মৌলভীবাজারের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে দুই বছরে এক হাজারের বেশি সাপ মারা গেছে। উদ্যানের ভেতরের শ্রীমঙ্গল-ভানুগাছ সড়ক ও ঢাকা-সিলেট রেললাইনে গাড়িতে চাপা ও ট্রেনে কাটা পড়ে সাপ মারা গেছে। চা-বাগান ও উদ্যানের আশপাশের গ্রামের মানুষের হাতেও সাপ মারা পড়ছে। এ ছাড়া বন ধ্বংসের কারণেও বসতি নষ্ট হয়ে সাপ কমে যাচ্ছে। লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের অজগর সাপ নিয়ে চলমান এক গবেষণায় এ তথ্য বেরিয়ে এসেছে।
গবেষক সূত্র জানায়, উদ্যানে কত প্রজাতির সাপ আছে এবং কোন প্রজাতির সাপ বেশি ও কোন প্রজাতির কম, তা জানার জন্য দুই বছরের বেশি সময় ধরে গবেষণা পরিচালনা করা হচ্ছে। গবেষণার অংশ হিসেবে সাপের গতিবিধি পর্যবেক্ষণের জন্য সম্প্রতি একটি অজগর সাপের শরীরে ‘ট্রান্সমিটার’ স্থাপন করা হয়েছে। গবেষণার কাজে সহায়তা করছে বন বিভাগ, বেসরকারি সংস্থা ওরিয়ন সোসাইটি ও কারিনাম বাংলাদেশ। এর নাম দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশ অজগর গবেষণা প্রকল্প। ২০১১ সালের মে মাসে গবেষণার কাজ শুরু হয়।
জানা যায়, গবেষণার কাজ চালাতে গিয়ে এ পর্যন্ত উদ্যানে ৩৯ প্রজাতির সাপের সন্ধান পাওয়া গেছে। এর মধ্যে সাধারণত ঢোঁড়া, হিমালয়ের ঢোঁড়া, জুনিয়া, দাঁড়াশ, কালনাগিনী, দুধরাজ, সুতানলি ও সবুজ বোড়া প্রজাতির সাপের সংখ্যাই বেশি। এ ছাড়া এখানে অজগর ও কিং কোবরা সাপ রয়েছে।
গবেষণাকাজ পরিচালনা করতে গিয়ে সাপ মারা যাওয়ার তথ্য পেয়েছেন গবেষক দলের তিন সদস্য। তাঁরা জানান, বৈশাখ থেকে কার্তিক মাস পর্যন্ত সাপ বেশি চলাফেরা করে। গত দুই বছরে ওই সময়ে উদ্যান এলাকায় প্রায় এক হাজার মৃত সাপ পাওয়া গেছে। এর বাইরে চা-বাগান ও আশপাশের গ্রামগুলোতে সাপ মারা পড়ছে। সাপ মারা যাওয়ার কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে জানা গেছে, উদ্যানের ভেতর দিয়ে শ্রীমঙ্গল-ভানুগাছ সাত কিলোমিটার রাস্তা এবং ঢাকা-সিলেট রেললাইন চলে গেছে। প্রায় প্রতিদিনই সড়ক ও রেললাইন দিয়ে যাওয়ার সময় চার-পাঁচটি সাপ গাড়ির চাকায় পিষ্ট হয়ে মারা পড়ছে। চা-বাগানে সাপের চলাফেরা বেশি। অসচেতনতার কারণে বাগানের লোকজন সাপ দেখলেই পিটিয়ে মেরে ফেলছেন। এ ছাড়া কাঠচোরদের হাতেও সাপ মারা পড়ছে। অন্যদিকে চা-বাগানে কীটনাশক ব্যবহার করায় সাপ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
বাংলাদেশ অজগর গবেষণা প্রকল্পের প্রধান গবেষক শাহরিয়ার সিজার রহমান জানান, উদ্যানের একটি অজগরের শরীরে গত ১৩ জুলাই একটি ছোট ট্রান্সমিটার স্থাপন করা হয়েছে। এ সাপ কোথায় থাকছে, কোথায় যাচ্ছে, কখন নড়াচড়া করছে তা জানার জন্য এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ট্রান্সমিটারের বেতারসংকেতের মাধ্যমে জানা গেছে, অজগরটি গত এক মাসে দেড় কিলোমিটারের বেশি ভ্রমণ করেছে। এখন অজগরটি একটি গ্রামে অবস্থান করছে। উদ্যানে সাপের বিচরণের জায়গা অনেক ছোট (১২০০ হেক্টর)। অজগর এক বর্ষা মৌসুমেই ৪০ কিলোমিটার পথ ভ্রমণ করে। এটি বনমোরগ, হরিণ, ইঁদুর ইত্যাদি খেয়ে থাকে। এগুলো খেয়ে সাপ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে। সাপ কমে গেলে ফসলে ইঁদুর ও কীটপতঙ্গের আক্রমণ বেড়ে যাবে। কিং কোবরা অনেক বিষধর সাপ খেয়ে প্রকৃতিতে সাপের ভারসাম্য রক্ষা করে। এ সাপটি সংখ্যায় কমে যাচ্ছে। এতে বিষধর সাপের সংখ্যা বেড়ে যাবে।
শাহরিয়ার বলেন, মানুষের মধ্যে সাপ নিয়ে ভ্রান্ত ধারণা আছে। তাই সাপ রক্ষায় আরও গবেষণা দরকার। আর নিজেদের স্বার্থেই সাপ রক্ষা করা প্রয়োজন। এ জন্য গণসচেতনতা দরকার। সরকার ও চা-বাগান ব্যবস্থাপকেরা এ ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা পালন করতে পারেন।

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন