ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের জন্য নির্মিত আবাসন।
ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের জন্য নির্মিত আবাসন।ফাইল ছবি

জাতিসংঘের একটি প্রতিনিধিদলের পর যুক্তরাষ্ট্রসহ ১০ দেশ ও জোটের শীর্ষ কূটনীতিকেরা ভাসানচরের পরিবেশ-পরিস্থিতি ও স্থানান্তরিত রোহিঙ্গাদের সুযোগ-সুবিধা কেমন, তা সরেজমিনে দেখতে আগামী শনিবার নোয়াখালীর চরটিতে যাবেন।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে প্রথম আলোকে জানিয়েছেন, ১০ কূটনীতিকের সঙ্গে সফরসঙ্গী হিসেবে ভাসানচরে যাবেন পররাষ্ট্রসচিব মাসুদ বিন মোমেন এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণসচিব মো. মহসিন।
জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ফ্রান্স, জাপান, তুরস্ক, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও নেদারল্যান্ডস—এই ৯ দেশ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের কূটনীতিকেরা শনিবার ভাসানচরে যাবেন। এ সময় বিদেশি কূটনীতিকেরা সেখানকার অবকাঠামোসহ কক্সবাজার থেকে স্থানান্তরিত  রোহিঙ্গাদের জন্য মৌলিক ও মানবিক সুবিধা কেমন, তা জানাবোঝার চেষ্টা করবেন। স্বাভাবিকভাবেই রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে সরানো নিয়ে যেহেতু আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় শুরু থেকে প্রশ্ন তুলছে, তাই তারা স্বেচ্ছায় কক্সবাজার থেকে ভাসানচরে গেছে কি না, সে সম্পর্কেও খোঁজ নেবেন কূটনীতিকেরা।


কূটনীতিকদের ভাসানচর সফর নিয়ে জানতে চাইলে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণসচিব মো. মহসিন আজ সন্ধ্যায় প্রথম আলোকে বলেন, ‘উন্নয়ন সহযোগী ১০ দেশ ও জোটের কূটনীতিকেরা রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তায় অর্থায়ন করে আসছেন। তাঁরা ভাসানচরে যাওয়ার আগ্রহ দেখিয়েছিলেন। এ জন্য তাঁদের নিয়ে শনিবার আমরা ভাসানচরে যাচ্ছি।’

বিজ্ঞাপন


এদিকে ঢাকায় কানাডা দূতাবাস ভাসানচর সফরে যাওয়া কূটনীতিকদের পক্ষে আজ বিকেলে একটি বিবৃতি দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ফ্রান্স, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নেদারল্যান্ডস ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষে দেওয়া ওই বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এই সফরের মধ্য দিয়ে কূটনীতিকেরা দ্বীপটির অবকাঠামো দেখার সুযোগ পাবেন। তেমনি তাঁরা রোহিঙ্গাদের পাশাপাশি সেখানে বসবাসরত লোকজন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে মতবিনিময় করতে পারবেন।

default-image


সরকারের একটি সূত্র বলছে, সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে বিদেশি কূটনীতিকদের নিয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ের একটি বৈঠক হয়েছিল। সেখানে ভাসানচর নিয়ে জাতিসংঘ ও উন্নয়ন সহযোগী দেশের ভূমিকার প্রশ্নটি উঠেছিল। আলোচনার একপর্যায়ে সেখানে এই মত এসেছে, ভাসানচর নিয়ে জাতিসংঘের ভূমিকা কী হবে, সেটা ঠিক করার বিষয়ে চূড়ান্ত মত দেবে উন্নয়ন সহযোগী ও জাতিসংঘের সদস্য দেশগুলো।


এর আগে বাংলাদেশ সরকারের আয়োজনে ১৭–২০ মার্চ পর্যন্ত জাতিসংঘের একটি কারিগরি প্রতিনিধিদল ভাসানচরে যায়। বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তায় কর্মরত জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার বিশেষজ্ঞরা ভাসানচরে তিন দিনের ওই প্রাথমিক পরিদর্শনে যুক্ত ছিলেন। জাতিসংঘের প্রতিনিধিদলটি ভাসানচরে সরেজমিনে সফরের পর সরকারের কাছে আগামী সপ্তাহে একটি প্রতিবেদন দেবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।


তবে জাতিসংঘের প্রতিনিধিদল ভাসানচরে কী দেখেছে এবং তাদের সেখানকার পরিস্থিতি নিয়ে পর্যবেক্ষণ কী, এ বিষয়ে গত সপ্তাহে ঢাকায় সরকারের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে একটি বৈঠক করেছে। ওই বৈঠকে উপস্থিত এক কর্মকর্তা বৃহস্পতিবার দুপুরে এই প্রতিবেদককে জানিয়েছে, ভাসানচরের বিষয়ে কয়েক মাস আগেও জাতিসংঘের যে মনোভাব ছিল, সফরের পর তাতে কিছু পরিবর্তন হয়েছে। তবে ভাসানচরে স্থানান্তরিত রোহিঙ্গাদের অবাধে যাতায়াত ও চলাফেরার ব্যাপারে যে বিধিনিষেধ আছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে জাতিসংঘ।

default-image


কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরে চাপ কমাতে বাংলাদেশ সরকার নিজস্ব অর্থায়নে ভাসানচরে এক লাখ রোহিঙ্গাকে স্থানান্তরের ব্যবস্থা করেছে। পরিবেশগত ঝুঁকি, সামগ্রিক অবকাঠামো নিয়ে প্রশ্ন তোলার পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের তাদের নিজেদের ইচ্ছায় পাঠানো হচ্ছে কি না, এ বিষয়গুলোকে সামনে এনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো শুরু থেকেই ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের স্থানান্তরের বিরোধিতা করে এসেছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বিরোধিতার মধ্যেই বাংলাদেশ সরকার গত বছরের ৪ ডিসেম্বর কক্সবাজার থেকে ভাসানচরে রোহিঙ্গা স্থানান্তর শুরু করে। এখন পর্যন্ত কক্সবাজারের বিভিন্ন শিবির থেকে পাঁচ দফায় ১৩ হাজার ৭৬০ জন রোহিঙ্গাকে ভাসানচরে নেওয়া হয়েছে। সরকার বলছে, যেসব রোহিঙ্গা ভাসানচরে যাচ্ছে, তারা স্বেচ্ছায় যাচ্ছে।


শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের ৪ ডিসেম্বর প্রথম দফা, ২৯ ডিসেম্বর দ্বিতীয় দফা, চলতি বছরের ২৯ ও ৩০ জানুয়ারি তৃতীয় দফা, ১৪ ও ১৫ ফেব্রুয়ারি চতুর্থ দফা, ৩ ও ৪ মার্চ পঞ্চম দফায় ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের স্থানান্তর করা হয়েছে।


২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর নৃশংসতা শুরু হলে পরের কয়েক মাসে অন্তত আট লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। তার আগে আসে আরও কয়েক লাখ। বর্তমানে উখিয়া ও টেকনাফের ৩৪টি আশ্রয়শিবিরে নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা সাড়ে ১১ লাখ।

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন