default-image

পদ্মার তীরে ভেজা কাপড়ে আহাজারি করছিলেন গৃহবধূ মিলা বেগম। পাটুরিয়ার অদূরে পদ্মায় ডুবে যাওয়া লঞ্চ থেকে কোনোরকমে তীরে উঠে প্রাণ বাঁচিয়েছেন তিনি। নিজের প্রাণ বাঁচলেও সঙ্গে থাকা প্রিয় সন্তান আর স্বামীর খোঁজ মেলেনি। শুধু মিলার স্বামী-সন্তান নয়, ওই লঞ্চের অনেক যাত্রীই নিখোঁজ। গতকাল রোববার রাত ১টা পর্যন্ত ৪৩ জন যাত্রীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। 
মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার পাটুরিয়া ঘাট থেকে এমভি মোস্তফা নামের লঞ্চটি কাল বেলা সাড়ে ১১টার দিকে দৌলতদিয়া ঘাটের উদ্দেশে ছেড়ে যায়। ১৫ মিনিট পরই কার্গো জাহাজ নার্গিস-১-এর ধাক্কায় সেটি ডুবে যায়। যাত্রীরা বলছেন, লঞ্চটিতে দুই শতাধিক যাত্রী ছিল।
লঞ্চ ডোবার খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যায় মানিকগঞ্জের ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশসহ আশপাশের লোকজন। বিআইডব্লিউটিএর পাটুরিয়া ঘাটে থাকা জাহাজ আইটি-৩৮৯ দিয়ে লঞ্চটির অবস্থান শনাক্ত করে ওই জাহাজের সঙ্গে রশি দিয়ে বেঁধে রাখা হয়। উদ্ধার তৎপরতা শুরুর আগেই দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ভেসে ওঠে স্মৃতি আক্তার নামে আট মাসের এক শিশু। সে রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার আদর্শ গ্রামের ফারুক হোসেনের মেয়ে। এর পরই বেলা সোয়া দুইটার দিকে ভেসে ওঠে মাগুরার শ্রীপুরের আতাউর রহমানের স্ত্রী লাইলী বেগমের লাশ (৫৫)। এরপর ঘটনাস্থলে একে একে পৌঁছে ঢাকার ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল, কোস্টগার্ড ও নৌ-পুলিশের সদস্যসহ সরকারি এবং বেসরকারি পর্যায়ের শতাধিক উদ্ধারকর্মী। তাঁরা একযোগে উদ্ধার তৎপরতা চালিয়ে লঞ্চের ভেতর থেকে বের করে আনেন নারী, পুরুষ ও শিশুদের লাশ।
পাটুরিয়া ঘাটে খোলা পুলিশ কন্ট্রোল রুম থেকে রাত একটায় জানানো হয়, এ পর্যন্ত মোট ৪৩ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। তার মধ্যে ১৮টি পুরুষ, ১৩টি নারী ও ১২টি শিশুর মরদেহ। ৩৭টি মরদেহের পরিচয় পাওয়া গেছে। স্বজনদের কাছে ৩৫টি মরদেহ হস্তান্তর করা হয়েছে।
ডুবে যাওয়া লঞ্চটি উদ্ধারে রাত সোয়া ১১টার দিকে উদ্ধারকারী জাহাজ রুস্তম ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার তৎপরতা শুরু করে। রাত একটায় শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত উদ্ধার তৎপরতা চলছিল।
প্রত্যক্ষদর্শী ও বেঁচে যাওয়া কয়েকজন যাত্রী জানান, বেলা পৌনে ১২টার দিকে পাটুরিয়া লঞ্চঘাট থেকে প্রায় ৮০০ গজ দূরে একটি কার্গো জাহাজ লঞ্চটির মাঝামাঝি স্থানে সজোরে ধাক্কা দেয়। এতে লঞ্চটি উল্টে গিয়ে পানিতে ডুবে যায়।
এ সময় লঞ্চের ডেকে (লঞ্চের ওপরে) থাকা ৫০ থেকে ৬০ জন যাত্রী নদীতে লাফিয়ে পড়েন। এরপর তাঁরা জীবন রক্ষাকারী বয়া ও আশপাশের নৌযানে উঠে তীরে আসতে সক্ষম হন।
ডুবে যাওয়া লঞ্চের যাত্রী একটি বেসরকারি সংস্থার কর্মকর্তা আবুল কালাম ও ফারুক হোসেনসহ কয়েকজন যাত্রী জানান, কার্গোটি লঞ্চের খুব কাছাকাছি চলে এলে চালক প্রথমে গতি কমানোর চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে গতি না কমিয়ে কার্গোটি অতিক্রম করানোর চেষ্টা করেন। এ সময় কার্গোটি সরাসরি লঞ্চের মাঝামাঝি সজোরে ধাক্কা দেয়।
উদ্ধার পাওয়া যাত্রী হাফিজুর রহমান শেখ জানান, যাঁরা লঞ্চের ডেকে ছিলেন, তাঁরা অনেকেই বেঁচে গেছেন। কিন্তু ভেতরে থাকা যাত্রীদের বেশির ভাগই বের হতে পারেননি।
দুর্ঘটনার খবর পেয়ে পাটুরিয়ায় জড়ো হন লঞ্চযাত্রীদের স্বজনেরা। তাঁদের আহাজারিতে বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। উদ্ধারকর্মীরা একেকটি লাশ তুলে আনার পর সেই আহাজারি বেড়ে যায় কয়েক গুণ।
ডুবে যাওয়া লঞ্চটিতে টিকিট চেক করতেন শিবালয়ের ষাটঘর তেওতা গ্রামের রতন কুমার সরকার (৪৫)। তাঁর খোঁজে স্ত্রী জয়ন্তী রানী সরকার পাটুরিয়া ঘাটে এসে বিলাপ করছেন, ‘সারা দিন ও কাজের মইধ্যেই ডুইবা থাকত। কিছু কইলেই রাইগ্যা কইত, আমারে ভুইলা যাইতে অইবো, কাজ আমার কাছে বড়। অর কথাই সত্যি অইলো।’
লস্কর আটক: লঞ্চের সঙ্গে ধাক্কা লাগা কার্গো জাহাজ নার্গিস-১-এর তিনজন কর্মীকে আটক করেছে শিবালয় থানার পুলিশ। তাঁরা হলেন লস্কর শাহিনুর রহমান (২১), শহিদুল ইসলাম (২৪) ও জহিরুল ইসলাম (১৬)।
তদন্ত কমিটি ও সহায়তা: ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি করা হয়েছে। কমিটিকে ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। কমিটির আহ্বায়ক সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের নটিক্যাল সার্ভেয়ার ক্যাপ্টেন মো. শাজাহান। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, নৌযান দুর্ঘটনা তদন্তের জন্য মন্ত্রণালয় এর আগে যে তদন্ত কমিটি গঠন করেছে, সেই কমিটিও এই দুর্ঘটনার তদন্ত করবে।
মানিকগঞ্জ জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে লাশ পরিবহনের জন্য প্রতিটি পরিবারকে নগদ ২০ হাজার টাকা করে দেওয়া হচ্ছে। নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান ঘটনাস্থলে গিয়ে উদ্ধারকাজের তদারকি করেন। পরে মন্ত্রী প্রত্যেক নিহত ব্যক্তির পরিবারকে আরও ১ লাখ ৫ হাজার টাকা করে অনুদান দেওয়ার ঘোষণা দেন।
লঞ্চডুবির ঘটনায় ব্যাপক প্রাণহানিতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন