীয় বাসিন্দা আহসান আরিফ চৌধুরীর কাছে। তিনি বললেন, ‘বিমানবন্দরের কারণে স্থানীয় বেশ কিছু কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে তাঁদের জন্য ১ হাজার ৩০০ থেকে ২ হাজার টাকা এবং প্রতি পরিবারকে পরিবহন বাবদ ১১০ টাকা দেওয়া হয়েছিল। এ ছাড়া আবাদি জমির ভাড়া হিসেবে প্রতিবছর ৪০ শতকের জন্য চুক্তিনামামূলে ৮০ টাকা করে প্রদান করেছিল বলে আগেকার মুরব্বিদের মুখে শুনছিলাম। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, যত দিন ব্রিটিশ সরকার এ জায়গা ব্যবহার করবে, তত দিন বার্ষিক ভাড়া প্রদান করা হবে। ১৯৪৪ থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত মোট তিন বছর জায়গার মালিকদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে ক্ষতিপূরণের অর্থ দুই বছর দেয় ব্রিটিশ সরকার। দেশ ভাগ হয়ে গেলে ব্রিটিশ সরকার ক্ষতিপূরণের টাকা পাকিস্তান সরকারের কাছে হস্তান্তর করেছিলেন। কিন্তু পাকিস্তান সরকার নিজেদের শিশু সরকার হিসেবে আখ্যায়িত করে ক্ষতিপূরণের টাকা দিতে অপারগতা প্রকাশ করে। ওই সময় স্থানীয় লোকজন তৎকালীন জেলা প্রশাসকের সঙ্গে দেনদরবার করে এডিসি (রাজস্ব) ও হাটহাজারী সেটেলমেন্ট অফিস থেকে ক্ষতিপূরণের টাকা আদায় করেন।’

default-image

এলাকার আরও কিছু মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, নদীভাঙন ও ছিন্নমূল কিছু মানুষ পরিবার নিয়ে ওই এলাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস করে আসছেন। সরকার ইদানীং কিছু আশ্রয়ণ প্রকল্প করে ভূমি ও গৃহহীনদের মাথা গোঁজার ঠাঁই করে দেন ওই এলাকায়।

হাটহাজারীর ভূমি সহকারী কমিশনার আবু রায়হান বলেন, কয়েকটি জরাজীর্ণ স্থাপনা ও রানওয়ে সড়ক পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। এগুলোর রেকর্ডপত্র জেলা প্রশাসকের কার্যালয় এলএ শাখায় রক্ষিত আছে। আরও কিছু রেকর্ডপত্র ভূমি অফিস কার্যালয়ে আছে। ওই এলাকায় বর্তমানে আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের আওতায় মুজিব বর্ষ উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঈদ উপহার হিসেবে ১৫টি পরিবারকে ঘর নির্মাণ করে দেওয়া হয়েছে। আগেও সেখানে আশ্রয়ণ প্রকল্প করে দেওয়া হয়েছিল নদীভাঙন ও ছিন্নমূল পরিবারকে।

হাটহাজারী পৌর প্রশাসক মো. শাহিদুল আলমও বললেন একই কথা। তিনি বলেন, ‘আদর্শগ্রাম এলাকায় ব্রিটিশ সরকারের রানওয়ে বিমানবন্দরটি বিষয়ে আমরা জানি। এলাকাটি দেখতে সুন্দর। সেখানে সরকারিভাবে বেশ কিছু আশ্রয়ণ প্রকল্প করা হয়েছে। তবে জমির মালিকেরা যাঁর যাঁর মতো জমি ভোগদখলে আছেন।’

বিমানবন্দর এলাকার ৫০০–৬০০ গজের মধ্যেই পাহাড়। সেই পাহাড় থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ছড়াগুলো বর্ষায় জেগে ওঠে। তখন এক অপরূপ দৃশ্যের অবতারণা হয়। পাহাড় আর সমতলের মেলবন্ধনের এ জায়গাটুকু, আর এর গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক নিদর্শন নিয়ে এলাকাটি পর্যটন এলাকার মর্যাদা পেতে পারে। ঐতিহাসিক নিদর্শন, প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগের পাশাপাশি নির্মাণাধীন ভেটেরিনারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মবেইজড ক্যাম্পাস, কৃষি ইনস্টিটিউট, হর্টিকালচার সেন্টারও পর্যটকদের কাছে টানবে নিঃসন্দেহে।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন