বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

সম্প্রতি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৭–এ রেইনট্রি হোটেলে ধর্ষণ মামলার রায় হয়েছে। রায়ে খালাস পাওয়া পাঁচ আসামি হলেন আপন জুয়েলার্সের মালিক দিলদার হোসেনের ছেলে শাফাত আহমেদ, শাফাত আহমেদের বন্ধু সাদমান সাকিফ, নাঈম আশরাফ, শাফাতের দেহরক্ষী রহমত আলী ও গাড়িচালক বিল্লাল হোসেন।
বিশিষ্ট ৮০ নাগরিক বিবৃতিতে বলেন, ‘গণমাধ্যমের বরাতে দৃষ্টিগোচর হয়েছে যে মামলার বিচারক রায়ের পর্যবেক্ষণে এমন কিছু বিষয়ের উল্লেখ করেছেন, যা তাঁর এখতিয়ার–বহির্ভূত এবং নারীর সাংবিধানিক অধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। আমরা এ পর্যবেক্ষণের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানাই। এ মামলার শুরু থেকেই অত্যন্ত প্রভাবশালী আসামিদের পক্ষ থেকে প্রচুর চাপ এবং ভুক্তভোগীদের “ভিকটিম ব্লেমিং”সহ নানানভাবে হয়রানির বিষয় গণমাধ্যমে এসেছে। আসামিদের আস্ফালন সে সময় পত্রপত্রিকায় ফলাও করে ছাপা হতো। সেই আসামিদের ক্ষমতার দম্ভই রায়ে প্রতিফলিত হয়েছে বললে অত্যুক্তি হবে না। রায়ে ভুক্তভোগীদের যৌন সম্পর্কের অভিজ্ঞতা থাকার কারণে তাঁরা “বিশ্বাসযোগ্য” নন বলে বিচারকের পর্যবেক্ষণ ভিকটিম ব্লেমিংয়ের শামিল। এটা হাইকোর্টের নির্দেশনার সরাসরি ব্যত্যয়। আর সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী উচ্চ আদালতের নির্দেশনা মানতে ট্রাইব্যুনাল বাধ্য।

আদালতের এ পর্যবেক্ষণের ফলে মানুষের মনে ভুল ধারণা হতে পারে যে আগে যৌন সম্পর্কের অভিজ্ঞতা থাকা কোনো নারী ধর্ষণের বিচার আশা করতে পারেন না। এর ফলে দেশে নারীর প্রতি সহিংসতা বাড়বে এবং বিচারপ্রাপ্তির সম্ভাবনা আরও ক্ষীণ হয়ে পড়বে বলে আমরা মনে করি। আমরা মনে করি আদালত নারীর বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতা ও ধর্ষণের মতো অপরাধকে স্বাভাবিকীকরণ করেছেন এবং জনমনে এ বিভ্রান্তিকর ধারণা প্রতিষ্ঠিত করতে চাচ্ছেন যে ধর্ষণের জন্য নারী নিজেই দায়ী। ধর্ষণের ৭২ ঘণ্টার মধ্যে মামলা করার বাধ্যবাধকতা তৈরি করা বা ডাক্তারি প্রত্যয়নপত্র ছাড়া ধর্ষণ মামলা না নেওয়ার জন্য নির্দেশনা দেওয়ার কোনো এখতিয়ারই এ ট্রাইব্যুনালের নেই। ধর্ষণের মতো ফৌজদারি অপরাধের ক্ষেত্রে ৭২ ঘণ্টা নয় বরং ৭২ বছর পরও মামলা করতে পারার অধিকার ভুক্তভোগীদের আছে। অথচ এ পরামর্শের কারণে ধর্ষণের শিকার নারীর নিরাপত্তা আরও বেশি সংকটাপন্ন হয়ে পড়বে, যার দায় উল্লিখিত ট্রাইব্যুনালের বিচারকের। এ ছাড়া মামলা তদন্ত করে আসামির অপরাধ প্রমাণ করা যেমন রাষ্ট্রপক্ষের কাজ, তেমনি যেকোনো মামলার ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা আদালতের কাজ। একটি মামলা দায়ের করে আদালতের সময় নষ্ট করার অভিযোগ তোলা রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনে নিযুক্ত ব্যক্তির কাজের প্রতি কোনো দায়বদ্ধতা না থাকার উদাহরণ।’

উল্লিখিত মামলার ক্ষেত্রে প্রভাবশালী আসামিপক্ষের খালাস পাওয়ার কারণ হিসেবে রাষ্ট্রপক্ষের মামলার জন্য যথাযোগ্য প্রমাণ উপস্থাপন না করতে পারার দায় বাদীদের হতে পারে না। অথচ সব দোষ দুই ভুক্তভোগীর ওপর চাপানো হয়েছে। উপরন্তু ভুক্তভোগীদের চরিত্র সম্পর্কে মাননীয় বিচারকের মতামত অত্যন্ত দৃষ্টিকটু এবং যেকোনো নাগরিকের জন্য অসম্মানজনক। এ ছাড়া দুজন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী মামলাকে প্রভাবিত করেছেন বলে মাননীয় বিচারকের মন্তব্য জনমনে প্রশ্ন তোলে বাংলাদেশের সমাজ সম্পর্কে ও তাঁর বাস্তব জ্ঞান সম্বন্ধে। কারণ, এ সমাজে ভুক্তভোগী নারীরাই প্রান্তিক এবং নিপীড়নের শিকার, উল্টোটা নয়।

আইনের শাসনের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনাতে বিশিষ্ট নাগরিকদের দাবি—
*এ মামলার বিচার প্রক্রিয়ার বিচারবিভাগীয় তদন্ত হোক কারণ, ক্ষমতাশালী ও বিত্তশালী অভিযুক্ত ব্যক্তিরা কীভাবে বারবার দুর্বল পুলিশি তদন্তের সাহায্যে অপরাধের দায়ভার ও শাস্তি এড়িয়ে যান, তার প্রতিকার অতীব জরুরি।
*বিচারকদের সঠিক ও সময়োপযোগী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে তাঁদের নাগরিকদের অধিকার সুরক্ষায় আরও দক্ষ করে তোলার ব্যবস্থা করতে হবে।
*সাক্ষ্য আইনের ১৫৫ (৪) ধারার বিলুপ্তি।

বিবৃতিতে অনলাইনে স্বাক্ষরদাতা নাগরিকেরা—

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, ইমেরিটাস অধ্যাপক; মেঘনা গুহঠাকুরতা, সাবেক সদস্য, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন; শিরীন হক; নারী আন্দোলনকর্মী, মালেকা বেগম, অধ্যাপক, লেখক, নারী আন্দোলনকর্মী; আসিফ নজরুল, অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, আইনজীবী; আনু মুহাম্মদ, অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়; হামিদা হোসেন, মানবাধিকারকর্মী; শামসুল হুদা, নির্বাহী পরিচালক, অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম (এএলআরডি); শহিদুল আলম, আলোকচিত্রী; গীতিআরা নাসরিন, অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; সুব্রত চৌধুরী, জ্যেষ্ঠ আইনজীবী; ড. নাসরিন খন্দকার, শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়; জ্যোতির্ময় বড়ুয়া, আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট; ইফতেখারুজ্জামান, নির্বাহী পরিচালক, টিআইবি; ফিরদৌস আজিম, অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়; শাহনাজ হুদা, অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; হানা শামস আহমেদ, পিএইচডি গবেষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়, কানাডা; স্বপন আদনান, প্রফেসরিয়াল রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট, স্কুল অব অরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজ, ইউনিভার্সিটি অব লন্ডন, যুক্তরাজ্য; খুশী কবির, মানবাধিকারকর্মী; বীণা ডি কস্টা, অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, অস্ট্রেলিয়া; নোভা আহমেদ, শিক্ষক, ইলেকট্রিকাল ও কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়; রোজীনা বেগম, শিক্ষার্থী, ইনস্টিটিউট অব হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস স্টাডিজ, মাহিডন বিশ্ববিদ্যালয়, থাইল্যান্ড; মাইদুল ইসলাম, সহকারী অধ্যাপক, সমাজতত্ত্ব বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; মুক্তাশ্রী চাকমা, গবেষক ও অধিকারকর্মী; আকমল হোসেন (অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক), আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; অরূপ রাহী, লেখক, সংগীতশিল্পী; রোবায়েত ফেরদৌস, অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; নায়লা জামান খান, অধ্যাপক, ঢাকা শিশু হাসপাতালের পেডিয়াট্রিক নিউরোসায়েন্স; সাদাফ সাজ, লেখক; ফস্টিনা পেরেরা,

মানবাধিকারকর্মী; পারউইন হাসান, উপাচার্য, সেন্ট্রাল উইমেন্স ইউনিভার্সিটি; সালমা আলী, প্রেসিডেন্ট, বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতি; নূর খান লিটন, মানবাধিকারকর্মী; সায়দিয়া গুলরুখ, সাংবাদিক; মির্জা তাসলিমা সুলতানা, অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়; পার্সা সাঞ্জানা সাজিদ, লেখক, গবেষক; বদিউল আলম মজুমদার, সম্পাদক, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন); ফরিদা আখতার, নারীগ্রন্থ প্রবর্তনা; তবারক হোসেইন, আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট; ফাতেমা সুলতানা শুভ্রা, শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়; সালমা আবেদীন পৃথী, আলোকচিত্রী; তাঞ্জিম ওয়াহাব, আর্ট কিউরেটর ও শিক্ষক, পাঠশালা সাউথ এশিয়ান মিডিয়া ইনস্টিটিউট; খন্দকার তানভীর মুরাদ, শিক্ষক, আলোকচিত্র বিভাগ, পাঠশালা সাউথ এশিয়ান মিডিয়া ইনস্টিটিউট; কামরুন নাহার, নারী অধিকারকর্মী; শম্পা বসু, সাধারণ সম্পাদক, সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরাম; জায়মা ইসলাম, প্রতিবেদক, দ্য ডেইলি স্টার; সাঈদ ফেরদৌস, অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়; সাদাফ নূর, শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; সায়েমা খাতুন, শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়; নাহিদা আশরাফী, লেখক ও প্রকাশক; মাসউদ ইমরান, অধ্যাপক, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়; ওমর তারেক চৌধুরী, লেখক-অনুবাদক; নাসরিন সিরাজ, নৃবিজ্ঞানী ও চলচ্চিত্রকার; মেহ্জাবীন রহমান, অ্যাকটিভিস্ট ও শিক্ষক, ইংরেজি বিভাগ স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটি; ঋতু সাত্তার, থিয়েটার ও পারফরম্যান্সশিল্পী; মুনেম ওয়াসিফ, শিল্পী; আবদুল্লাহ আল নোমান, আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট; সামিনা লুৎফা নিত্রা, শিক্ষক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; মাহমুদুল সুমন, অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়; নাজনীন শিফা, পিএইচডি গবেষক, জেএনইউ, ইন্ডিয়া; সুস্মিতা পৃথা, সাংবাদিক; জান্নাতুল মাওয়া, আলোকচিত্রী; পারভীন জলী, শিক্ষক, ইতিহাস বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়; শাহীন আনাম,

মানবাধিকারকর্মী; ফারাহ কবীর, উন্নয়নকর্মী; জলি তালুকদার, সম্পাদক, কেন্দ্রীয় কমিটি, সিপিবি; বীথি ঘোষ, শিল্পী ও সংগঠক; সাদিয়া মরিয়ম রুপা, আলোকচিত্রী; অমল আকাশ, শিল্পী ও সংগঠক; দীনা সিদ্দিকী, অধ্যাপক, ফ্যাকাল্টি অব লিবারেল স্টাডিজ, নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটি; আনমনা প্রিয়দর্শিনী, পিএইচডি গবেষক, ইউনিভার্সিটি অব পিটসবার্গ, যুক্তরাষ্ট্র; শাশ্বতী মজুমদার, শিক্ষক, চারুকলা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়; দিলশানা পারুল, ডেপুটি ডিরেক্টর (মনিটরিং), ব্লাস্ট; মোশাহিদা সুলতানা, শিক্ষক, অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; মনীষা চক্রবর্তী, সদস্যসচিব, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ, বরিশাল জেলা, তাসলিমা আখ্তার, শ্রমিক ও নারী অধিকারকর্মী এবং আলোকচিত্রী; নাসিমুল খবির, শিক্ষক, ভাস্কর্য বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রুশদ ফরীদি, শিক্ষক, অর্থনীতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও রেহনুমা আহমেদ, লেখক।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন