default-image

দরবার হলে ২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি বিদ্রোহ শুরুর কিছুক্ষণ পরেই বিদ্রোহী জওয়ানদের একটি দল বিডিআরের তত্কালীন মহাপরিচালক মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদের বাসায় ঢুকে পড়ে। তাদের দেখে শাকিলের স্ত্রী নাজনীন আহমেদ ভয়ে রান্নাঘরে ঢুকে পড়েন। তখন কয়েকজন সৈনিক নাজনীনকে টেনে বের করে নির্যাতন করেন এবং এক পর্যায়ে তাঁকে গুলি করে হত্যা করেন। মহাপরিচালকের বাসায় তাণ্ডবে অংশ নেওয়া এক জওয়ান ১৬৪ ধারার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে এ কথা জানান বলে তদন্তকারী সূত্রগুলো জানিয়েছে। স্বীকারোক্তি দেওয়া ওই জওয়ানকে বিদ্রোহের পর চট্টগ্রাম থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।
ওবায়দুল জানায়, বিদ্রোহীরা মহাপরিচালকের বাসার ১২ বছর বয়সী একটি কাজের মেয়েকেও নির্যাতন ও গুলি করে হত্যা করেন। পিলখানার ভেতরে অবস্থান করা আরও অনেক নারী ও শিশু জওয়ানদের নির্যাতনের শিকার হয়। রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের সময় জওয়ানদের জবানবন্দিতে এর বিবরণ পাওয়া যায়।
জওয়ানদের জিজ্ঞাসাবাদ করে সিআইডি কর্মকর্তারা জানতে পারেন, ২৫ ফেব্রুয়ারি সকাল পৌনে ১০টার দিকে বিদ্রোহীরা মহাপরিচালকের বাসভবনের দিকে যায়। তখন মেজর জেনারেল শাকিলের স্ত্রী নাজনিন আহমেদ স্বামীর সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলেন। পরে মহাপরিচালকের কর্ড (ব্যক্তিগত কর্মকর্তা) মেজর খালিদ মহাপরিচালকের নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত সদস্য ল্যান্স নায়েক  মনিরুজ্জামান, হাবিলদার মান্নান, সিপাহি বিধান কুমার, আতিকুর রহমান ও সিপাহি আরিফকে বাসভবনের নিরাপত্তার জন্য পাঠান। কিন্তু তারা সবাই সেখানে গেলেও নিষ্ক্রিয় ছিলেন।

জওয়ানেরা মহাপরিচালকের স্ত্রীকে হত্যার পর দোতলায় উঠে ওই বাসার অতিথি মহাপরিচালকের বন্ধু লে. কর্নেল (অব.) দেলোয়ার ও তাঁর স্ত্রীকে গুলি করে হত্যা করেন। এরপর সবাই মিলে বাসায় লুটতরাজ ও ভাঙচুর করেন। এরকম লুটপাট ও ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছে আরও অনেক কর্মকর্তার বাসায়।

তদন্তকারী সূত্রগুলো আরও জানায়, বিদ্রোহের দিন জওয়ানেরা পিলখানায় অবস্থান করা নারী ও শিশুদের নোংরা ভাষায় গালাগাল করেন। কেউ কেউ উত্তেজিত হয়ে সবাইকে মেরে ফেলারও হুমকি দেন। আবার কেউ কেউ তাদের শান্ত থাকতে বলেন। পরিবারের সদস্যদের কোয়ার্টার গার্ডের সেলে নিয়ে গাদাগাদি করে আটকে রাখা হয়। এ সময় একটি সেলে দুজন বিদেশিও ছিলেন।

একজন কর্মকর্তার স্ত্রী জবানবন্দিতে তদন্তকারীদের জানান,  দরবার হল আক্রমণ করার কিছুক্ষণ পর সশস্ত্র বিডিআর জওয়ানেরা লাথি মেরে তার মেসের কক্ষের দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে পড়েন। তাঁরা ভেতরে থাকা নারী ও শিশুদের সম্পর্কে নানা ধরনের মন্তব্য করতে থাকেন। হিংস্রভাবে তাদের মারধর করা হয় বলে অভিযোগ করেছেন ওই কর্মকর্তার স্ত্রী। জওয়ানরা তাঁদের মেরে ফেলারও হুমকি দেন।

আরেকজন কর্মকর্তার স্ত্রী জানান, দরজা ভেঙে দুজন সশস্ত্র জওয়ান তাঁর কক্ষে ঢুকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন এবং তাঁর ছেলেকে লাথি মারেন। এ দুজন তাঁদের ঝিগাতলা ৪ নম্বর ফটক দিয়ে বের করে দিতে চাইলে সেখানে লাল কাপড় বাঁধা সৈনিকরা বাধা দেয় এবং রাইফেলের বাঁট দিয়ে পিঠে আঘাত করে মেরে ফেলার হুমকি দেয়। রাইফেল স্কয়ারের দেয়ালের কাছে গেলে একজন তাঁর বুকে বন্দুক ধরে গুলি করতে চায়। তখন অন্যরা বাধা দেওয়ায় তিনি বেঁচে যান। এ সময় বিদ্রোহীদের কেউ কেউ তাঁদেরকে অফিসার্স মেস অথবা কোয়ার্টার গার্ডে বন্দী করার প্রস্তাব দিলে শেষ পর্যন্ত তাঁদের কোয়ার্টার গার্ডে নিয়ে আটক রাখা হয়।

আরেক কর্মকর্তার স্ত্রী তাঁর জবানবন্দিতে জানান, মুখোশধারী সশস্ত্র লোক দরজা ভেঙে ঘরে ঢুকে তাঁদের কয়েকজনকে চুল ধরে টেনে বের করে ধাক্কা দিয়ে মাটিতে ফেলে দেয়। এরপরে বুট দিয়ে মাড়ায়, লাথি মারে ও রাইফেলের বাঁট দিয়ে পেটাতে থাকে। তাদের সঙ্গে মুহূর্তেই আরও পাঁচ-ছয়জন সৈনিক যোগ দেয়। পরে তাঁদেরকেও কোয়ার্টার গার্ডে নিয়ে বন্দী করে রাখা হয়। পিলখানায় থাকা সেনা কর্মকর্তাদের পরিবারের সদস্যরা প্রায় সবাই এমন বিবরণ দিয়েছেন।

সেনা তদন্ত আদালতের (কোর্ট অব ইনকোয়ারি) প্রতিবেদনে বলা হয়, তত্কালীন মহাপরিচালক মেজর জেনারেল শাকিলসহ অন্য কর্মকর্তার স্ত্রীদের হত্যা ও নির্যাতন করার বিষয়টি পূর্বপরিকল্পিত। কোন কোন কর্মকর্তার স্ত্রীকে মারধর করা হবে, তাও আগে থেকে নির্দিষ্ট করা ছিল। বিদ্রোহের সূচনাতেই নির্দিষ্টসংখ্যক বিডিআর-সদস্য বেছে বেছে পূর্বনির্ধারিত কয়েকটি বাসায় গিয়ে কর্মকর্তাদের পরিবারের সদস্যদের মারধর করেন।

তদন্ত কমিটি মনে করে, নির্যাতনের পরিকল্পনাটি প্রাথমিকভাবে মুষ্টিমেয় কিছু বিডিআর সদস্যের মধ্য সীমিত ছিল। পরে তা বিস্তৃত হয়। এতে আরও বলা হয়, বিদ্রোহীরা সেনা পরিবারের সদস্যদের কোয়ার্টার গার্ডে এনে এমনভাবে আটকে রাখেন যাতে সেনাবাহিনী পিলখানা আক্রমণের পরিকল্পনা করলে তাদের হত্যা করার হুমকি দিয়ে নিজেদের লক্ষ্য অর্জনে সুবিধা হয়।

(এই প্রতিবেদনটি ২০১০ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি প্রথম আলোয় প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনটি আবারও হুবহু প্রকাশ করা হলো।)

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন