বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

মান্দারী ওয়াপদা বেড়ি সড়কে গাড়ি ছুটছে সব সময়। ব্যস্ত সড়কের দুই পাশে নীরবে দাঁড়িয়ে আছে নানান প্রজাতির গাছ। এই গাছ নজর কাড়ে দূরের যাত্রীর, ক্লান্তি ভুলিয়ে দেয় পথচারীর। চোখে প্রশান্তি আনে সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বিভিন্ন প্রজাতির গাছের সারি। এসব গাছের ফাঁকে ফাঁকে লিয়াকত আলী লাগিয়েছেন তালগাছের চারা।

লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার মান্দারী ওয়াপদা বেড়ি সড়কের সাত-আট কিলোমিটার ও মান্দারী আমিন বাজার পর্যন্ত প্রায় তিন কিলোমিটার সড়কের দুই ধারে লাগিয়েছেন তালগাছের চারা। এ ছাড়া এলাকার পতিত জায়গায় সব মিলিয়ে তিনি অন্তত চার হাজার তালগাছ লাগিয়েছেন। দেড় বছর আগে থেকে গাছ লাগাচ্ছেন তিনি। তাঁর বাড়ি মান্দারী ইউনিয়নের দক্ষিণ মান্দারী গ্রামে। তিনি নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ দুর্গাপুর উচ্চবিদ্যালয়ের ইংরেজির শিক্ষক।

সবুজের স্বপ্ন

প্রতিবছর সারা বিশ্বে বজ্রপাতের কারণে গড়ে ২৪ হাজার লোক মারা যায়। আহত ব্যক্তির সংখ্যা প্রায় ২ লাখ ৪০ হাজার। দেশে মার্চ থেকে অক্টোবর পর্যন্ত বজ্রপাত হয়ে থাকে। এপ্রিল ও মে মাসে বজ্রপাত তুলনামূলকভাবে বেশি হয়। কৃষিকাজে ব্যস্ততার কারণে এ সময় বজ্রপাতে প্রাণহানিও বেশি ঘটে। বিষয়টি ভাবিয়ে তোলে লিয়াকত আলীকে। বজ্রপাত থেকে রক্ষা পেতে ২০২০ সালে শুরু করেন তালগাছ লাগানো। তালগাছ বজ্রপাত প্রতিরোধসহ প্রাণহানি কমাতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। তিনি ঠিক করেন, নিজের গ্রামের আশপাশটা তালগাছ দিয়ে সবুজে ভরে তুলবেন। সরকারি সড়কগুলোতে তালগাছ রোপণ করবেন তিনি। একাই ধীরে ধীরে গাছ লাগানো শুরু করেন। এ পর্যন্ত তালগাছের চারা রোপণ করেছেন চার হাজার। অন্য প্রজাতির আরও এক হাজার গাছ লাগান তিনি। পুরো জেলায় তালগাছ লাগানোর স্বপ্ন রয়েছে লিয়াকতের।

দক্ষিণ মান্দারী গ্রামের যুবক আজাদ হোসেন বলেন, ‘শুরুতে লিয়াকত ভাইয়ের কাজ দেখে মনে হতো, এটা পাগলামি। পরে যখন রাস্তার দুই ধার তালের গাছ গজিয়ে উঠতে শুরু করল, তখন আমাদের ধারণা পাল্টে গেল। এখন আমরা তাঁর লাগানো গাছগুলো যত্ন করি।’

মান্দারী ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মো. সিরাজ বলেন, লিয়াকত আলীর এই উদ্যোগের জুড়ি নেই।

ওই গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক কবির হোসেন পাটোয়ারী জানান, লিয়াকতের উত্তেজনা গাছের নতুন নতুন চারা নিয়ে। চারা নিয়ে তিনি ছুটতে থাকেন পথে পথে। তাঁর এলাকার প্রতিটি কোণ সবুজে না ভরিয়ে দেওয়া পর্যন্ত যেন তাঁর স্বস্তি নেই।

রামগঞ্জ পৌরসভায় সচিব পদে কর্মরত জাকির হোসেন। তাঁর গ্রামের বাড়িও দক্ষিণ মান্দরী গ্রামে। তিনি জানান, তালগাছ এমনি একটি গাছ, যা ১০০ বছর জীবিত থেকে মানুষের উপকার করে। এই গাছ থেকে যেমন ছায়া, জ্বালানি কাঠ ও রস পাওয়া যায়, একই সঙ্গে তার কাঁচা ও পাকা ফল মানুষ ভোগ করতে পারে। লিয়াকত আলীর এই উদ্যোগে অনুপ্রাণিত হয়েছেন গ্রামের অন্য যুবকেরাও।

গাছগুলো বেঁচে থাক

নিজের উদ্যোগ সম্পর্কে লিয়াকত আলী বলেন, ‘ঋতু পরিবর্তনের সময় বাংলাদেশে বায়ুমণ্ডল বেশ উত্তপ্ত থাকে। ভূপৃষ্ঠ থেকে উষ্ণ-আর্দ্র বাতাস ওপরে ওঠে। অন্যদিকে ওপর থেকে শীতল ও শুষ্ক বাতাস এর সঙ্গে মিলে বজ্রপাত হয়ে থাকে। একধরনের বায়ুমণ্ডলীয় অস্থিরতা থেকে বজ্রপাতের সৃষ্টি হয়। তালগাছ বজ্রপাত প্রতিরোধসহ প্রাণহানি কমাতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে বলে আমার বিশ্বাস। তাই কর্ম থেকে যখনই সুযোগ পাই, তখনই গাছ লাগাতে ও পরিচর্যা করতে ছুটে যাই। নিজের খাওয়া-পরার খরচ মিটিয়ে যা অবশিষ্ট থাকে, তা গাছের পেছনে খরচ করি। ভাবছি, পুরো জেলায় সরকারি রাস্তাঘাটে তালের সাম্রাজ্য গড়ব।’

লিয়াকত আরও জানান, ‘তাঁর ব্যক্তিগত কোনো চাওয়া-পাওয়া নেই। বহু যত্নে, বহু শ্রমে, বহু ঘামে, বহু পরিচর্যায় একেকটি গাছ বেড়ে উঠেছে। শত বছর ধরে গাছগুলো বেঁচে থাকুক ছায়াবৃক্ষ হয়ে।’ স্বপ্ন দেখেন, রাস্তার ধারে, মোড়ে, বাজারে, হাটখোলায়, স্কুল-কলেজে, মাদ্রাসায়, মাঠে, ঈদগাহে গাছে গাছে ভরে উঠবে।

লিয়াকত আলী বলেন, ‘দেশবাসীর কাছে আমার আবেদন, বেশি বেশি করে গাছ লাগান। পরিবেশ না বাঁচলে তো আমরাও ভালোভাবে বাঁচতে পারব না। পাখপাখালি ভালোভাবে বাঁচতে পারবে না। আমরা প্রকৃতির সন্তান। প্রকৃতিকে ভালোবাসা আমাদের দায়িত্ব। প্রকৃতিকে ভালো না বাসলে পূর্ণাঙ্গ মানুষ হব কেমন করে?’

সম্মাননা

৪ নভেম্বর প্রথম আলোর ২৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ছিল। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ৮ নভেম্বর প্রথম আলো বন্ধুসভা লক্ষ্মীপুরে আয়োজন করে সম্মাননা ও শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠান। গাছ লাগানোর অনুপ্রেরণা দেওয়ার জন্য খুঁজে বের করে লিয়াকত আলীকে সম্মানিত করে প্রথম আলো

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন